বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২৬ - ১০:০০
সমাজে নামাজের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সর্বজনীনতা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা:

সমাজে নামাজের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সর্বজনীনতা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে

জামাত ও জুমার ইমামদের মানুষের আশ্রয়স্থল এবং তাঁদের কথা শোনার ও দুঃখ-কষ্টের কথা গ্রহণ করার মতো শ্রোতা হতে হবে

সমাজে নামাজকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সর্বজনীন করা এবং এরপর তা সুন্দরভাবে আদায়ের জন্য সর্বসাধারণের প্রচেষ্টা—এই দুটিই এ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের প্রধান ভিত্তি। মসজিদগুলোকে আবাদ করা এবং জামাত ও জুমার নামাজের পরিমাণ বৃদ্ধি ও এর বাহ্যিক মানোন্নয়নের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের অপরিহার্য পূর্বপ্রস্তুতি। এসব ক্ষেত্রে জামাত ও জুমার ইমামদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মানুষের আশ্রয়স্থল হতে হবে এবং তাঁদের কথা শোনার ও দুঃখ-কষ্টের কথা গ্রহণ করার মতো শ্রোতা হতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’তথ্যমতে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা হুসাইনি খামেনেয়ী ৩৩তম জাতীয় নামাজ সম্মেলনে যে বার্তা পাঠিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ পাঠ নিম্নরুপ—

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

‘নামাজ কায়েম’-এর মহান বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং বিশেষভাবে নামাজ সম্মেলন আয়োজন করা—দেশে সত্তরের দশকের শুরু থেকে গৃহীত জরুরি ও যথোচিত উদ্যোগগুলোর অন্যতম। সংগ্রামী ও জনসম্পৃক্ত আলেম, কোরআনের শিক্ষক এবং দক্ষ প্রচারক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কারা’আতির প্রচেষ্টায় এ কর্মধারার সূচনা হয়েছে। মহান মর্যাদাসম্পন্ন শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’র এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ এবং গত ৩২টি সম্মেলন উপলক্ষে দেওয়া তাঁর গুরুত্বপূর্ণ, ধারাবাহিক ও জোরালো সুপারিশগুলোও এই কর্মধারার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

নিঃসন্দেহে নামাজ সম্পর্কে কথা বলা বা লেখা এমন একটি বিষয়, যা ঐশী ওহি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী এবং নিষ্পাপ ইমামদের (আ.) বাণীর মর্যাদা ও স্তরের উপযোগী। আর নামাজের গভীর জ্ঞান ও তাৎপর্য সম্পর্কে লেখার মতো যোগ্যতার তুলনায় আমার মতো ব্যক্তির কলম অত্যন্ত ক্ষুদ্র। কিন্তু ইসলামী সমাজের পরিচয় ও প্রয়োজনীয়তা এবং এর সেবকদের—বিশেষত ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্বের—দায়িত্ব এমন দাবি রাখে যে, এ দিক থেকে নিজের জন্য এবং জনগণ ও কর্মকর্তাদের জন্য কয়েকটি কথা স্মরণ করিয়ে দিই।

নামাজ মহান আল্লাহর অন্যতম সুন্দর ও মহৎ নিয়ামত। এটি দ্বীনের শ্রেষ্ঠ বিধান, প্রতীক ও স্তম্ভ এবং আমাদের প্রত্যেকের জন্য অসীম ও অবিনশ্বর ঐশী উৎসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম। কল্যাণ ও মুক্তির এই অমৃত এবং পবিত্র জীবনের স্তম্ভ একদিকে নফসের শয়তান ও পার্থিব শয়তানদের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামে দৃঢ় ও অব্যাহত অবলম্বন এবং অফুরন্ত পাথেয়; অন্যদিকে এটি ভালোবাসা, আশা, দয়া ও প্রশান্তির এক উচ্ছ্বসিত ঝরনা। নামাজ কায়েম ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর বরকত এবং তাঁর পক্ষ থেকে রিজিকের প্রাচুর্য নাজিল হয় ও বৃদ্ধি পায়।

তবে নামাজের ফরজ কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, নামাজ কায়েম করা সৎকর্মশীলদের শাসনের প্রথম ফল ও নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

اَلّذینَ اِنْ مَکَّنّاهُم فی الأرضِ اَقاموا الصَّلاة.

“তারা এমন লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা প্রদান করলে তারা নামাজ কায়েম করে।”

সূরা হজে আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এবং আল্লাহর বান্দাদের পক্ষে তাঁদের জিহাদের প্রসঙ্গের ঠিক পরেই এ আয়াতের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর প্রতি আশা ও আস্থার দৃঢ় অবলম্বন হিসেবে নামাজ কায়েমের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে জিহাদ, বিজয় ও সংগ্রামের ময়দানে সাফল্য অর্জনে—বিশেষত আজ ইরানি জাতির সামনে যে সংগ্রামের ক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে।

আজ প্রিয় ইরানি জনগণের সক্ষমতা ও শক্তির শর্ত আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত হয়েছে। অতএব, গোটা জাতির প্রতিটি সদস্য আল্লাহর এই বারবার উচ্চারিত নির্দেশের সম্বোধিত ব্যক্তি—“নামাজ কায়েম করো।”

এ ছাড়া সমাজের প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তি—বাবা-মা ও পরিবার থেকে শিক্ষক ও বন্ধু, অধ্যাপক ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব থেকে পরিচিত মুখ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা—এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করেন। একইভাবে মসজিদ, জুমার নামাজ, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, হাওযায়ে ইলমিয়া, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মী এবং জনসম্পৃক্ত সংগঠনসহ সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থারও এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষত যারা কিশোর ও তরুণদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

ইসলামের বিশুদ্ধ মুহাম্মদী (সা.)-এর পতাকা সমুন্নত এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গর্বিত একটি সমাজ ও দেশে নামাজকে তার পূর্ণতা ও বিকাশের সব পর্যায় এবং স্তরে কায়েম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী আন্দোলন ও বিপ্লবের পর্যায় থেকে ইসলামী সমাজের পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার পথ প্রস্তুতের জন্য এটি অপরিহার্য; আর এরপরই ইসলামী সভ্যতার পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব হবে।

সমাজে নামাজকে প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যাপক ও সর্বজনীন করা এবং এরপর তা সুন্দরভাবে আদায়ের জন্য সর্বসাধারণের প্রচেষ্টা—এই দুটিই এ লক্ষ্য অর্জনের প্রধান ভিত্তি। মসজিদগুলোকে আবাদ করা এবং জামাত ও জুমার নামাজের পরিমাণ বৃদ্ধি ও এর বাহ্যিক মানোন্নয়নের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের অপরিহার্য পূর্বপ্রস্তুতি। এসব ক্ষেত্রে জামাত ও জুমার ইমামদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মানুষের আশ্রয়স্থল হতে হবে এবং তাঁদের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনার ও গ্রহণ করার মতো শ্রোতা হতে হবে।

আমি আশা করি, মহান আল্লাহর অনুগ্রহ এবং আমাদের অভিভাবক ও নেতা ইমাম মাহদির (আ.ফা.) বিশেষ দৃষ্টি ও দোয়ার বরকতে আমাদের প্রিয় জাতি ও দেশ নামাজ কায়েম এবং এর ফয়েজ ও বরকত থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে সফল ও সমর্থ হবে।

সাইয়্যেদ মুজতবা হুসাইনি খামেনেয়ী
১লা অক্টোবর, ২০২৬

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha