বুধবার ৭ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:২৯
এত শহীদ ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সমাজকে বিভেদের শিকার করা উচিত নয়

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি বলেছেন, এই দেশ অসংখ্য শহীদ উৎসর্গ করেছে। এত মহান ব্যক্তিত্ব ও শহীদের অধিকারী এই দেশকে বিশৃঙ্খলা ও বিভেদের শিকার করা উচিত নয়; এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যাতে কেউ কষ্ট পান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলির সাপ্তাহিক নৈতিক শিক্ষার অধিবেশন বুধবার, ১৫ মেহর ১৪০৫ (৭ অক্টোবর ২০২৬) সকালে কোমের মসজিদে আজমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি এ অধিবেশনে জ্ঞান ও জ্ঞানশিক্ষার মর্যাদা সম্পর্কে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর একটি বর্ণনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, জ্ঞান অর্জন করা যেমন ফরজ এবং আল্লাহ অজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞান অর্জন করতে বাধ্য করেছেন, তেমনি এর পাশাপাশি-এমনকি এরও আগে-জ্ঞানীদের ওপর অন্যদের শিক্ষা দেওয়াও ফরজ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সংক্ষেপে বিষয়টি হলো-অজ্ঞ ব্যক্তির জন্য যেমন জ্ঞানী হওয়া অপরিহার্য, তেমনি জ্ঞানীর ওপরও অজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষা দেওয়া অপরিহার্য, যাতে জ্ঞানের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞানী হবে এবং আলেমরাও তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, অবশ্য সবাই জ্ঞানের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। তবে ইসলামে যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন, অন্তত সেই পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। তাই দ্বীনের মৌলিক বিষয় এবং আল্লাহর বিধানগুলোর সাধারণ সীমারেখা সম্পর্কে জানা মানুষের জন্য অপরিহার্য।

নারী ও পুরুষ মানবিক সত্তার দিক থেকে সমান

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি তাঁর বক্তব্যের অন্য অংশে নারী, নারীর মর্যাদা এবং হিজাব সম্পর্কে আগে আলোচিত বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মানবিক সত্তার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ মানুষের প্রকৃত সত্তা তার আত্মার ওপর নির্ভরশীল, আর আত্মা পুরুষ বা নারী নয়। অতএব, মানবিক সত্তার দিক থেকে নারী ও পুরুষ সমান।

তিনি এ বিষয়ে কোরআনের প্রমাণ উল্লেখ করে বলেন, পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে তিন ধরনের আয়াত রয়েছে-কিছু নারীদের সম্পর্কে, কিছু পুরুষদের সম্পর্কে এবং কিছু নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। সবাইকে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে, সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে, সবাইকে অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে এবং সবাইকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর অনুসারী হতে হবে। এগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

আরবি ভাষা ও পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোরআনে এমন কিছু অভিব্যক্তি রয়েছে, যা নারী অথবা পুরুষের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ‘আল্লাজিনা’ (الذین) শব্দটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিষয় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন সাধারণ কথাবার্তায় আমরা যখন বলি, ‘মানুষ’ মাঠে উপস্থিত হয়েছে কিংবা ‘মানুষ’ ভোট দিয়েছে, তখন সেখানে শুধু পুরুষদের বোঝানো হয় না।

তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআন হযরত মারইয়াম (সা. আ.)-কে মুমিনদের জন্য একজন সৎ মানুষের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সুতরাং নারী ও পুরুষ মানবিক সত্তার দিক থেকে অভিন্ন। আল্লাহর বিধানও বহু ক্ষেত্রে ‘আল্লাজিনা’-অর্থাৎ নারী-পুরুষ উভয়ের উদ্দেশে প্রযোজ্য। কারণ আত্মার প্রকৃত সত্তা বস্তুগত নয়; নারী বা পুরুষ হওয়া শরীরের বৈশিষ্ট্য।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি নারী-পুরুষের সমতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা যখন বলি নারী ও পুরুষ সমান, তখন এর কারণ হলো শরীরকে মাপকাঠি ধরা হয় না; বরং প্রকৃত সত্তা হলো আত্মা, যা নারীও নয়, পুরুষও নয়। এই দুই চিন্তাধারার মধ্যে তাই বড় পার্থক্য রয়েছে।

নারী-পুরুষ হওয়া শরীরের বৈশিষ্ট্য; মানবিক মর্যাদা ও সৌন্দর্য আত্মার

‘নারী-জালাল ও জামালের আয়নায়’ গ্রন্থের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নারী বা পুরুষ হওয়া শরীরের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষের প্রকৃত সত্তা, মর্যাদা ও সৌন্দর্য তার আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর আত্মা নারী বা পুরুষ নয়।

তিনি বলেন, আমাদের এসব বোন ও কন্যারা ফেরেশতাসদৃশ। তারা যদি কোনো কোনো বিষয়ে সচেতন না হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো এর জন্য আমাদেরই কোনো ঘাটতি রয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে জ্ঞানভিত্তিক ও কোমলভাবে কথা বলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তারা আমাদেরই কন্যা ও বোন। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়-উভয় জায়গাতেই জ্ঞান ও গবেষণার ভিত্তিতে বোঝাতে হবে যে, মানুষ একটি চিরস্থায়ী সত্তা এবং চিরস্থায়ী সত্তার নিজের অনন্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা উচিত।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি বলেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ও চাপ প্রয়োগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। চাপ সাময়িকভাবে সরিয়ে নিলে আবার একই সমস্যা ফিরে আসে। কিন্তু যখন মানুষের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, সে ফেরেশতাসদৃশ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে, তখন তার সামনে একটি ভিন্ন পথ খুলে যায়।

মানুষ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজের ‘আতলাস’ তৈরি করতে পারে

তিনি ‘তুঁতপাতা ও আতলাস’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, আজ পৃথিবীতে রেশম ও আতলাসের চেয়ে মূল্যবান কোনো কাপড় নেই। এই মূল্যবান কাপড় কে তৈরি করেছে? একটি রেশমকীট ছাড়া আর কে?

এই রেশমকীট বিশেষ পরিবেশে বেড়ে ওঠে ও লালিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত রেশম উৎপন্ন করে। যদি একটি তুঁতপাতা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রেশম ও আতলাসে পরিণত হতে পারে, তাহলে মানুষও জ্ঞান, শিক্ষা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফেরেশতাসদৃশ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে।

কবি বলেছেন: তুমি ফেরেশতা হয়ে যেতে পারো, যদি তার জন্য চেষ্টা করো;
তুঁতপাতাও ধীরে ধীরে আতলাসে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, তুঁতপাতা যদি আতলাসে পরিণত হতে পারে, তাহলে আমরা কেন ফেরেশতাসদৃশ হতে পারব না? পথ তো উন্মুক্ত।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি জোর দিয়ে বলেন, মানুষ যদি উন্নতি ও আত্মগঠনের পথ অতিক্রম করে, তাহলে সে ফেরেশতাসদৃশ মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে।

আমাদের তরুণদের সঙ্গে নৈতিকতা ও ধৈর্যের সঙ্গে কথা বলতে হবে

তিনি বলেন, আমাদের যেমন বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, তেমনি ধৈর্যও ধারণ করতে হবে। আমাদের সন্তান ও তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। নৈতিকতা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, শিষ্টাচার এবং মানুষের পরিস্থিতির প্রতি যত্নশীলতার মাধ্যমে আমরা এই পথ অতিক্রম করতে পারি।

মানুষ কোনো বিষয় না জানলে তার অজ্ঞতাই তার শত্রু। কিন্তু যখন সে জানতে পারে যে, সে ফেরেশতাসদৃশ হতে পারে, তখন সে সেই পথেই এগিয়ে যায়। এই ফেরেশতাসদৃশ মানবিকতার বাস্তব দৃষ্টান্ত আমাদের দেখিয়েছেন হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.), হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.) এবং ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আ.)।

মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দিন

সমাজে নৈতিক আচরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি বলেন, আমরা যদি এমন হতে পারি, তাহলে একে অপরের সঙ্গে কেন বিভেদ করব?

তিনি বলেন, কথা বলার সময় এমন কথা বলা উচিত, যাতে মানুষের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন:

﴿وَ یَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّیِّئَةَ﴾

অর্থাৎ, তারা মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করে।

তাই নৈতিকতা ও সঠিক আচরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

এত শহীদ ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সমাজকে বিভেদের শিকার করা উচিত নয়

বক্তব্যের শেষাংশে দেশের আধ্যাত্মিক সম্পদ ও বিপুলসংখ্যক শহীদের কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি বলেন, এই দেশ অসংখ্য শহীদ উৎসর্গ করেছে। এত মহান ব্যক্তিত্ব ও শহীদের অধিকারী এই দেশকে বিশৃঙ্খলা ও বিভেদের শিকার করা উচিত নয়। এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যাতে কেউ কষ্ট পান।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি বলেন, আমরা মানুষকে ফেরেশতাসদৃশ করে গড়ে তুলতে পারি, আতলাস তৈরি করতে পারি-কোনো ঝগড়া বা সংঘাত ছাড়াই। যখন আমরা এমন কাজ করতে পারি, তখন কেন-আল্লাহ না করুন-এমন কথা বলব, যা অন্যকে কষ্ট দেয়?

তিনি বলেন, আমাদের সামনে রেশমের মতো হওয়ার পথ রয়েছে; অনেক শহীদ এমনই ছিলেন। মানুষ ফেরেশতাসদৃশ হতে পারে এবং ইরানি সমাজও এমন সমাজে পরিণত হতে পারে।

শহীদদের মর্যাদা এবং এই ঐশী আমানতের ব্যাপারে সমাজের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন পবিত্র কোরআনের বরকত এবং আহলে বাইত (আ.)-এর ছায়ায় আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করেন, আমাদের শহীদ নেতাকে কারবালার শহীদদের সঙ্গে পুনরুত্থিত করেন এবং শহীদদের মাধ্যমে আমাদের কাছে অর্পিত এই ঐশী আমানত তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার তাওফিক দান করেন।

তিনি আরও দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আপনাদের প্রত্যেককে মর্যাদা, সম্মান ও মহিমা দান করেন, কোরআনের বরকতে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করেন এবং সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জনগণের সেবা করার তাওফিক দান করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha