রবিবার ১১ অক্টোবর ২০২৬ - ১৪:৫০
ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.): পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি ও কিয়ামতের দিনের সুপারিশকারিণী

শিয়া চিন্তাধারার উজ্জ্বল পরিমণ্ডলে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.আ.)-এর পবিত্র আহলে বাইত ও মানবজাতির পথপ্রদর্শক ইমামদের পরিবারে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর নাম চৌদ্দতম রাতের উজ্জ্বল চাঁদের মতো শিয়া মতাদর্শের আকাশকে আলোকিত করে আছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

সংক্ষিপ্তসার

শিয়া চিন্তাধারার উজ্জ্বল পরিমণ্ডলে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.আ.)-এর পবিত্র আহলে বাইত ও মানবজাতির পথপ্রদর্শক ইমামদের পরিবারে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর নাম চৌদ্দতম রাতের উজ্জ্বল চাঁদের মতো শিয়া মতাদর্শের আকাশকে আলোকিত করে আছে। তিনি ‘বাবুল হাওয়ায়েজ’ হযরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর কন্যা এবং হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি হিসেবে পরিচিত।

শিয়া চিন্তাধারার উজ্জ্বল পরিমণ্ডলে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত ও মানবজাতির পথপ্রদর্শক ইমামদের পরিবারে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর নাম চৌদ্দতম রাতের উজ্জ্বল চাঁদের মতো শিয়া মতাদর্শের আকাশকে আলোকিত করে আছে। তিনি ‘বাবুল হাওয়ায়েজ’ হযরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর কন্যা এবং হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি হিসেবে পরিচিত। তিনি কেবল পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার প্রতীকই নন; বরং আহলে বাইতের বর্ণিত বহু রেওয়ায়েতে তাঁকে কিয়ামতের দিন অন্যতম মহান সুপারিশকারিণী হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে।

কোমের তাঁর পবিত্র মাজার জিয়ারতকে তূসে হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর জিয়ারতের সমপর্যায়ের সওয়াব এবং তাঁর জিয়ারতকারীদের জন্য চিরস্থায়ী জান্নাতের নিশ্চয়তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে:

«مَن زَارَهَا فَلَهُ الْجَنَّةُ»[১]

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আমার বোন মাসুমাকে জিয়ারত করবে, তার জন্য জান্নাত।

এই ঐশী প্রতিশ্রুতি কোমের এই মহীয়সী নারীর সঙ্গে মুমিনদের গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্কের পরিচায়ক।

কিয়ামতের দিন পরম দয়ালু আল্লাহর অন্যতম বড় অনুগ্রহ হলো তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের সুপারিশের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমা করা। কিছু অজ্ঞ ব্যক্তি মুসলিম নারীদের মর্যাদাকে খাটো করার চেষ্টা করে এবং তাদের কেবল গৃহের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখতে চায়। কিন্তু ঐতিহাসিক ও কোরআনিক বাস্তবতা এই ধরনের নেতিবাচক ধারণাকে খণ্ডন করে।

হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁর সম্মানিত মা হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর মতোই ‘শাফিয়ায়ে মাহশার’-মহাশরের সুপারিশকারিণী-এর মর্যাদা লাভ করেছেন। যাতে হিসাবের দিনে তিনি বান্দাদের সাহায্য করতে পারেন এবং তাঁর সুপারিশের মাধ্যমে তাদের অন্তর থেকে হতাশা দূর হয়।

হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর জিয়ারত সম্পর্কে আহলে বাইতের ইমামগণ যে আমল ও দোয়া শিয়াদের জন্য বর্ণনা করেছেন, তাতে এমন একটি বাক্য রয়েছে, যা জিয়ারতকারীকে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর পবিত্র রওজার দিকে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে:

«یَا فَاطِمَةُ اشْفَعِی لِی فِی الْجَنَّةِ فَإِنَّ لَکِ عِنْدَ اللَّهِ شَأْناً مِنَ الشَّأْنِ»[২]

অর্থাৎ, হে ফাতিমা! জান্নাতের ব্যাপারে আমার জন্য সুপারিশ করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে আপনার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।

এই নূরানী বাক্যে সরাসরি জান্নাত লাভের জন্য তাঁর কাছে সুপারিশের আবেদন করা হয়েছে এবং এর কারণ হিসেবে আল্লাহর কাছে তাঁর উচ্চ মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ এই দোয়ার দুটি প্রধান ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন-উভয় ব্যাখ্যার পরিণতিই জান্নাত লাভের সুসংবাদে গিয়ে পৌঁছায়।

প্রথম দিক: জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে সুপারিশ

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, জিয়ারতকারী যখন এই মহীয়সী নারীর দরবারে উপস্থিত হন, তখন তিনি তাঁর কাছে আবেদন করেন-কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশের আগে যেন তিনি সুপারিশ করেন, যাতে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়।

এই অর্থ হযরত ইমাম সাদিক (আ.)-এর একটি রেওয়ায়েতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর জন্মের বহু বছর আগেই তিনি তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন:

কোম আমাদের ছোট কুফা। জেনে রাখো, পরম দয়ালু আল্লাহ তাঁর জান্নাতের জন্য আটটি দরজা রেখেছেন। এর মধ্যে তিনটি দরজা কোমের দিকে। আমার বংশের একজন নারী, যার নাম ফাতিমা এবং যিনি মূসার কন্যা, কোমে ইন্তেকাল করবেন। কিয়ামতের দিন তাঁর সুপারিশের মাধ্যমে আমার সমস্ত শিয়া জান্নাতে প্রবেশ করবে। [৩]

এই বর্ণনা হযরত মাসুমা (সা.আ.)-কে শিয়াদের নাজাতের অন্যতম দ্বার হিসেবে তাঁর বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।

দ্বিতীয় দিক: জান্নাতে প্রবেশের পর সুপারিশ-উচ্চ মর্যাদা লাভের জন্য

দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি এমন একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে যে, একজন মুমিন হাশরের ময়দান অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ করার পরও আহলে বাইতের এই মহীয়সী নারীর সুপারিশের প্রয়োজন হতে পারে, যাতে সে আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর সন্তুষ্টির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা-এর ২৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:

«مَنْ ذَا الَّذِی یَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ»

অর্থাৎ, কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সুপারিশের প্রকৃত অধিকার একমাত্র আল্লাহর এবং তিনি তাঁর নির্বাচিত ও যোগ্য বান্দাদের সেই সুপারিশের অনুমতি প্রদান করেন। হযরত মাসুমা (সা.আ.)ও সেই সম্মানিত বান্দাদের অন্যতম, যাঁরা আল্লাহর অনুমতিতে মুমিনদের জন্য সুপারিশ করবেন।

হযরত ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.) সূরা আম্বিয়ার ২৭-২৮ নম্বর আয়াত-

«لَا یَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُمْ بِأَمْرِهِ یَعْمَلُونَ...»

-এর তাফসিরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এখানে সম্মানিত বান্দারা হলেন আল্লাহর নবী ও ওসিগণ। তাঁরা কথা বলার ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহর নির্দেশ অতিক্রম করেন না, তেমনি কাজের ক্ষেত্রেও তাঁর আদেশ অনুসরণ করেন। আর তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।

জাবির জুফি বর্ণনা করেন, হযরত ইমাম বাকের (আ.) নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, এই মর্যাদা তাঁর এবং তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। [৪]

কোরআনের আয়াত ও আহলে বাইতের বর্ণনার আলোকে বোঝা যায়, জান্নাতেরও বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

«وَلِکُلٍّ دَرَجَاتٌ مِمَّا عَمِلُوا»

অর্থাৎ, প্রত্যেকের জন্য তাদের আমল অনুযায়ী বিভিন্ন মর্যাদা রয়েছে।

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)ও নাহজুল বালাগায় জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামতের বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, জান্নাতের অধিবাসীরা কখনো বৃদ্ধ হবে না এবং কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না। [৫]

কিন্তু এসব অফুরন্ত নিয়ামতের সর্বোচ্চ স্তরেও একজন মুমিনের আশা থাকে-হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর সুপারিশের মাধ্যমে সে যেন আল্লাহর নৈকট্যের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে এবং আহলে বাইত (আ.)-এর সান্নিধ্যে অবস্থান করতে পারে।

এ প্রত্যাশা অমূলক নয়। কারণ হযরত ইমাম রেজা (আ.) তাঁর ফুফুর জিয়ারত সম্পর্কে বলেছেন:

«مَنْ زَارَ عَمَّتِی بِقُمَّ فَلَهُ الْجَنَّةُ»[৬]

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোমে আমার ফুফুকে জিয়ারত করবে, তার জন্য জান্নাত।

এছাড়া হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর নাম তাঁর সম্মানিত মা হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর সঙ্গে একই হওয়াটিও নিছক কাকতালীয় নয়। যেমন আমিন জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-কে ব্যাখ্যা করেছিলেন, পৃথিবীতে ফাতিমা (সা.আ.)-কে ‘ফাতিমা’ বলা হয়েছে, কারণ তিনি তাঁর শিয়াদের জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং তাঁর শত্রুদের তাঁর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেন। আর আসমানে তাঁকে ‘মানসুরা’ বলা হয়েছে, কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ মুমিনদের তাঁর সাহায্যের মাধ্যমে আনন্দিত করবেন। [৭]

সুতরাং, হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) কেবল একজন পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নারীর আদর্শ এবং পবিত্রতার প্রতিচ্ছবিই নন; বরং তিনি হিসাবের দিনের একজন মহান সুপারিশকারিণী, শিয়াদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের জন্য আশার প্রতীক।

এই দুনিয়ায় তাঁর এই মহান মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান ও পরিচয় অর্জন করা পরকালে তাঁর শাফাআত লাভের পথ উন্মুক্ত করার অন্যতম মাধ্যম।

সূত্র

[১] ওসায়েলুশ শিয়া, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫৬৭।

[২] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৯৯, পৃষ্ঠা ২৬৭।

[৩] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫৭, পৃষ্ঠা ২২৮।

[৪] আল-বুরহান ফি তাফসিরিল কোরআন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮১২, হাদিস নং ৭১২৮।

[৫] নাহজুল বালাগা (সুবহি সালেহ সম্পাদিত), পৃষ্ঠা ১১৬।

[৬] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ৩১৬।

[৭] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৩, পৃষ্ঠা ৪।

লেখা: মজিদুল ইসলাম শাহ

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha