রবিবার ৪ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:০৫
ইয়েমেনের জটিল পরিস্থিতি এড়াতে সৌদি আরব ধর্মীয় অজুহাত ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে

ইয়েমেনের এক নারী গণমাধ্যমকর্মী লিখেছেন: সৌদি আরবের নৈতিক দেউলিয়াত্ব সম্প্রতি মক্কা ও মদিনার ইসলামী পবিত্র স্থানগুলোতে হামলা চালানোর একটি নতুন ও সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ তৈরির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে মদিনার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তাদের ভণ্ডামিপূর্ণ শোকপ্রকাশ এর বহিঃপ্রকাশ। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সৌদিদের এই ‘অর্থহীন অপবাদ’-এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেওয়া।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধারা সৌদি আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এমনকি সৌদি আরবের বহু আগ্রাসী ও ভাড়াটে যোদ্ধা তাদের অস্ত্র ইয়েমেনি প্রতিরোধের কাছে সমর্পণ করেছে এবং বহু এলাকা মুক্ত হয়েছে।

ইয়েমেনি প্রতিরোধের মোকাবিলা এবং সৌদি আরবের আরোপিত অবিচারপূর্ণ অবরোধ ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যে আল সৌদ সরকার সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সানার আবাসিক এলাকাগুলোর বিরুদ্ধে বর্বর হামলা চালিয়েছে। এরপর ইয়েমেনি প্রতিরোধ মদিনা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করলে সৌদি ও মার্কিনপন্থী গণমাধ্যম মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দিতে প্রচারযুদ্ধ শুরু করে। তারা দাবি করে, হুথিরা ধর্মীয় শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এ প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের গণমাধ্যমকর্মী ও আনসারুল্লাহর নারী কমিটির সদস্য উম্মাহ মালিক খাশিব একটি বিশেষ নিবন্ধে ‘সৌদিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি ও স্পষ্ট মিথ্যাচার: ইয়েমেনের দৃঢ়তার মুখে মিথ্যার দেউলিয়াত্ব ও বাজির পরাজয়’ শিরোনামে ইয়েমেনের জনগণের ওপর সৌদি আরবের অবিচারপূর্ণ অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সৌদি ভাড়াটেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফ্রন্টে ইয়েমেনি যোদ্ধাদের সাফল্য বিশ্লেষণ করেছেন।

নিবন্ধটির অনূদিত অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

বর্তমান বিশ্ব সৌদি আরবের ইয়েমেনবিরোধী নির্মম কর্মকাণ্ডের নতুন ও সুস্পষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায় প্রত্যক্ষ করছে। এটি সামরিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অক্ষম সৌদি শাসকগোষ্ঠীর স্পষ্ট নৈতিক পতনকে প্রকাশ করছে।

সৌদি শত্রু প্রতিটি সামরিক পরাজয় ও কৌশলগত পশ্চাদপসরণের পর তুচ্ছ মিথ্যার পুনরাবৃত্তি, ধর্মীয় বক্তব্যের অপব্যবহার এবং মূল্যহীন প্রচারণার আশ্রয় নিচ্ছে-ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে তাদের অস্তিত্বের প্রভু ও পৃষ্ঠপোষকদের সেবা করার জন্য।

এই নৈতিক দেউলিয়াত্ব সম্প্রতি মক্কা ও মদিনার ইসলামী পবিত্র স্থানগুলোতে হামলা চালানোর একটি নতুন ও সম্পূর্ণ বানোয়াট মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাদের ভণ্ডামিপূর্ণ শোকপ্রকাশ এরই অংশ।

সানার সরকার ও অবিচল জাতীয় ইচ্ছার প্রতিনিধিত্বকারী ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সৌদিদের এই ‘অর্থহীন অপবাদ’-এর একমাত্র লক্ষ্য হলো সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেওয়া, বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন করা এবং নিজেদের স্পষ্ট অক্ষমতাকে আড়াল করতে নিজেদের পরাজয়কে আন্তর্জাতিকীকরণ করা-বিশেষত ইয়েমেনিদের দৃঢ় আক্রমণের মোকাবিলায় নিজেদের রক্ষা করতে না পারার অক্ষমতা।

এই জঘন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই ওহাবি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পায়।

দরবারনিযুক্ত শায়খ, যেমন সালেহ আল-ফাওযান, এবং সিনিয়র আলেমদের কাউন্সিল তাড়াহুড়ো করে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যুদ্ধ উসকে দেওয়ার ফতোয়া জারি করেন।

অথচ গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনকে ইসরায়েলি শাসনের বর্বর ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সমর্থনের প্রশ্ন এলে তারা ‘সুন্নাহ অনুযায়ী জিহাদ’-এর স্লোগান ও নীরব দোয়ার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখেন! এমনকি মসজিদুল হারামকে রাজনীতিমুক্ত রাখার অজুহাতে তারা হাজি ও ওমরাহ পালনকারীদের ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া করতেও বাধা দেন।

রিয়াদের এই নৈতিক স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ইয়েমেন সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে উম্মাহর প্রধান যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বিপ্লবের নেতা সাইয়্যেদ আব্দুল মালিক বদরুদ্দিন আল-হুথি এবং সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের প্রধান মেহদি আল-মাশশাত যেকোনো ইসরায়েলি বা মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে ইয়েমেনের পূর্ণ সংহতির নীতিগত ও অবিচল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

একই নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে ইয়েমেন লেবানন ও তার সাহসী প্রতিরোধের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ইসরায়েলি বর্বর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের সমর্থন করছে।

ইয়েমেন তার উম্মাহর মৌলিক ইস্যু থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং আজ দেশটি ইসরায়েলি-আমেরিকান জোট এবং অঞ্চলটির তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে।

এ কারণেই কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও লোহিত সাগরের ওপর ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী যখন তাদের লৌহবেষ্টনী আরও শক্ত করছে, তখন ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ইয়েমেনি বাহিনী নিয়ে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সানা প্রমাণ করেছে যে তার সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে এবং বিশ্ব আধিপত্যবাদকে আর অন্যদের ওপর সামুদ্রিক নৌচলাচল সংক্রান্ত নির্দেশ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেবে না।

ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত সত্ত্বেও সানার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার জোর দিয়ে বলেছে, যতক্ষণ না রিয়াদ ইয়েমেনের বিমানবন্দর ও বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত কঠোর ও অন্যায় অবরোধ প্রত্যাহার করে এবং তার বর্বর আগ্রাসন বন্ধ করে, ততক্ষণ সৌদি জাহাজ ছাড়া বিশ্বের সব জাহাজ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।

সৌদি আরবের অপরাধ ও ঔদ্ধত্য শুধু বানোয়াট গুজব ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ইরানের একটি বিমান আহত, অসুস্থ, শিক্ষার্থী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রে শহীদ নেতার জানাজায় অংশ নিতে যাওয়া প্রতিনিধিদলকে বহনের মানবিক মিশনে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই বিমানবন্দরের ওপর প্রকাশ্য ও বিশ্বাসঘাতক হামলার মাধ্যমে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই অপরাধ সৌদি আগ্রাসনের ঘৃণ্যতা ও নৈতিক দুর্নীতির মাত্রা প্রকাশ করে।

এছাড়া তাইজ প্রদেশের মাওয়িয়া বাজার ও আল-মাআফির জেলায় সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে আমরান, ধামার, হাজ্জাহ, সা‘দাহ ও তাইজে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা ও প্রতিশোধমূলকভাবে ধ্বংস করার ঘটনাও ঘটেছে।

সৌদি উন্মত্ততার মোকাবিলায় ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী সব ধরনের সামরিক তৎপরতা ও হামলা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। এ প্রসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সরকারি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারির সাম্প্রতিক বিবৃতি সৌদি আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।

