শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৭:৩৭
হক ও সত্যের পথে অবিচল থাকাই ইসলামী সভ্যতার শিখরে পৌঁছার একমাত্র পথ

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মতাহারি-আসল জোর দিয়ে বলেছেন, দৃঢ়তা ও অবিচলতা অবশ্যই হক ও সত্যের পথে হতে হবে। তিনি বলেন, মানুষ আল্লাহর নির্ধারিত লক্ষ্য ও ইসলামী সভ্যতার শিখরে পৌঁছাতে চাইলে আমল, অবিচলতা, ধৈর্য, তাকওয়া ও পরহেজগারি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আর বাতিলের পথে অনড় থাকা কিংবা এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া, যার ফলে অন্যের ওপর জুলুম হয়-তা প্রকৃত অবিচলতা হিসেবে গণ্য হয় না।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মতাহারি-আসল শনিবার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘আফতাবে শার্ঘি’-তে পবিত্র কোরআনের আয়াতে অবিচলতার ধারণা সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, কিছু আয়াতে কোনো একটি বিষয় নির্দিষ্ট শব্দে প্রকাশ করা না হলেও অন্য শব্দ ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহর উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তবে অবিচলতার বিষয়ে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যেখানে এই শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে।

তিনি সূরা হুদের ১১২ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও মুমিনদের অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন: অতএব, আপনি অবিচল থাকুন, যেমন আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর যারা আপনার সঙ্গে তওবা করেছে তারাও।

এই আয়াত অনুযায়ী প্রথমে মহানবী (সা.)-কে অবিচল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনদেরও এই পথে অবিচল থাকতে বলা হয়েছে।

পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ওয়ালি ফকিহ বলেন, অবিচলতা অর্থ হলো-যে লক্ষ্য, চিন্তা ও কাজকে মানুষ হক ও সত্য বলে বিশ্বাস করে, তার ওপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা। মানুষের বিশ্বাস ও কাজে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। কখনো নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করা এবং কখনো তা না করা অবিচলতা নয়। যে ব্যক্তি কোনো লক্ষ্যকে সত্য বলে মনে করে, তাকে সেই পথে স্থির থাকতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, অবশ্য সব ধরনের জেদ ও অবস্থানে অটল থাকাকে অবিচলতা বলা যায় না। অনেক মানুষ বাতিলের পথেও জেদ ধরে থাকতে পারে। এমনকি নিজের পথ ভুল জেনেও একগুঁয়েমির কারণে সে পথে অটল থাকতে পারে। তাই আল্লাহ বলেন: আপনি অবিচল থাকুন, যেমন আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, যে পথে চলার নির্দেশ আপনাকে দেওয়া হয়েছে, সেই পথেই-হক ও সত্যের পথে-অবিচল থাকুন।

হুজ্জাতুল ইসলাম মতাহারি-আসল আরও বলেন, মানুষের অবিচলতার ভিত্তি হতে হবে এমন বিষয়, যা বিবেক ও শরিয়তসম্মত এবং যা সত্য ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুতরাং কোনো বিষয়ে অনড় থাকার ফলে যদি অন্যের ওপর জুলুম হয় কিংবা সীমালঙ্ঘন ঘটে, তাহলে এমন আচরণ অনুমোদিত নয়। মানুষকে আল্লাহ যে সীমা নির্ধারণ করেছেন, সেই সীমার মধ্যেই অবিচল থাকতে হবে।

তিনি এরপর সূরা জিনের একটি আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: আর যদি তারা সেই পথে অবিচল থাকত, তবে আমি তাদের প্রচুর পানি পান করাতাম।

এই আয়াতেও অবিচলতা কোনো শর্তহীন বিষয় নয়। বরং এখানে আল্লাহ নির্ধারিত ‘পথের’ ওপর অবিচল থাকার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মানুষ যদি এই পথে অবিচল থাকে, তাহলে তাদের ওপর তাঁর অগণিত নেয়ামত বর্ষিত হবে।

পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ওয়ালি ফকিহ বলেন, অবিচলতা ছাড়া মানুষ আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে না। কোনো ফলাফল অর্জন করতে হলে তাকে সঠিক পথে স্থির থাকতে হবে।

তিনি নাহজুল বালাগার ১৭৬ নম্বর খুতবায় আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর বাণী উল্লেখ করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন (আ.) বলেছেন: আমল, আমল; অতঃপর পরিণতি, পরিণতি; অবিচলতা, অবিচলতা; অতঃপর ধৈর্য, ধৈর্য; আর পরহেজগারি, পরহেজগারি।

এই বাণী থেকে বোঝা যায়, মানুষের লক্ষ্যে পৌঁছার প্রধান শর্ত হলো আমল।

হুজ্জাতুল ইসলাম মতাহারি-আসল বলেন, মানুষ অলীক আকাঙ্ক্ষা ও মিথ্যা আশার মাধ্যমে কোথাও পৌঁছাতে পারে না। কেউ কেউ মনে করে, শুধু মনে মনে বিজয় ও সাফল্যের কল্পনা করলেই কোনো পরিশ্রম ও কাজ ছাড়াই তা অর্জন করা সম্ভব। অথচ লক্ষ্যে পৌঁছার পথ হলো আমল, চেষ্টা ও পরিশ্রম।

তিনি বলেন, মানুষকে প্রথমে নিজের গন্তব্য ও পথের শেষ পরিণতি চিনতে হবে এবং জানতে হবে সে কোথায় পৌঁছাতে চায়। এরপর তাকে সেই পথে অবিচল থাকতে হবে। এক-দুই দিন প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা দেখিয়ে কোনো ফল অর্জন করা যায় না। কখনো কখনো একটি আল্লাহপ্রদত্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষকে সারা জীবন চেষ্টা ও অবিচলতা অবলম্বন করতে হয়।

পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ওয়ালি ফকিহ বলেন, ধৈর্য ছাড়া অবিচল থাকা সম্ভব নয়। অবিচলতার পথে নানা সমস্যা ও বিপদ দেখা দেয়, আর মানুষকে সেগুলো সহ্য করতে হয়। আমিরুল মুমিনিন (আ.) অবিচলতার পর ধৈর্য এবং এরপর পরহেজগারির কথা বলেছেন। তাই এই সব ধাপ আল্লাহর পথে, তাকওয়া ও পরহেজগারির সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে। মানুষের লক্ষ্য যদি শুধু দুনিয়াবি পদ, মর্যাদা ও অবস্থান অর্জন করা হয়, তাহলে এমন পথের প্রকৃত মূল্য নেই।

তিনি আরও বলেন, আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর এই বাণী থেকে বোঝা যায়, মানুষকে কর্মঠ হতে হবে, অলীক আশার ওপর নির্ভর করা যাবে না, নিজের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ও বিজয়কে চিনতে হবে এবং এরপর অবিচলতা ও ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর পথে ও তাকওয়ার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে।

হুজ্জাতুল ইসলাম মতাহারি-আসল অবিচলতা সম্পর্কে শহীদ নেতার বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তিনি অবিচলতাকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, পথ চলা অব্যাহত রাখা, নির্ধারিত পথ অনুসরণ করা এবং থেমে না যাওয়ার অর্থে ব্যাখ্যা করতেন। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, এটিই কাজের মূল রহস্য।

তিনি বলেন, শহীদ নেতা সবসময় উম্মতকে অবিচল থাকার উপদেশ দিতেন। তিনি বলতেন, আমরা যদি ইসলামী সভ্যতার শিখরে পৌঁছাতে চাই, তাহলে এই পথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। লক্ষ্য যদি হয় শুধু প্রিয় ইরান নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ও নিপীড়িত মানুষের বিশ্বকে সভ্যতার শিখরে পৌঁছে দেওয়া, তাহলে তার পথ হলো অবিচল থাকা এবং দৃঢ়ভাবে কাজে লেগে থাকা।

পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ওয়ালি ফকিহ আরও বলেন, তিনি নিজেও ৩৭ বছর ধরে এই উম্মত ও ইসলামী উম্মতের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ইসলামের শত্রু ও ইরানের শত্রুদের অবৈধ দাবির বিরুদ্ধে সবসময় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এক পা-ও পিছু হটেননি এবং জনগণকেও নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন।

শহীদ নেতার সঙ্গে জনগণের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণও তাঁর পাশে ছিল। তারা যে আদর্শ ও লক্ষ্যকে বিশ্বাস করত এবং যার জন্য কাজ করত, সেই পথে জীবন উৎসর্গ করা পর্যন্ত অবিচল থেকেছে। তারা নিজেদের প্রিয় জীবন ও সম্মানিত পরিবারকেও মহান আল্লাহর দরবারে উৎসর্গ করেছে।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মতাহারি-আসল তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, পবিত্র কোরআনের আয়াত, বর্ণনা, আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বাণী এবং শহীদ নেতার বক্তব্য থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, অবিচলতা অর্থ হলো-যে বিষয়কে আমরা হক ও সত্য বলে জানি, অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন, তা দৃঢ়তার সঙ্গে অনুসরণ করা।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী সভ্যতার শিখরে পৌঁছার জন্য অবিচল থাকা, দৃঢ়ভাবে কাজে লেগে থাকা এবং জীবন উৎসর্গ করা পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha