শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২৬ - ০৭:১২
ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও শিয়া-সুন্নির অংশগ্রহণ জাতীয় ও ধর্মীয় ঐক্যের প্রতিফলন: সুন্নি আলেম

ইরানের বিশিষ্ট সুন্নি, কুর্দিস্তান প্রদেশের জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য মামুস্তা ইকবাল বাহমানি বলেছেন, কুরআনের দৃষ্টিতে বেসাতের মূল তাৎপর্য হলো মানুষকে জুলুম, স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করা এবং ঐশী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর মতে, ইরানি জনগণের জাগরণ ইসলামী জাগরণ এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মাহর ঐক্য জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: বুধবার (২৮ অক্টোবর) ‘কাদেমুন ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি’র উদ্যোগে আয়োজিত ‘মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মাহর জাগরণ’ শীর্ষক সপ্তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন মামুস্তা ইকবাল বাহমানি।

বক্তব্যে বে’সাতের কুরআনিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বে’সাত হলো মানুষকে জুলুম ও স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করা, ঐশী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

পবিত্র কুরআনের সুরা জুমুআর দ্বিতীয় আয়াত—‘তিনিই উম্মিদের মধ্য থেকে তাদেরই একজনকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন’—উল্লেখ করে বাহমানি বলেন, কুরআনে বেসাতের ধারণা কেবল সাময়িক জাগরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থ হলো কাউকে জাগিয়ে তোলা, গতিশীল করা এবং সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেরণ করা। নবী-রাসুলদের প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে পাপ, জুলুম ও তাগুতের আধিপত্যের অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের দিকে পরিচালিত করা।

তিনি বলেন, জাগ্রত উম্মাহকে নবী-রাসুলদের দায়িত্বই পালন করতে হবে। অর্থাৎ, কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়া, মানুষের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করা এবং সমাজের সংস্কার সাধন করা। এ প্রসঙ্গে তিনি হাসান বসরি, শেখ আবদুল কাদের জিলানি ও বাহাউদ্দিন নকশবন্দির মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের জীবনাদর্শের উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং তাগুতের আধিপত্য থেকে মুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মামুস্তা বাহমানি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বেসাতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক গুণাবলির পূর্ণতা সাধন। এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবী (সা.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করেন, ‘আমি উত্তম নৈতিক গুণাবলিকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’

তাঁর মতে, নবী-রাসুলদের বেসাতের শিক্ষা জাহেলি যুগের মূল্যবোধ, গোত্রীয় গোঁড়ামি, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিপরীত। এর লক্ষ্য হলো মানুষের নৈতিক মান উন্নত করা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সংস্কার সাধন।

ইরানি জনগণের জাগরণ প্রসঙ্গে বাহমানি বলেন, একে জ্ঞানভিত্তিক জাগরণ এবং চিন্তা ও মূল্যবোধের কাঠামোয় গভীর পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই জাগরণ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার স্বৈরাচার, আধিপত্যবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষার দিকে আকৃষ্ট করেছে।

জাতিগত ও ধর্মীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কুর্দি, তুর্কি, ফারসি, আরব ও বেলুচসহ ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপস্থিতি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে শিয়া ও সুন্নিদের অংশগ্রহণ জাতীয় ও ধর্মীয় সংহতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পবিত্র কুরআনের ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই’ এবং ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না’—এই নির্দেশনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামী উম্মাহর জাগরণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা।

ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সমাবেশে প্রতিরোধের প্রতীক এবং ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকার উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন বাহমানি। তাঁর মতে, এসব ঘটনা ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্ববাসীর ক্রমবর্ধমান মনোযোগ এবং বিশ্বজনমতে ইরানের ঘটনাবলির প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

বাহমানি আরও বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন জাতিকে প্রভাবিত করতে তিনটি কৌশল ব্যবহার করে—হুমকি, প্রলোভন এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি। এসব চাপ মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি মহানবী (সা.)-এর আরেকটি হাদিস উদ্ধৃত করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতি শতাব্দীর শুরুতে এই উম্মাহর জন্য এমন কাউকে পাঠাবেন, যিনি তাদের দ্বীনকে নবায়ন করবেন।’ এ প্রসঙ্গে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারাবাহিক পুনর্জাগরণ এবং চিন্তা ও সমাজজীবনের বিচ্যুতি সংশোধনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর চিন্তাধারায় ‘মুহাম্মদি প্রকৃত ইসলাম’ ও ‘আমেরিকান ইসলাম’-এর পার্থক্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বাহমানি বলেন, প্রকৃত ইসলাম মহানবী (সা.)-এর মূল্যবোধ, স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বক্তব্যের শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, মুসলমানরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), আহলে বাইত (আ.), আল্লাহর ওলি এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শ অনুসরণ করে ইসলামী মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করা, ঐক্য জোরদার করা এবং জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পথে এগিয়ে যাবেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha