হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, অস্ট্রিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক পরামর্শক কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘ইরানবিদ্যা ছাড়া প্রাচ্যবিদ্যা; সম্ভব না অসম্ভব?’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি হিকমাহ হাউস, ভিয়েনার সহযোগিতায় আয়োজিত এ সিম্পোজিয়ামে প্রাচ্যবিদ্যা, ইরানবিদ্যা, দর্শন, ইসলামি স্টাডিজ ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রের শিক্ষক ও গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন। সিম্পোজিয়ামের একাডেমিক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অস্ট্রিয়ার সুপরিচিত ইসলামবিষয়ক গবেষক রুডিগার লোহলকার।
সাতজন বিশেষজ্ঞ ও তিনটি মূল প্রশ্ন
সিম্পোজিয়ামের প্রথম প্রধান অধিবেশনে জার্মানির এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিদ্যার পোস্টডক্টরাল গবেষক ভিক্টর ফ্লোরিয়ান সাবো তাঁর গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তাঁর গবেষণাটি ছিল প্রাচ্যবিদ্যার অধ্যয়নে ইরানবিদ্যার অবস্থান নিয়ে একটি গুণগত ও তুলনামূলক গবেষণা।
সাবোর বক্তব্য অনুযায়ী, এই গবেষণায় ইরানবিদ্যা, দর্শন, ইসলামি স্টাডিজ, পুরাণবিদ্যা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে বিশিষ্ট সাতজন ব্যক্তির মতামত স্বাধীনভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁদের জানানো হয়নি যে একই বিষয়ে অন্য বিশেষজ্ঞরা কী মতামত দিয়েছেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সাতজন বিশেষজ্ঞ হলেন:
- সাইয়্যেদ হোসাইন নাসর-জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজের বিশিষ্ট অধ্যাপক;
- ইয়ান আলমন্ড-জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশ্বসাহিত্যের অধ্যাপক;
- নুসরাতুল্লাহ রাস্তগার-অস্ট্রিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের অবসরপ্রাপ্ত ইরানবিদ;
- গোলামরেজা আওয়ানি-দার্শনিক এবং ইরানের হিকমাহ ও দর্শন সমিতির সাবেক সভাপতি;
- রুডিগার লোহলকার-ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ইসলামবিষয়ক গবেষক;
- জালেহ আমুজগার-ইরানবিদ, পুরাণবিশারদ এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের একাডেমির স্থায়ী সদস্য;
- রেজা গোলামি-রাজনৈতিক দর্শন ও সভ্যতাবিষয়ক অধ্যয়নের অধ্যাপক।
সাবো উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে গবেষণার তিনটি মূল প্রশ্ন তুলে ধরেন:
১. প্রাচ্যবিদ্যার কেন্দ্র ও মূলভিত্তিতে ইরানবিদ্যার অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
২. বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, ভারত ও আনাতোলিয়ার মতো প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে ইরানি ঐতিহ্য বিবেচনা না করে কি যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব?
৩. ইরানকে উপেক্ষা করলে প্রাচ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি, চিন্তাধারা ও সভ্যতাগত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে কী ধরনের শূন্যতা ও ঘাটতি সৃষ্টি হয়?
‘প্রান্তিক অঞ্চল’ নয়, বরং ‘সংযোগের কেন্দ্র’
সাতজন বিশেষজ্ঞের উত্তর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাঁদের বিশেষায়ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের গঠন ও পারস্পরিক সংযোগে ইরানের ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত ভূমিকা সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে।
সাবোর প্রতিবেদনে নাসরের মতামত তুলে ধরে বলা হয়, দূরপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলকে ইরানবিদ্যা ছাড়াও কিছুটা বোঝা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং বিশেষত ভারতকে ইরানি ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে গভীর শূন্যতা থেকে যাবে।
অন্যদিকে তুলনামূলক সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ইয়ান আলমন্ড ‘ইরান’ ও ‘পারস্য’-এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি হাফিজ ও গ্যোতের সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে ইউরোপের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ফারসি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তবে তিনি ইরানকে অতিরিক্ত রোমান্টিকভাবে উপস্থাপনের বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করেন। তাঁর মতে, ‘পারস্য’-এর একটি ধ্রুপদি ও রোমান্টিক চিত্রের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে সমকালীন ইরানের জটিলতা-যেমন জাতিগত বৈচিত্র্য, আধুনিকতা ও সামাজিক টানাপোড়েন-আড়ালে চলে যেতে পারে এবং ইরান সম্পর্কে একটি একরৈখিক চিত্র তৈরি হতে পারে।
সাবো রাস্তগারের যুক্তির তিনটি প্রধান দিক তুলে ধরেন:
১. ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর তুলনামূলক অধ্যয়নে প্রাচীন ইরানি ভাষাগুলোর ভূমিকা;
২. একটি সভ্যতাগত ও যোগাযোগের চৌরাস্তা হিসেবে ইরানি মালভূমির ধারাবাহিক অবস্থান;
৩. জরথুস্ত্রী, মানিকীয় ও মাজদাকীয় ঐতিহ্যসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের গঠন ও বিস্তারে ইরানের ভূমিকা।
দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইরানের ভূমিকা
দর্শন ও বিজ্ঞানের ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে গোলামরেজা আওয়ানি চিন্তার ইতিহাসে ইরানের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গ্রিক উৎসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ইরানি মাগীদের অবস্থানের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পাশাপাশি ধ্রুপদি দার্শনিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, স্থানান্তর ও পুনর্ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও ইরানের ভূমিকা তুলে ধরেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এ প্রসঙ্গে সাসানীয় ইরানে গ্রিক দার্শনিকদের উপস্থিতি এবং জুন্দিশাপুরের মতো জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কেন্দ্র প্রাচীন বিশ্বে এবং পরবর্তীতে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্থানান্তর ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
রুডিগার লোহলকার তাঁর আলোচনায় মঙ্গোল-পরবর্তী যুগ, বিশেষত তিমুরীয় যুগের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ‘ফারসিভাষী বিশ্ব’কে প্রাচ্যে চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংযোগকারী কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেন। এই বিশ্ব আজকের রাজনৈতিক সীমারেখাকে অতিক্রম করে ইরান থেকে মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তাঁর মতে, চিন্তাবিদ, সুফি ও দার্শনিকদের একটি আন্তঃআঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিদ্যমান ছিল, যার পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি ইরানি ও ফারসি ঐতিহ্যকে বিবেচনায় না নিয়ে সম্ভব নয়।
ইরানকে শুধু পুরাণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য আড়ালে পড়ে যায়
পুরাণবিদ্যা, ইতিহাস ও প্রাচীন গ্রন্থের ভিত্তিতে জালেহ আমুজগার ইরানকে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানি পুরাণ ও অন্যান্য সভ্যতার পুরাণের মধ্যে বিদ্যমান কিছু সাদৃশ্য ও কাঠামোগত যোগসূত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি প্রাচীন বিশ্বে একটি জটিল সাংস্কৃতিক যোগাযোগ-নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের ওপর জোর দেন।
আমুজগার প্রাচীন ইরানি গ্রন্থগুলোতে ‘খিরাদ’ বা প্রজ্ঞা-বুদ্ধি-এর ধারণার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানকে শুধু পুরাণ ও সুফিবাদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ইরানি ঐতিহ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধারণাগত স্তরগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
রেজা গোলামি তাঁর উত্তরে ইরানকে কোনো প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং সভ্যতা ও চিন্তার অন্যতম কেন্দ্রীয় ও সৃজনশীল কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি ইরানকে মানবসভ্যতার বিকাশের অন্যতম মৌলিক কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেন এবং শহর-ই-সুখতা ও শুশ-এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে সভ্যতা গঠনে ইরানি মালভূমির স্বতন্ত্র ভূমিকার ওপর জোর দেন।
গোলামি ইসলামি যুগে জ্ঞান ও চিন্তার উৎপাদন ও বিস্তারে ইরানিদের ব্যাপক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি প্রাচ্যকে একপেশে বা সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা থেকে বিরত থাকার জন্য ইরানবিদ্যাকে একটি ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক-সমালোচনামূলক সংযোগকেন্দ্র’ হিসেবে বিবেচনার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
ঘাটতি’ থেকে ‘কাঠামোগত অসম্ভবতা
সাবোর উপস্থাপনার দ্বিতীয় অংশে প্রশ্ন তোলা হয়-ইরানবিদ্যা ছাড়া প্রাচ্যের বৃহৎ অংশকে বোঝা কি শুধু কঠিন ও অসম্পূর্ণ, নাকি কিছু ক্ষেত্রে এটি মূলত একটি ‘কাঠামোগত অসম্ভবতা’র মুখোমুখি হওয়া?
সাবোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাতজন উত্তরদাতাই বিভিন্ন মাত্রায় এ বিষয়ে জোর দিয়েছেন যে, বিশেষত মধ্য এশিয়া, ভারত, আনাতোলিয়া এবং ইসলামি বিশ্বের কিছু অংশকে ইরানি ঐতিহ্যের প্রতি যথাযথ দৃষ্টি না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে গুরুতর ঘাটতি থেকে যাবে।
ইরানকে বাদ দেওয়ার ফলে সৃষ্ট জ্ঞানগত শূন্যতা
এরপর সাবো প্রাচ্যবিদ্যার কিছু বর্ণনা থেকে ইরানকে বাদ দেওয়ার পরিণতি বিশ্লেষণ করেন। আলোচনায় উঠে আসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো—ইসলামি সভ্যতাকে শুধুমাত্র একটি আরব সভ্যতা হিসেবে সংকুচিত করে দেখার এবং ইসলামি বিশ্বের বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে ইরান ও অন্যান্য অনারব অঞ্চলের অবদানকে ম্লান করে দেওয়ার ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক উভয় ধরনের জ্ঞানচর্চায় ইরানিদের ভূমিকা, ইরানের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর অবস্থান এবং ইসলামি চিন্তার বিকাশে ফারসি ঐতিহ্যের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে সাবো তাঁর উপস্থাপনার শেষে গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত সাতজন বিশেষজ্ঞই আগে থেকেই প্রাচ্যের অধ্যয়নে ইরানের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। ফলে এই গবেষণার ফলাফলকে পুরো প্রাচ্যবিদ্যা-জগতের সর্বসম্মত মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সাবোর ভাষায়, এই গবেষণা মূলত ‘একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য’ তুলে ধরে; এটি এমন কোনো সর্বজনীন ঐকমত্য নয়, যা এ বিষয়ে বিদ্যমান সব প্রতিদ্বন্দ্বী মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে।
‘প্রাচ্যের সত্তাতত্ত্ব’ এবং প্রাচ্যবিদ্যার মানচিত্র পুনর্নির্মাণের সাত প্রশ্ন
সিম্পোজিয়ামের পরবর্তী পর্যায়ে অস্ট্রিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক পরামর্শক এবং রাজনৈতিক দর্শন ও সাংস্কৃতিক-সভ্যতাগত অধ্যয়নের অধ্যাপক রেজা গোলামি ‘প্রাচ্যের সত্তাতত্ত্ব: প্রাচ্যবিদ্যার মানচিত্র পুনর্বিবেচনার সাতটি প্রশ্ন’ শিরোনামে বক্তব্য দেন।
গোলামি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই একটি পদ্ধতিগত সতর্কতা উচ্চারণ করেন। তাঁর মতে, প্রাচ্যকে একটি একক ও সমজাতীয় বিশ্ব হিসেবে দেখা একটি মৌলিক ভুল। প্রাচ্য হলো সংস্কৃতি, সভ্যতা, ভাষা, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, চিন্তাধারার ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে একটি বিস্তৃত ও বহুত্বপূর্ণ পরিসর। ইরান, আরব বিশ্ব, ভারত, মধ্য এশিয়া, আনাতোলিয়া ও পূর্ব এশিয়াকে একটি মাত্র সংস্কৃতি বা অভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
তবে গোলামি এই বৈচিত্র্য থেকেই আরও গভীর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন:
প্রাচ্য যদি এতটাই বহুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এত ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিকে কেন একটি অভিন্ন নাম-‘প্রাচ্য’-এর অধীনে রাখা হয়েছে?
তিনি একটি ‘অদৃশ্য ছাতার’ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রাচ্যের একটি অভিন্ন সংস্কৃতি বা পরিচয় রয়েছে। বরং এটি এমন একটি অনুমান-যে হয়তো একটি গভীরতর অর্থবোধক পরিসর রয়েছে, যা মানুষের ধারণা, প্রকৃতি, সমাজ, নৈতিকতা, অর্থ, পবিত্রতা ও পরমতত্ত্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এসব ঐতিহ্যের কিছু অংশকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে।
গোলামি জোর দিয়ে বলেন, তিনি এই ধারণাকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়; বরং তুলনামূলক গবেষণা ও একাডেমিক সংলাপের জন্য একটি প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
ইরানবিদ্যা-প্রাচ্যকে বোঝার অবিচ্ছেদ্য অংশ
সিম্পোজিয়ামের পরবর্তী পর্যায়ে বিশিষ্ট ইরানবিদ এবং অস্ট্রিয়ায় ইরানবিদ্যা অধ্যয়নের বিকাশ ও ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নুসরাতুল্লাহ রাস্তগার ইরানবিদ্যা ও প্রাচ্যবিদ্যার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য দেন।
রাস্তগারের বক্তব্যের মূল প্রশ্ন ছিল সহজ, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইরানবিদ্যার উপস্থিতি ও সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া কীভাবে প্রাচ্যবিদ্যা পড়ানো সম্ভব?
তাঁর দৃষ্টিতে, ইরানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানকে বিবেচনায় না নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ইরান শুধু প্রাচ্য অধ্যয়নের একটি বিষয় ছিল না; বরং প্রাচ্যের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বহু ক্ষেত্রের গঠন ও বিকাশে ইরান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
রাস্তগার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে উসমানীয় সাম্রাজ্য ও ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য-এর মতো বৃহৎ সাম্রাজ্যের উদাহরণ দেন। তাঁর মতে, এসব সাম্রাজ্যের ইতিহাস যথাযথভাবে অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়, যদি একই সঙ্গে ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা হয়। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এসব অঞ্চলে ফারসি ছিল প্রশাসনিক, দাপ্তরিক ও সাহিত্যিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলোর একটি। এসব অঞ্চলের বহু শাসক এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিজাতের সঙ্গে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
রাস্তগার অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত ইরানিদের সমাজের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইরানি এবং তাঁদের তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইরানের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
তাঁর মতে, ইউরোপে বসবাসরত ইরানি পরিবারগুলোর সন্তানদেরও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিজেদের পরিবার ও পূর্বপুরুষের দেশটির ভাষা ও ঐতিহাসিক সংস্কৃতি বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিকভাবে অধ্যয়নের সুযোগ থাকা উচিত।
আপনার কমেন্ট