আজ শুক্রবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জুমার নামাজের খুতবায় আয়াতুল্লাহ খাতামি এসব কথা বলেন।
খুতবায় তিনি দীর্ঘ সময়ের সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্যেও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কীভাবে মুসলিম সমাজকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন, সে প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময়েও সমাজকে বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখতে এ বিষয়টি থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
আয়াতুল্লাহ খাতামির ভাষ্য অনুযায়ী, মহানবী (সা.) এ ক্ষেত্রে পাঁচটি মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন—সমাজে জিহাদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা, বিশ্বাসের ভিত্তি শক্তিশালী করা, যোদ্ধাদের মধ্যে আশা ও মনোবল সৃষ্টি, শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার এবং শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মোকাবিলা।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.) সমাজে জিহাদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে যেমন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের স্মরণে শোক পালন একটি ব্যাপক সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, তেমনি প্রতিরোধের চেতনাকেও সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
মিডিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে তেহরানের অস্থায়ী জুমার ইমাম বলেন, প্রতিরোধের অন্যতম ভিত্তি হলো মানুষের মনোবল ও আশা জাগিয়ে রাখা। তাই দৃশ্য ও শ্রাব্য—উভয় ধরনের গণমাধ্যমকে এ বিষয়টিকে তাদের কার্যক্রমের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগের যুদ্ধগুলোতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও মুমিনদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর মতে, এসব উপাদান সমাজকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রস্তুত রাখতে সহায়তা করেছিল।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, শত্রুর ওপর প্রতিরোধমূলক প্রভাব তৈরির অন্যতম উপায় হলো সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের জানা উচিত, এমনকি যুদ্ধবিরতির সময়ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এক মুহূর্তের জন্যও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ থেকে বিরত নেই।’
পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘের ভাষণ
খুতবায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণ নিয়েও কথা বলেন আয়াতুল্লাহ খাতামি।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের ভাষণ নিঃসন্দেহে যুক্তিপূর্ণ, উদ্দীপনাময় ও সাহসী ছিল; এমনভাবে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন যে জাতিসংঘকে যেন একটি আদালতে পরিণত করেছিলেন।’
আয়াতুল্লাহ খাতামির মতে, পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ইরানি জনগণের ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’—এই স্লোগানের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানি জনগণ দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় রয়েছে এবং শত্রু পরাস্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের যুক্তি ও অবস্থান বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন এবং ইরানি জনগণের অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।
তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের একটি অংশকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে এবং ‘ইরান শক্তির জোরে আত্মসমর্পণ করবে না’—এমন শিরোনাম করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, ‘ট্রাম্প নিজের দেশের জনগণকে চিনতে পারেননি এবং আমেরিকার এমন ক্ষতি করেছেন যে তাঁর জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প ইরানি জনগণকেও বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘এতগুলো ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরও তিনি এখনো বুঝতে পারেননি যে ইরানি জনগণ আশুরার চেতনা ধারণ করে এবং তারা অপমান ও আত্মসমর্পণ মেনে নেবে না।’
আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, ‘হায়হাত মিন্নাজ্জিল্লাহ’—অর্থাৎ অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে না নেওয়ার চেতনা—ইরানি জনগণের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।
ঐক্য ও নেতৃত্ব
ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি এবং ‘ইমাম শহীদ’ ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও ধারাবাহিকভাবে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘ঐক্য একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। তবে ঐক্যের একটি কেন্দ্র বা নেতৃত্ব প্রয়োজন, আর সেই কেন্দ্র হলো ভেলায়াতে ফকিহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওলায়াতের প্রতি আনুগত্যই মূল বিষয়; শুধু মুখে ওলায়াতের কথা বলা নয়।’
আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকা উচিত, যারা জনগণের প্রতি আস্থাশীল এবং দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, ‘পশ্চিমমুখী ব্যক্তিরা ঐক্যের কেন্দ্র হতে পারেন না; তাদের এই জনগণের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ তাদের হাতে থাকা উচিত নয়।’
হিজাব প্রসঙ্গে আয়াতুল্লাহ খাতামি
খুতবায় হিজাব প্রসঙ্গেও কথা বলেন তেহরানের অস্থায়ী জুমার ইমাম।
তিনি বলেন, ‘হিজাব এই জাতির পবিত্র মূল্যবোধগুলোর একটি। যারা সমাজে ঐক্য বজায় রাখতে চান, তাদের হিজাববিরোধী পথে অগ্রসর হওয়া উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমনভাবে কথা বলা উচিত নয়, যাতে মনে হয় রাষ্ট্র বেহিজাবির সমর্থক; রাষ্ট্র বেহিজাবির সমর্থক নয়।’
তবে তিনি বলেন, যারা হিজাব মেনে চলেন না, তারাও দেশের নাগরিক। বিভিন্ন সমাবেশে তাদের উপস্থিতি এবং জনগণের সঙ্গে তাদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক বিষয়। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘হিজাবকে উপহাস করা এবং ধর্মের সুস্পষ্ট বিধানের বিরোধিতা করা ঐক্যের পরিপন্থী।’
আয়াতুল্লাহ শুবাইরি জাঞ্জানির মৃত্যু
খুতবায় প্রয়াত বিশিষ্ট আলেম আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জাঞ্জানির কথাও স্মরণ করেন আয়াতুল্লাহ খাতামি।
তিনি বলেন, গত সোমবার আয়াতুল্লাহ শুবাইরি জাঞ্জানি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি তাঁকে ‘মহান আলেম’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রায় এক শতাব্দী জীবনযাপন করা এই আলেম হাওজা-ইলমিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বিশেষ করে ‘ইলমুর রিজাল’—হাদিসের বর্ণনাকারীদের জীবন, পরিচয় ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের শাস্ত্রে—তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল।
আয়াতুল্লাহ খাতামির মতে, তাঁর মৃত্যু শিয়া ইসলামের শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
হজরত মাসুমার স্মরণ ও নতুন শিক্ষাবর্ষ
এ সময় তিনি কোমে হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)-এর স্মরণে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে কোমে হজরত মাসুমা (সা.)-এর স্মরণে একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু প্রসঙ্গে আয়াতুল্লাহ খাতামি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ীর বার্তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষাবর্ষের শুরু উপলক্ষে দেওয়া ওই বার্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘খবরে শুনেছি, সৌভাগ্যক্রমে কিছু কর্মকর্তা ইতোমধ্যে এই বার্তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।’
আপনার কমেন্ট