কোনো স্বামী বা স্ত্রী যদি পরিবারের জন্য করা নিজের ত্যাগ, পরিশ্রম কিংবা উপকারের কথা বারবার তুলে ধরেন, তখন অপর পক্ষের মনে বিরক্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মনে হতে পারে, ‘এত কিছু করেছ, সেটা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে কেন?’
তবে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে কাউন্সেলিংয়ের বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা ইউসুফজাদেহ মনে করেন, একটি-দুটি কথা শুনেই কাউকে ‘উপকারের কথা শোনানো মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। বরং তাঁর আচরণের পেছনের কারণটি বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
একটি বাক্যেই মানুষকে বিচার নয়
জীবনসঙ্গীর আচরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শুধু একটি বাক্য বা একটি ঘটনাকে সামনে রাখা ঠিক নয়। দেখতে হবে—তিনি কোন পরিস্থিতিতে কথাটি বলেছেন, তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল এবং এর আগে তাঁর আচরণের ধরন কেমন ছিল।
কারণ, কোনো একটি বক্তব্য কখনোই একজন মানুষের পুরো চরিত্রের পরিচয় বহন করে না।
একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে ‘উপকারের কথা শোনান’ বলা যাবে তখনই, যখন দেখা যাবে তিনি নিয়মিতভাবে প্রায় সব কাজের ক্ষেত্রেই অন্যকে নিজের করা উপকারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
তাই একটি বাক্যের ভিত্তিতে কাউকে নেতিবাচক তকমা দেওয়া সম্পর্কের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
কেন মানুষ নিজের করা কাজের কথা মনে করিয়ে দেন?
বিশেষজ্ঞের মতে, এর পেছনে অনেক সময় থাকে নিজেকে প্রমাণ করার এবং স্বীকৃতি পাওয়ার প্রয়োজন।
ভাবুন, একজন মানুষ নিয়মিত সংসারের দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের জন্য পরিশ্রম করছেন, সঙ্গীর প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখছেন, নানা দায়িত্ব কাঁধে নিচ্ছেন। কিন্তু দিনের পর দিন যদি তাঁর মনে হয়—কেউ এসব দেখছে না, কেউ তাঁর পরিশ্রমের মূল্য দিচ্ছে না—তাহলে তাঁর ভেতরে অভিমান তৈরি হতে পারে।
একসময় সেই অভিমান থেকেই তিনি নিজের করা কাজগুলোর কথা বলতে শুরু করেন।
তাঁর কথার আড়ালে তখন হয়তো আসলে একটি আকুতি থাকে— ‘আমি যে এত কিছু করছি, কেউ কি সেটা দেখছে?’
অর্থাৎ, কথাটি সব সময় অভিযোগ নয়; অনেক সময় এটি হতে পারে স্বীকৃতি পাওয়ার নীরব আবেদন।
কথার ধরন নয়, উদ্দেশ্যটাও দেখুন
জীবনসঙ্গীর কোনো কথায় উপকারের গন্ধ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে রেগে যাওয়া বা পাল্টা কথা বলা ঠিক নয়।
কারণ, কথার বাহ্যিক রূপ অনেক সময় আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, তিনি নিজের উপকারের কথা শোনাচ্ছেন; কিন্তু ভেতরে হয়তো তিনি চাইছেন একটু মনোযোগ, একটু প্রশংসা কিংবা নিজের গুরুত্বের স্বীকৃতি।
শুধু কথার ওপর ভিত্তি করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালে কী হতে পারে?
অভিমান বাড়বে। কথা কমবে। দূরত্ব তৈরি হবে। আর ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে ভুল বোঝাবুঝির একটি চক্র।
অন্যদিকে, আচরণের পেছনের কারণটি বোঝার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। তখন ঝগড়ার বদলে শুরু হতে পারে খোলামেলা কথা বলা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া।
জীবনসঙ্গীর ভালো কাজটাও দেখুন
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যিনি নিজের করা কাজের কথা বলছেন, তিনি হয়তো সত্যিই পরিবারের জন্য অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি হয়তো সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন, সঙ্গীর প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রেখেছেন কিংবা পরিবারের স্বার্থে নিজের সময় ও শ্রম দিয়েছেন।
তাহলে তাঁর এই দায়িত্বশীলতাকে স্বীকৃতি দেওয়া কি উচিত নয়? অবশ্যই উচিত।
কেউ ভালো কিছু করলে তাঁর ভালো কাজটি অন্তত স্বীকার করা এবং তাকে ধন্যবাদ জানানো দরকার। জীবনসঙ্গী নিজের অবদানের কথা মুখে বলার আগেই যদি আমরা তাঁর পরিশ্রম দেখতে পাই এবং তা স্বীকার করি, তাহলে হয়তো তাঁকে বারবার নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে না।
একটি আন্তরিক ‘তোমার এই কাজটার জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ’—অনেক সময় এমন একটি বাক্যই দীর্ঘদিনের অভিমান কমিয়ে দিতে পারে।
‘উপকারের কথা শোনানো’ নাকি ‘আমাকে দেখুন’?
বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই।
কেউ নিজের করা ভালো কাজের কথা বললেই ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি ইচ্ছা করে সঙ্গীর ওপর উপকারের বোঝা চাপাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে থাকে দেখা ও স্বীকৃতি পাওয়ার গভীর প্রয়োজন।
তিনি হয়তো বলতে চাইছেন— ‘আমি তোমার জন্য অনেক কিছু করি। তুমি কি সেটা একটু লক্ষ্য করো?’
অথবা আরও গভীরে গেলে— ‘আমার পরিশ্রমটুকু বুঝতে পারো? আমাকে কি একটু মূল্য দাও?’
তাই এমন কথার জবাব সব সময় আত্মপক্ষসমর্থন বা পাল্টা অভিযোগ দিয়ে দিতে হবে—এমন নয়।
কখনো কখনো প্রয়োজন শুধু একটু মনোযোগ দিয়ে শোনা।
তকমা নয়, মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করুন
আমরা অনেক সময় খুব দ্রুত মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করে ফেলি—ভালো বা খারাপ, স্বার্থপর বা আত্মত্যাগী, দায়িত্বশীল বা উপকারের কথা শোনানো মানুষ। কিন্তু মানুষ এতটা সরল নয়।
একটি বাক্য বাইরে থেকে হয়তো ‘উপকারের কথা শোনানো’ বলে মনে হতে পারে। অথচ সেই বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে ভালোবাসা পাওয়ার, গুরুত্ব পাওয়ার এবং নিজের অবদান স্বীকৃত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তাই জীবনসঙ্গীর কথায় বিরক্ত হওয়ার আগে একবার নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে— ‘সে কি সত্যিই আমাকে ছোট করতে চাইছে, নাকি শুধু চাইছে আমি তার পরিশ্রমটুকু দেখি?’
অনেক সময় সম্পর্কের বড় সমস্যার সমাধান বড় কোনো পদক্ষেপে নয়; বরং ছোট্ট একটি স্বীকৃতিতে।
দেখুন, শুনুন, মূল্য দিন—হয়তো আপনার জীবনসঙ্গী আসলে এতটুকুই চাইছেন।
আপনার কমেন্ট