হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম নৈতিকতা বিষয়ক পাঠে আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানি কোমের ইমাম সাদিক (আ.) ইনস্টিটিউটের মসজিদে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি এই দোয়ার প্রাথমিক বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা, মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠের মর্যাদা, ইয়াকিনের তিনটি স্তর এবং মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।
দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাক: আল্লাহ-পরিচয়সম্পন্ন মানুষ গড়ার কর্মসূচি
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাক ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর এমন একটি অত্যন্ত কার্যকর ও গঠনমূলক দোয়া, যা সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া-তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি গ্রন্থটির বিশতম দোয়া। এতে অসংখ্য মূল্যবান বিষয় রয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলো যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলে আমরা এর সমৃদ্ধ জ্ঞানভান্ডার থেকে উপকৃত হতে পারব।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সময়কার সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সে সময় আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদা মানুষের কাছে বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি তাঁদের বিরোধীরাও তাঁদের অবস্থানকে উপেক্ষা করতে পারত না। কারণ, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত উমাইয়া শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল, এসব শাসক মানবিকতা ও নৈতিকতার সঠিক পথ থেকে কতটা দূরে সরে গিয়েছিল যে, তারা রাসুলের পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে শহীদ করেছে, শহীদদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং তাঁদের নারীদের বন্দি করেছে।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি আরও বলেন, এসব ঘটনা মুসলিম সমাজে উমাইয়া শাসনের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এর ফলে আহলে বাইতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায় এবং সমাজে তাঁদের অবস্থান আরও বেশি গুরুত্ব পায়। অবশ্য আহলে বাইতের ঐশী মর্যাদা শুরু থেকেই ছিল; তবে কারবালার ঘটনার পর তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়।
কারবালার ঘটনার পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সামাজিক মর্যাদা
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর তৎকালীন সামাজিক অবস্থান বোঝাতে আয়াতুল্লাহ সুবহানি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.) যখন হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে চাইতেন, তখন প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও মানুষ তাঁর জন্য পথ করে দিত। একই সময়ে হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার জন্য মানুষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে পথ করে দিচ্ছিল না। অথচ ইমাম সাজ্জাদ (আ.) সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লোকজন সরে দাঁড়ায় এবং তিনি সহজেই হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে সক্ষম হন।
উপস্থিত লোকেরা হিশামকে জিজ্ঞেস করল, এই ব্যক্তি কে? হিশাম তাঁকে না চেনার ভান করে বললেন, তিনি জানেন না। সেই মজলিসে কবি ফারাজদাক উপস্থিত ছিলেন। তিনি ইমামকে পরিচয় করিয়ে দিতে কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তার মধ্যে একটি পঙ্ক্তি ছিল:
“هَذَا الَّذِي تَعْرِفُ الْبَطْحَاءُ وَطْأَتَهُ
وَالْبَيْتُ يَعْرِفُهُ وَالْحِلُّ وَالْحَرَمُ”
অর্থ: ইনিই সেই ব্যক্তিত্ব, যাঁর পদচিহ্নকে বাতহা ভূমি চেনে; পবিত্র কাবাঘর, হারাম এলাকা এবং তার বাইরের ভূখণ্ডও তাঁকে চেনে।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এই কবিতার মাধ্যমে ফারাজদাক ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর সুপরিচিত মর্যাদা ও সম্মানের কথা তুলে ধরেছিলেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, উমাইয়া শাসন সাফিয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর এবং আব্দুল মালিক মারওয়ান ক্ষমতায় আসার পরও ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। এ পরিস্থিতিতেও তিনি তাঁর ইমামতি ও সংগ্রামমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলেন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তার
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বিভিন্ন দোয়া সংকলন করে তাঁর শিষ্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি শিষ্যদের এসব দোয়া শিক্ষা দিতেন। পরে তাঁদের মাধ্যমে এই জ্ঞান সমাজে ছড়িয়ে পড়ত এবং মানুষের ওপর প্রভাব ফেলত। এ পথেই ইমাম তাঁর কাঙ্ক্ষিত সত্য ও বাস্তবতাগুলো তুলে ধরতে এবং সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে পারতেন।
তিনি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বহু দোয়ার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহ-পরিচয়সম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা। এখানে ‘আরিফ’ বলতে শুধু কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পরিভাষাগত অর্থে আরিফকে বোঝানো হয়নি; বরং এমন একজন মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যিনি প্রকৃত অর্থে আল্লাহকে চেনেন, নবীদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এবং উত্তম নৈতিক গুণাবলিতে সজ্জিত হন।
এই সংকলনের দোয়াগুলোর লক্ষ্য হলো এমন মানুষ গড়ে তোলা, যিনি আল্লাহর পরিচয় ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন করেছেন-অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সেবা শুধু দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিতেন, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং নানা সামাজিক সেবামূলক কাজ করতেন। তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোতে এসব কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ছিলেন শক্তিশালী ও সেবাপরায়ণ ব্যক্তিত্ব
আয়াতুল্লাহ সুবহানি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তাঁকে দুর্বল বা অক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে কল্পনা করা উচিত নয়। কখনো কখনো কিছু বক্তা তাঁকে ‘জ্বরাক্রান্ত ইমাম’ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু এই কথাটি যদি এমনভাবে বলা হয়, যাতে তাঁর দুর্বলতা ও অক্ষমতার ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তা যথাযথ নয়।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ছিলেন শক্তিশালী, পরিপক্ব ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব। তিনি রাতের বেলা খাবারের বোঝা কাঁধে নিয়ে অভাবগ্রস্তদের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। এ কাজ কোনো অক্ষম মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়; বরং এটি তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, সেবার মানসিকতা এবং অসহায় মানুষের প্রতি গভীর মনোযোগের প্রমাণ। তিনি এমনভাবে এসব কাজ করতেন, যাতে লোকদেখানো বা আত্মপ্রচারের কোনো সুযোগ না থাকে।
তিনি আরও বলেন, দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাক যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলে ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর নৈতিকতা ও জীবনাচরণের কিছু দিক মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি দরুদ দিয়ে দোয়ার সূচনা
আয়াতুল্লাহ সুবহানি দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকের প্রথম বাক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এই দোয়া শুরু করেছেন এভাবে:
“بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِیمِ، اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَی مُحَمَّدٍ وَآلِهِ، وَبَلِّغْ بِإِیمَانِی أَکْمَلَ الْإِیمَانِ، وَاجْعَلْ یَقِینِی أَفْضَلَ الْیَقِینِ، وَانْتَهِ بِنِیَّتِی إِلَی أَحْسَنِ النِّیَّاتِ...”
অর্থ: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ প্রেরণ করুন। আমার ঈমানকে ঈমানের সর্বোচ্চ পূর্ণতায় পৌঁছে দিন, আমার বিশ্বাসকে বিশ্বাসের সর্বোত্তম স্তরে উন্নীত করুন এবং আমার নিয়তকে সর্বোত্তম নিয়তের পর্যায়ে পৌঁছে দিন…
তিনি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর দোয়া দরুদ দিয়ে শুরু করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর সব দোয়াই দরুদ দিয়ে শুরু হয়েছে। এ থেকে প্রশ্ন জাগে, তিনি কেন দোয়ার শুরুতে দরুদ পাঠ করতেন?
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, বর্ণনায় এসেছে যে দরুদের মতো এমন কোনো দোয়া নেই, যা প্রত্যাখ্যাত হয়। কারণ, আল্লাহ দরুদ কবুল করেন। কেউ যখন বলে, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলে মুহাম্মাদ”-অর্থাৎ, হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ প্রেরণ করুন-তখন আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্ণনায় এসেছে, কেউ যদি নিজের দোয়া দরুদ দিয়ে শুরু করে এবং এরপর আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের আবেদন জানায়, তাহলে আল্লাহ বলেন-প্রথম দোয়াটি কবুল করে দ্বিতীয়টি প্রত্যাখ্যান করা শোভনীয় নয়। যেহেতু প্রথম দোয়াটি আমি কবুল করেছি, তাই আমার দয়া ও করুণার দাবি হলো, পরবর্তী দোয়াটিও কবুল করা। এ কারণে দোয়ার শুরুতে দরুদ পাঠের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং তা আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ এবং অন্য নবীদের সম্পর্কে কোরআনের ভাষার পার্থক্য
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের বিষয়টি অন্য নবীদের সম্পর্কে ব্যবহৃত কোরআনের অভিব্যক্তি থেকে আলাদা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ইবরাহিমের প্রতি সালাম” এবং “মূসা ও হারুনের প্রতি সালাম”; একইভাবে ইলিয়াসের অনুসারীদের প্রতিও সালামের কথা এসেছে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِکَتَهُ یُصَلُّونَ عَلَی النَّبِیِّ”
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন।
তিনি বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ নিজে এবং তাঁর ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর মুমিনদেরও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে অন্য নবীদের সম্পর্কে ব্যবহৃত ‘সালাম’ অভিব্যক্তির তুলনায় মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদের বিষয়টি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি মহানবী (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থানের পরিচায়ক।
মহানবী (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে দরুদ পাঠের ওপর গুরুত্বারোপ
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর দরুদ পাঠের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উমাইয়া, মারওয়ানি ও আব্বাসীয় শাসনামলে দরুদ পাঠের প্রচলিত রীতিতে পরিবর্তন ঘটানো হয়। মহানবী (সা.) নিজে যেভাবে দরুদ পাঠ করতে শিখিয়েছিলেন, তার বর্ণনা সহিহ বুখারি এবং সম্ভবত সহিহ মুসলিমেও রয়েছে।
তিনি বলেন, সাহাবিরা মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার প্রতি কীভাবে দরুদ পাঠ করব? উত্তরে তিনি শিখিয়েছিলেন:
“اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَی مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ، کَمَا صَلَّیْتَ عَلَی إِبْرَاهِیمَ وَآلِ إِبْرَاهِیمَ، إِنَّکَ حَمِیدٌ مَجِیدٌ”
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ প্রেরণ করুন, যেভাবে আপনি ইবরাহিম ও ইবরাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ প্রেরণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এই হাদিসে মহানবী (সা.) দরুদ পাঠের পদ্ধতি শেখানোর সময় তাঁর আহলে বাইতের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ‘মুহাম্মদ ও আলে মুহাম্মদ’-এর প্রতি দরুদ পাঠ মহানবী (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতি।
তিনি আরও বলেন, আহলে সুন্নাতের অনেক বইয়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি’ বাক্যটির পরিবর্তে সাধারণত ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লেখা হয়। মিসরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রকাশিত বইয়ে এ ধরনের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আহলে বাইতের নাম উল্লেখ করার পর সাহাবিদের নামও যুক্ত করা হয়। যেমন, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া আসহাবিহি-অর্থাৎ, হে আল্লাহ! মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবিদের প্রতি দরুদ প্রেরণ করুন-অথবা তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের প্রতি” বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি কাতারের একজন বিশিষ্ট ফকিহ শায়খ আলী কারাদাগির সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্র বিনিময়ের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় কারাদাগি আহলে সুন্নাতের পঞ্চাশজন আলেমের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, কারাদাগির কাছে লেখা চিঠিতে তিনি প্রচলিত এ ধরনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মহানবী (সা.) যখন দরুদ পাঠের পদ্ধতি শিখিয়েছেন, তখন তিনি স্পষ্টভাবে “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলে মুহাম্মাদ…” বলেছেন। অথচ কিছু বই ও লেখায় এই বাক্য ভিন্নভাবে উদ্ধৃত করা হয় অথবা আহলে বাইতের নামের সঙ্গে সাহাবিদের নাম যুক্ত করা হয়।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি জানান, জবাবে পাঠানো চিঠিতে তাঁর বক্তব্যকে সঠিক বলা হয়েছিল এবং এমন দুটি সহিহ বর্ণনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে একই পদ্ধতিতে দরুদ পাঠের বর্ণনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ধীরে ধীরে এসব পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে এবং মহানবী (সা.)-এর শেখানো দরুদ পাঠের পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইনশাআল্লাহ, দোয়া ও দরুদের মাধ্যমে আমরা সত্যকে তুলে ধরব। ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর সব দোয়া-এমনকি দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাক ও দোয়ায়ে মারদিয়্যিল আফআলও-দরুদ দিয়ে শুরু হয়েছে।
“আমার ঈমানকে ঈমানের সর্বোচ্চ পূর্ণতায় পৌঁছে দিন”
আয়াতুল্লাহ সুবহানি দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকের পরবর্তী অংশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, দরুদের পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) দোয়া করেন:
“اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَی مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ، وَبَلِّغْ بِإِیمَانِی أَکْمَلَ الْإِیمَانِ”
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি দরুদ প্রেরণ করুন এবং আমার ঈমানকে ঈমানের সর্বোচ্চ পূর্ণতায় পৌঁছে দিন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এই দোয়ায় প্রথমেই আল্লাহর কাছে নিজের ঈমানকে পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করার আবেদন জানিয়েছেন।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এই বাক্য থেকে বোঝা যায় যে ঈমানের বিভিন্ন স্তর রয়েছে; এটি কোনো একটিমাত্র স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। ইমাম যখন বলেন, আমার ঈমানকে ঈমানের সর্বোচ্চ পূর্ণতায় পৌঁছে দিন, তখন স্পষ্ট হয় যে ঈমান এক স্তর থেকে অন্য উচ্চতর স্তরে উন্নীত হতে পারে। তাই মানুষের উচিত ঈমানের উৎকর্ষ সাধনের পথে অগ্রসর হওয়া।
তিনি বলেন, সাধারণভাবে ইসলামের তিনটি মৌলিক বিষয় হিসেবে আল্লাহর প্রতি স্বীকৃতি, রাসুলের প্রতি স্বীকৃতি এবং পরকালের প্রতি স্বীকৃতির কথা বলা হয়। এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য; তবে এটি ঈমানের প্রাথমিক স্তর। ঈমান শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরবর্তী স্তরে আমল বা কাজকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। ঈমানের সঙ্গে আমল যুক্ত না হলে তা শুষ্ক ও অপূর্ণ থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, উয়ুনু আখবারির রিযা গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১৩৬ পৃষ্ঠায় একটি বর্ণনা রয়েছে:
“الْإِیمَانُ مَعْرِفَةٌ بِالْقَلْبِ، وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالْأَرْکَانِ”
অর্থ: ঈমান হলো অন্তরের মাধ্যমে উপলব্ধি, জিহ্বার মাধ্যমে স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল।
এই বর্ণনা অনুসারে, মানুষের অন্তরে বিশ্বাস ও উপলব্ধি থাকতে হবে, মুখে তা স্বীকার করতে হবে এবং কাজের মাধ্যমেও ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করতে হবে। ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের ক্ষেত্রে মানুষের উচিত নিজের সামর্থ্য ও সক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়ন করা, এমনকি খুঁটিনাটি বিষয়েও যত্নবান থাকা।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যখন ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর দোয়া করেন, তখন তিনি শুধু আল্লাহ, রাসুল ও পরকালের প্রতি স্বীকৃতির কথা বোঝান না; বরং অন্তরের উপলব্ধি, মুখের স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী আমল-সব ক্ষেত্রেই ঈমানের পূর্ণতা অর্জনের কথা বোঝান।
পবিত্র কোরআনে ঈমান ও সৎকর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, পবিত্র কোরআনেও ঈমান ও সৎকর্মের সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বহু আয়াতে এ দুটিকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে:
“إِلَّا الَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ”
অর্থ: তবে তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে।
এই কোরআনিক বক্তব্য অনুসারে, ঈমানের সঙ্গে সৎকর্মও অপরিহার্য। ঈমানের একটি প্রাথমিক স্তর রয়েছে, কিন্তু মানুষকে উন্নতি ও পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিতে এর সঙ্গে সৎকর্ম যুক্ত করতে হয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, শুধু আল্লাহ, রাসুল ও পরকালের প্রতি স্বীকৃতি এবং ধর্মীয় বিধান পালন করাই কি ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট? তাঁর উত্তর হলো, ঈমানের আরও উচ্চতর স্তর রয়েছে। মানুষ জ্ঞান, উপলব্ধি ও দৃঢ় বিশ্বাসের পথে এগিয়ে গিয়ে আরও উন্নত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ইয়াকিনের তিনটি স্তর: ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন
ঈমানের উচ্চতর স্তর ব্যাখ্যা করতে আয়াতুল্লাহ সুবহানি সুরা তাকাসুরের আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে এসেছে:
“کَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْیَقِینِ، لَتَرَوُنَّ الْجَحِیمَ”
অর্থ: কখনোই নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানের মাধ্যমে জানতে, তবে অবশ্যই জাহান্নাম দেখতে পেতে।
এই আয়াতগুলো ‘ইলমুল ইয়াকিন’ বা নিশ্চিত জ্ঞানের কথা তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইয়াকিন বা দৃঢ় বিশ্বাসেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। ঈমান শুধু মুখে স্বীকৃতি দেওয়া কিংবা বাহ্যিকভাবে কিছু আমল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের উচিত গভীরতর জ্ঞান ও নিশ্চিত বিশ্বাস অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, ঈমানের উচ্চতম স্তর এমন পর্যায়, যেখানে মানুষ জাহান্নাম ও পরকালের শাস্তির বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। এখানে উদ্দেশ্য আখিরাতের জাহান্নামকে সরাসরি দেখা নয়; বরং বারযাখি জাহান্নামের বাস্তবতা উপলব্ধি করা।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি আরও বলেন, ঈমানের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো ব্যক্তিরা কখনো কখনো এই পৃথিবী থেকেই জাহান্নামের আগুন ও জান্নাতের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করার মতো উপলব্ধি অর্জন করেন। তবে এটি ইয়াকিনের চূড়ান্ত স্তর নয়। আলেমরা সাধারণত ইয়াকিনকে তিনটি স্তরে ভাগ করেন:
- ইলমুল ইয়াকিন: জ্ঞানের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া।
- আইনুল ইয়াকিন: প্রত্যক্ষভাবে দেখে নিশ্চিত হওয়া।
- হাক্কুল ইয়াকিন: সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি করা।
তিনি আগুনের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। কেউ যখন শোনে যে আগুনের শিখা রয়েছে এবং তা তাপ উৎপন্ন করে, তখন সে শোনা ও জানার মাধ্যমে আগুন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। এটি ইলমুল ইয়াকিনের উদাহরণ।
এর পরের স্তরে মানুষ আগুনকে নিজের চোখে দেখে। এটি আইনুল ইয়াকিন-অর্থাৎ, প্রত্যক্ষভাবে দেখে সত্য উপলব্ধি করা।
আরও উচ্চতর স্তর হলো হাক্কুল ইয়াকিন। যেমন, কেউ আগুনের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে তার তাপ অনুভব করে। তখন সে শুধু শোনা বা দেখার মাধ্যমে নয়, সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আগুনের বাস্তবতা উপলব্ধি করে। এভাবে ইলমুল ইয়াকিন, আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিন হলো জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের তিনটি পৃথক স্তর।
দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকে সর্বোত্তম ইয়াকিনের প্রার্থনা
আয়াতুল্লাহ সুবহানি আবার দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকের বক্তব্যে ফিরে এসে বলেন, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) দোয়া করেন:
“وَبَلِّغْ بِإِیمَانِی أَکْمَلَ الْإِیمَانِ، وَاجْعَلْ یَقِینِی أَفْضَلَ الْیَقِینِ”
অর্থ: আমার ঈমানকে ঈমানের সর্বোচ্চ পূর্ণতায় পৌঁছে দিন এবং আমার ইয়াকিনকে ইয়াকিনের সর্বোত্তম স্তরে উন্নীত করুন।
এখানে ইমাম শুধু ঈমান বৃদ্ধির আবেদন করেননি; বরং আল্লাহর কাছে তাঁর ইয়াকিনকেও সর্বোত্তম স্তরে উন্নীত করার প্রার্থনা করেছেন।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, মানুষের উচিত ঈমান, আমল, পবিত্রতা, তাকওয়া ও রাতের ইবাদতের মাধ্যমে এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করা, যেখানে তার সামনে থেকে অজ্ঞতা ও অবহেলার পর্দা সরে যায় এবং সে এমন কিছু সত্য উপলব্ধি করতে পারে, যা অন্যদের কাছে অদৃশ্য। এই উপলব্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে মানুষ এই পৃথিবী থেকেই বারযাখি জাহান্নামের কিছু বাস্তবতা উপলব্ধি করে।
মুত্তাকিদের সম্পর্কে আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বর্ণনা: যেন তারা জান্নাত ও জাহান্নাম দেখছেন
আয়াতুল্লাহ সুবহানি নাহজুল বালাগা থেকে একটি বক্তব্য উল্লেখ করেন। এক ব্যক্তি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর কাছে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার অনুরোধ করেন। উত্তরে তিনি পরহেজগারদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। এর একটি অংশে বলা হয়েছে:
“فَهُمْ وَالْجَنَّةُ کَمَنْ قَدْ رَآهَا فَهُمْ فِیهَا مُنَعَّمُونَ، وَهُمْ وَالنَّارُ کَمَنْ قَدْ رَآهَا فَهُمْ فِیهَا مُعَذَّبُونَ”
অর্থ: জান্নাতের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এমন, যেন তাঁরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সেখানে নিয়ামত ভোগ করছেন। আর জাহান্নামের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এমন, যেন তাঁরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সেখানে শাস্তি ভোগ করতে দেখছেন।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মুত্তাকিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঈমান ও ইয়াকিনের উচ্চতর স্তর অর্জন করা। এ পর্যায়ে অবহেলা ও অজ্ঞতার পর্দা সরে যায় এবং মানুষ এমন কিছু বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অদৃশ্য থাকে।
সাধারণ পরিস্থিতিতে মানুষ এসব বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে পারে না, কারণ তার সামনে বিভিন্ন আড়াল রয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ আত্মশুদ্ধি ও ঈমানের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করার মাধ্যমে এমন অবস্থানে পৌঁছান, যেখানে এসব আড়াল তাদের সামনে থেকে সরে যায়।
ইমাম সাদিক (আ.)-এর এক সঙ্গীর ঘটনা ও উচ্চতর বিশ্বাসের স্তর
আয়াতুল্লাহ সুবহানি ইমাম সাদিক (আ.)-এর এক নিষ্ঠাবান সঙ্গী সম্পর্কে একটি বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একবার ইমামের উপস্থিতিতে একটি চুল্লি জ্বলছিল। তখন ইমাম তাঁর এক সঙ্গীকে সেই চুল্লির মধ্যে প্রবেশ করতে বললেন। ওই ব্যক্তি কোনো দ্বিধা না করে উঠে দাঁড়ালেন, চুল্লির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার ভেতরে বসে পড়লেন। কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং তিনি পুড়েও যাননি।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এমন ঈমান মানুষকে ইয়াকিনের এমন স্তরে পৌঁছে দিতে পারে, যেখানে তার আচরণ সাধারণ বাহ্যিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে মেলে না।
আত্মশুদ্ধি ও কিছু ভোগবিলাস ত্যাগ: ঈমান উন্নত করার পথ
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ইয়াকিনের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো সহজ নয়। এর জন্য আত্মশুদ্ধি, রাতের ইবাদত, কষ্ট সহ্য করা, স্বেচ্ছায় কিছু ভোগবিলাস থেকে বিরত থাকা এবং নিজের কিছু প্রবৃত্তিগত আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা প্রয়োজন।
মানুষকে নিজের কিছু ইচ্ছা ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসতে হবে, যাতে তার জন্য ঈমান ও ইয়াকিনের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর পথ তৈরি হয়। তাই আল্লাহর কাছে এমন ঈমান ও ইয়াকিন প্রার্থনা করা উচিত, যা শুধু দাবি বা মুখের স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানুষের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে এবং তার আচরণ ও জীবনে প্রভাব ফেলে।
এরপর আয়াতুল্লাহ সুবহানি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর বক্তব্য থেকে মুত্তাকিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন:
“عَظُمَ الْخَالِقُ فِی أَنْفُسِهِمْ، فَصَغُرَ مَا دُونَهُ فِی أَعْیُنِهِمْ”
অর্থ: তাদের অন্তরে স্রষ্টা মহান হয়ে উঠেছেন; ফলে তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু তাদের চোখে ক্ষুদ্র হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এই বক্তব্য মুত্তাকিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। তাঁদের অন্তর ও আত্মায় আল্লাহর মহত্ত্ব এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, দুনিয়ার বিষয়, ক্ষমতা ও সম্পদের চাকচিক্য আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে আগের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। প্রকৃত মুত্তাকি সেই ব্যক্তি, যার কাছে আল্লাহ মহান এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র।
শত্রুর হুমকির মুখে অবিচল থাকা আল্লাহর মহত্ত্বের প্রকাশ
আয়াতুল্লাহ সুবহানি মারওয়ানি শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সে সময় জিয়াদ ইবনে আবিহি কুফায় অবস্থান করছিলেন। তিনি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর এক সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য ডেকে পাঠান।
লোকটিকে তাঁর সামনে হাজির করা হলে সে বলল, তার মনিব তাকে আগেই জানিয়েছেন যে জিয়াদ তাকে এভাবেই হত্যা করবেন-তার হাত-পা কেটে দেবেন এবং তাকে শূলে চড়াবেন। জিয়াদ ইবনে আবিহি উত্তরে বলেন, তিনি সত্যিই এসব কাজ করবেন।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ওই ব্যক্তি নিজের শত্রুর সামনেও তার ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা নির্ভয়ে বলেছিল এবং তার মনিবের কাছ থেকে যা শুনেছিল, তা প্রকাশ করেছিল।
তিনি বলেন, এই ঘটনাকে মুত্তাকিদের অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যায়। যার কাছে আল্লাহ মহান, সে দুনিয়ার হুমকি ও শত্রুর বাহ্যিক ক্ষমতার সামনে সহজে ভীত বা বিচলিত হয় না।
অন্তর্দৃষ্টি ও অন্যের সম্পদ থেকে বিরত থাকা: আয়াতুল্লাহ হায়েরির ঘটনা
আয়াতুল্লাহ সুবহানি মরহুম আয়াতুল্লাহ হায়েরি (রহ.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।
বর্ণিত হয়েছে, তিনি একবার একটি বাগানে গিয়েছিলেন। সেখানে আঙুর দেখে তাঁর তা খেতে ইচ্ছা হলো। বিষয়টি বুঝতে পেরে এক ব্যক্তি পাশের প্রতিবেশীর দেয়াল টপকে কিছু আঙুর পেড়ে এনে তাঁর সামনে রাখল। কিন্তু মরহুম আয়াতুল্লাহ হায়েরি সেই আঙুর থেকে একটিও খেলেন না।
কেন তিনি আঙুর খেলেন না? এই ঘটনার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তাঁর ইয়াকিন ও অন্তর্দৃষ্টি তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে আঙুরগুলো অন্য ব্যক্তির সম্পত্তি। বাগানের মালিকের অনুমতি ছাড়া সেগুলো নেওয়া ও খাওয়া বৈধ নয়।
আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, আমাদের চোখে বিষয়টি হয়তো কয়েকটি আঙুরের থোকা মাত্র; কিন্তু ওই ব্যক্তিত্ব বাহ্যিক দৃশ্যের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন।
প্রাথমিক ঈমান থেকে উচ্চতর ইয়াকিনের স্তরে অবিরাম অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন
বক্তব্যের উপসংহারে আয়াতুল্লাহ সুবহানি বলেন, ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.) দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকে যেভাবে প্রার্থনা করেছেন, সেভাবে আমাদেরও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত-তিনি যেন আমাদের ঈমানকে সর্বোচ্চ পূর্ণতার স্তরে পৌঁছে দেন এবং আমাদের ইয়াকিনকে সর্বোত্তম স্তরে উন্নীত করেন।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এই দোয়ার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দেন যে, মানুষ যে স্তরের ঈমান অর্জন করেছে, তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে থেমে থাকা উচিত নয়। বরং জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও দৃঢ় বিশ্বাসের পথে নিরন্তর অগ্রসর হওয়া উচিত।
আপনার কমেন্ট