হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তরুণদের পাশাপাশি গাজার নির্যাতিত জনগণের সমর্থক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে লেখা শহীদ ইমামের চিঠিগুলোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা বিষয়ক এক সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোস্তফা হোসেইনি নিশাবুরি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, ইসলামী সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা এসব চিঠি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের জন্য ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সভার আয়োজন করবেন। এসব সভার উদ্দেশ্য শুধু চিঠিগুলোর বার্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা এবং সেগুলোকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করা।
তিনি বলেন, চিঠিগুলো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সভ্যতাগত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সত্য অনুসন্ধান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী চিন্তাবিদদের উচিত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব চিঠি নিয়ে আলোচনা করা। পরবর্তী পর্যায়ে এসব আলোচনা থেকে এমন প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যা বিশ্বের সচেতন বিবেকসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংহতি জোরদার করবে।
পশ্চিমা তরুণদের প্রতি প্রথম চিঠি: ইসলামকে সরাসরি জানার আহ্বান
শহীদ ইমামের প্রথম চিঠিটি ১৩৯৩ ফারসি সালের ১ বাহমান (২১ জানুয়ারি ২০১৫) ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সাধারণ তরুণদের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল। এ চিঠির প্রসঙ্গ তুলে ধরে হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, সে সময় ইসলামকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার জন্য নানা প্রচেষ্টা চলছিল। পশ্চিমা দেশগুলোতে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার পর সেগুলোকে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করে ধর্মটির প্রকৃত ও রহমতপূর্ণ চিত্রকে বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শহীদ ইমাম পশ্চিমা তরুণদের ইসলাম সম্পর্কে সরাসরি ও মধ্যস্থতাহীনভাবে জানার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে নির্মিত একপেশে চিত্র ও পক্ষপাতদুষ্ট বর্ণনার ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দেন।
পশ্চিমে ইসলামবিদ্বেষের ঐতিহাসিক পটভূমি সম্পর্কে চিঠিতে উত্থাপিত বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশেষভাবে ধর্মকে একটি ভীতিকর শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি এবং আবেগকে উসকে দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইসলামও এ প্রচারণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রচেষ্টার সঙ্গে পশ্চিমা শক্তিগুলোর অতীত ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টাও যুক্ত রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব শক্তি বর্ণগত সংখ্যালঘু ও অখ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, অন্য জাতির ভূখণ্ড ও সম্পদ লুণ্ঠন করেছে এবং যুদ্ধ ও সহিংসতার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ পরিস্থিতিতে ইসলামের বিরুদ্ধে ভীতি ছড়ানো জনমতকে ওই ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, প্রথম চিঠির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো পশ্চিমা সমাজের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা। শহীদ ইমাম তরুণদের তাঁদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রশ্ন রাখতে বলেন-পশ্চিমা সমাজের সাধারণ বিবেক জাগ্রত হতে কয়েক দশক, এমনকি কখনো কয়েক শতাব্দী সময় লাগে কেন? কেন অতীতের ঘটনা নিয়ে আত্মসমালোচনা করা হলেও বর্তমানের সমস্যাগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়? ইসলামি সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হবে, সে বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করা হয় কেন?
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাকাঠামো ইসলামি চিন্তাধারাকে প্রান্তিক ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখতে চায় কেন-এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি মূল্যবোধ বৃহৎ শক্তিগুলোর পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং ইসলাম সম্পর্কে বিকৃত ধারণা ছড়িয়ে দিয়ে কী স্বার্থ অর্জিত হয়, তা অনুসন্ধান করা দরকার। শহীদ ইমামের অন্যতম আহ্বান ছিল, পশ্চিমা তরুণরা যেন এসব প্রশ্ন করেন এবং পূর্বধারণা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে বাস্তবতা জানার চেষ্টা করেন।
হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, চিঠিটির লক্ষ্য এমন শিক্ষিত তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যাঁদের পড়াশোনা, প্রশ্ন উত্থাপন ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা রয়েছে। মূল বার্তা হলো, তাঁদের ও ইসলামের বাস্তবতার মধ্যে নেতিবাচক আবেগ ও আরোপিত পূর্বধারণার দেয়াল তৈরি হতে দেওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোরআনভিত্তিক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রচারের ক্ষেত্রেও এ চিঠির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা মোকাবিলার অন্যতম উপায় হলো মানুষকে সরাসরি পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ জানার সুযোগ করে দেওয়া।
দ্বিতীয় চিঠি: সন্ত্রাসবাদের শিকড় ও বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বৈত মানদণ্ড
শহীদ ইমামের দ্বিতীয় চিঠিটি ১৩৯৪ ফারসি সালের ৮ আজার (২৯ নভেম্বর ২০১৫) পশ্চিমা দেশগুলোর তরুণদের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল। হোসেইনি নিশাবুরি এ চিঠিকে সন্ত্রাসবাদের শিকড় ব্যাখ্যা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বৈত মানদণ্ডের সমালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ চিঠি লেখা হয়েছিল। ওই ঘটনাগুলো আবারও সন্ত্রাসবাদ এবং এর মানবিক পরিণতির বিষয়টিকে বিশ্বজনমতের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
তিনি আরও বলেন, শহীদ ইমাম এসব ঘটনার বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক দিক স্বীকার করার পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের প্রতি পশ্চিমা তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে অল্প সময়ে ও নির্দিষ্ট এলাকায় সংঘটিত হামলাগুলোকে ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মতো মুসলিম দেশগুলোর দীর্ঘদিনের সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, এ অংশের মূল বক্তব্য হলো, সন্ত্রাসবাদের কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগ সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন দুর্ভোগ। পশ্চিমা দেশগুলোর মানুষ যেমন সন্ত্রাসী হামলায় ব্যথা, নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ অনুভব করেন, মুসলমানেরাও একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান। তবে বহু মুসলিম সমাজ বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার মাত্রা ও ব্যাপ্তি আরও বেশি ছিল।
তিনি বলেন, চিঠিটিতে পশ্চিমা বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতার মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, মুসলিম বিশ্ব আরও বিস্তৃত পরিসরে, অধিকসংখ্যক হতাহতসহ এবং দীর্ঘ সময় ধরে সহিংসতা ও ভীতিপ্রদর্শনের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব সহিংসতার কিছু অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কয়েকটি বৃহৎ শক্তির সমর্থন পেয়েছে বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আল-কায়েদা, তালেবান ও দায়েশের মতো গোষ্ঠীর উত্থান, শক্তিবৃদ্ধি ও অস্ত্রসজ্জায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তাকফিরি ও সালাফি ধারার বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দাবি এবং কিছু শক্তির কথিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে অসংগতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তৃতীয় চিঠি: গাজার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি
হোসেইনি নিশাবুরি এরপর শহীদ ইমামের তৃতীয় চিঠির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ১৪০৩ ফারসি সালে (২০২৪) গাজা ও ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণের সমর্থক তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লেখা এ চিঠিকে তিনি আগের দুটি চিঠির ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, আগের চিঠিগুলোতে পশ্চিমা তরুণদের সত্য অনুসন্ধানের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে, বিশেষত গাজার ঘটনাবলির পর, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে ব্যাপক শিক্ষার্থী আন্দোলন দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা তাঁবু স্থাপন, সমাবেশ এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গাজার জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁরা ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান এবং ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে যুদ্ধ ও গাজায় হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, শহীদ ইমাম এ চিঠিতে গাজার নির্যাতিত নারী ও শিশুদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সচেতন তরুণদের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এসব শিক্ষার্থীর সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছেছে এবং তাঁরা একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ শুরু করেছেন।
প্রতিরোধ ফ্রন্ট, অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান ও মানবিক সংহতি
প্রতিরোধ ফ্রন্টের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হোসেইনি নিশাবুরি বলেন, শহীদ ইমাম প্রতিরোধ ফ্রন্টকে এমন একটি আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা গণহত্যা, ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার হত্যাযন্ত্র এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
তাঁর ব্যাখ্যায়, গাজার জনগণের সমর্থনে প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাহিনীর অবস্থানের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে-উভয়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়।
হোসেইনি নিশাবুরি আরও বলেন, তৃতীয় চিঠিতে কোরআনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা-অবিচলতা ও জুলুমবিরোধিতা-বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। অবিচলতা বলতে কঠিন পরিস্থিতি ও চাপের মধ্যেও সত্যের পথে দৃঢ় থাকা বোঝায়। অন্যদিকে, জুলুমবিরোধিতা হলো অন্যায় মেনে না নেওয়া এবং নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসা।
তিনি বলেন, এ দুটি নীতি বিশ্বের বিভিন্ন সমাজের সচেতন মানুষের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তি হতে পারে। ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে যাঁরা চিন্তা করেন, তাঁদের মধ্যে সংহতি গড়ে তোলারও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
পরিশেষে তিনি বলেন, অবিচলতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পৃথক আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। কারণ, এ দুটি নীতির ধর্মীয় ও কোরআনভিত্তিক গুরুত্বের পাশাপাশি মানবিক বিবেক এবং জাতিগুলোর অভিন্ন স্বভাবের সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আপনার কমেন্ট