তিনি জানান, খামিস মুশাইত ও তাইফের বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নকারী সৌদি যুদ্ধবিমান-এফ-১৫ ও টাইফুন-এবং নাজরান ও জিজান থেকে চালানো ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাসহ গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৯৪টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সানা, সা‘দাহ, তাইজ, হাজ্জাহ, আমরান ও ইব প্রদেশের বেসামরিক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং এতে নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন।

এর ফলে গত ৮ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মোট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০টিতে পৌঁছেছে।

সৌদি আরবের মনে করা উচিত নয় যে, ইয়েমেনে তাদের অপরাধ অস্বীকার করে এবং সব অপরাধকে তথাকথিত ‘বৈধতার’ নামে চাপিয়ে দিয়ে-যে বৈধতা মূলত রিয়াদের হোটেলগুলোর বৈধতা-তারা সবকিছু আড়াল করতে পারবে। ডিজিটাল গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিপত্রে তাদের সব অপরাধ ও ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষিত হচ্ছে।

সানা দৃঢ় ও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছে: তাইজ, এডেন এবং সীমান্তের বিভিন্ন ক্রসিং ও বন্দরে রিয়াদের তত্ত্বাবধানে সৌদি কর্মকর্তা ও সেনাদের মাধ্যমে মোতায়েন করা সব সামরিক সমাবেশ, ভাড়াটে বাহিনীর সমাবেশ ও অস্ত্রের মজুত ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর আগুন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বৈধ ও অনুমোদিত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

অহংকারে ডুবে থাকা সৌদি শাসকগোষ্ঠীকে জেনে রাখা উচিত, বর্তমান অভিযান উত্তেজনা বৃদ্ধির কেবল প্রথম ধাপ। ইয়েমেনের সিংহ এক পা-ও পিছিয়ে যাবে না এবং অপবাদ কিংবা ভয় দেখিয়ে তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।

সৌদি শাসকগোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে ইয়েমেন থেকে হাত গুটিয়ে না নেওয়া, অবরোধের অবসান না ঘটানো এবং ইয়েমেনের জনগণের অধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ইয়েমেনিদের ধ্বংসাত্মক হামলা বন্ধ হবে না। অন্যথায় সামনে যা আসছে, তা আল সৌদের সিংহাসনের জন্য আরও বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক হবে।

যারা সৌদি আরবের পাশে অবস্থান করছে, তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রেসিডেন্ট আল-মাশশাত ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নেওয়া উচিত। ইয়েমেনের বিপ্লবী নেতৃত্ব সৌদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, ইয়েমেনিদের বিরুদ্ধে নয়।

সানায় আমাদের অধিকার রয়েছে সৌদিদের কাছ থেকে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার। আমরা অনির্দিষ্টকাল অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকব না। প্রত্যেক ইয়েমেনির উচিত নিরপেক্ষ থাকা এবং সানার যোদ্ধাদের সৌদি আরবের মুখোমুখি হতে দেওয়া-তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার না করে।

সৌদি আরব এমনকি আল-জাওফের আল-হাজম কারাগারে নিজেদের বন্দিদেরও সবার চোখের সামনে হত্যা করেছে, যারা তাদের অনুগত বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছিল। ইতিহাসে সস্তা ভাড়াটেদের জন্য এটাই পরিণতি।

যে ব্যক্তি নিজেকে সম্মান করে, সে নিজের দেশকেও সম্মান করে এবং তার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করতে অস্বীকৃতি জানায়। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, জাতীয় নীতিগুলো অপরিবর্তিত থাকে।

‘তুমি আমার ভূমিতে অভিভাবক হিসেবে থাকবে না’-প্রত্যেক ইয়েমেনি যে স্লোগান পুনরাবৃত্তি করে এবং যার জন্য জাতীয় সংগীতেও গর্ব প্রকাশ করে-তা এখনো একটি চিরন্তন অবস্থান ও দৃঢ় পথ। উত্তর কিংবা দক্ষিণ-কোনো ইয়েমেনির জন্যই এই অবস্থান থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha