শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:৫৩
যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই ইরানের উদ্যোগে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে

ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক আব্দুল বারি আতওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কথিত শোচনীয় পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই ইরানের উদ্যোগে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম রাই আল-ইয়াওম-এর প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল বারি আতওয়ান তাঁর সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে হরমুজ প্রণালির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তিনি লিখেছেন, একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে-‘পানিই ডুবুরির মিথ্যা প্রকাশ করে দেয়।’ সামান্য পরিবর্তনসহ এই প্রবাদটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও আক্ষরিক অর্থে প্রযোজ্য। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর পরিস্থিতি এবং সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরানের কথিত হামলা ও ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যের অসারতা প্রকাশ করছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের অসারতা প্রকাশ

আতওয়ান আরও বলেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ বিষয়টি এবং আগামী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য পরাজয়ের বিষয়টি স্পষ্ট করে। নির্বাচনের বাকি রয়েছে মাত্র পাঁচ দিন।

প্রথম ঘটনা: গত বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ দিকের নৌপথ দিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করার সময় তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার সমুদ্র মাইনের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায় এবং ডুবে যায়। অথচ এর মাত্র এক দিন আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, ইরান কর্তৃক স্থাপন করা সব সমুদ্র মাইন প্রণালির প্রধান নৌপথ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনা: কৃষ্ণসাগরে বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে তিনটি অজ্ঞাতপরিচয় ড্রোনের হামলায় একটি ইসরায়েলি কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবে গেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪২১টি কনটেইনার বহনকারী ওই জাহাজটি অধিকৃত ফিলিস্তিনের হাইফা বন্দর থেকে যাত্রা করেছিল। এসব কনটেইনারের কয়েকটিতে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক পদার্থ ছিল বলে জানা গেছে।

আতওয়ান তাঁর নিবন্ধে আরও লিখেছেন, প্রথম ঘটনা অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার সমুদ্র মাইনের সংস্পর্শে এসে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। তবে এটি আবারও প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন খুব কম সপ্তাহই যায়, যখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলো হামলার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায় না। এর পাশাপাশি কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এমকিউএম-১৭০ মডেলের একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

রাই আল-ইয়াওম-এর প্রধান সম্পাদক আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর বারবার হামলার বাস্তবতা ট্রাম্পের সব দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প দাবি করছেন, এই প্রণালিতে নৌ চলাচল সংকটের আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে এবং প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা হচ্ছে।

এই ফিলিস্তিনি লেখক আরও উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় ঘটনা অর্থাৎ কৃষ্ণসাগরে ইসরায়েলি জাহাজ ডুবে যাওয়ার পেছনে যদি ইরানের হাত থাকে, তাহলে এর অর্থ হলো দেশটি তার হুমকি বাস্তবায়নের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটি এবং লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ভৌগোলিক পরিধি বিস্তৃত করার পথে এগোচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্পের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি

আতওয়ান তাঁর নিবন্ধের পরবর্তী অংশে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ির কাছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের পাঠানো চিঠি সম্পর্কে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উল্লেখ করেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ আলোচনার পর বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে ভ্যান্সের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়িকে চিঠি পাঠানোর ঘটনা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সমাধানের ব্যর্থতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ও সরাসরি স্বীকারোক্তিরই ইঙ্গিত বহন করে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ মরিয়া প্রচেষ্টা। এর উদ্দেশ্য হলো বড় ধরনের নির্বাচনী পরাজয় থেকে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলকে রক্ষা করা।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই দাবি যে তিনি তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেননি, তা তাঁদের মধ্যে মতবিরোধের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি এটি এমন সম্ভাবনাও তুলে ধরে যে, ভ্যান্স হয়তো ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে নিজেকে নির্বাচনের পর রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য পরবর্তী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই ইরানের উদ্যোগে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে

রাই আল-ইয়াওম-এর প্রধান সম্পাদক আরও উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সিরিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নেওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে এসব ঘাঁটির ধ্বংসের ঘটনাকে তিনি এই পরিস্থিতির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

আতওয়ান তাঁর নিবন্ধের শেষাংশে কয়েক দিন আগে মক্কা জোটের সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদলের ইরান সফরের বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র-সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করতে তেহরান সফর করেছে। এই ঘটনা হয়তো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে একটি বাস্তবতা স্বীকার করারই ইঙ্গিত বহন করে। আর তা হলো, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও উপস্থিতি কমে আসছে এবং দেশগুলো এখন স্বনির্ভরতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতামুক্ত একটি স্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha