হাওজা নিউজ এজেন্সি: এক বিবৃতিতে আইনপ্রণেতারা বলেন, এনপিটি মূলত দুটি পারস্পরিক ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার এবং তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, প্রমাণ করেছে যে চুক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক কাঠামো কার্যত অকার্যকর, কাঠামোগতভাবে বৈষম্যমূলক এবং ইরানের ন্যূনতম আইনগত অধিকার রক্ষায় অক্ষম হয়ে পড়েছে।
ইরানি আইনপ্রণেতারা এনপিটি থেকে সরে আসার প্রয়োজনীয়তা ও জরুরিতার পক্ষে চারটি কারণ তুলে ধরেন।
প্রথমত, তাদের মতে, চুক্তিটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আওতায় থাকা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যেকোনো হুমকি বা সামরিক হামলা থেকে সর্বোচ্চ মাত্রার আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে প্রকাশ্য হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। আইনপ্রণেতাদের দাবি, এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা কার্যত এসব আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল।
দ্বিতীয়ত, তারা ইরানের অবকাঠামোয় হামলা এবং দেশটির বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরাসরি হামলা, পরিকল্পিত নাশকতা, সাম্প্রতিক দুটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালানোর বিষয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক হুমকি—এসবই প্রমাণ করে যে সর্বোচ্চ মাত্রার আন্তর্জাতিক নজরদারি গ্রহণ করে ইরান কোনো নিরাপত্তা পায়নি। বরং এই নজরদারি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ও অবকাঠামো শনাক্ত করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তৃতীয়ত, আইনপ্রণেতাদের দাবি, এনপিটির আওতায় ইরান তার আইনগত অধিকার ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, ইরান চুক্তির অধীনে নিজের দায়িত্বগুলো পূরণ করার পাশাপাশি নজিরবিহীন মাত্রায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নিলেও এনপিটির ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত অধিকার—বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—থেকে দেশটিকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ইরানকে কঠোর, অন্যায্য ও অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
চতুর্থত, তারা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শন নিয়েও অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, এসব পরিদর্শন এখন যাচাই-বাছাইয়ের নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ না করে শিল্প ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গোয়েন্দাগিরি এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক ইস্যু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে এনপিটির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলা হয়, কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি মনে করে যে চুক্তির বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ‘অসাধারণ ঘটনা’ তার সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করেছে, তাহলে সে রাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে চুক্তির অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে তিন মাস আগে নোটিশ দিতে হয়।
আইনপ্রণেতারা বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের হুমকি অব্যাহত থাকা, দেশটির ভূখণ্ড ও পারমাণবিক স্থাপনায় প্রকাশ্য আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অকার্যকারিতার প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা গুরুতরভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো।
এ পরিস্থিতিতে তারা ইরানের পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম/প্রেসিডিং বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, সংসদের অভ্যন্তরীণ বিধিবিধান অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব এনপিটি থেকে ইরানের সরে আসার আইনি প্রক্রিয়া সক্রিয় করতে। একই সঙ্গে দেশটির ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নতুন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও আইনি সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানান তারা।
আপনার কমেন্ট