রবিবার ১ নভেম্বর ২০২৬ - ১৪:০৭
শত শত গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ইউরোপজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের পুনরুত্থান

গত রাত ও দিনজুড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আবারও ক্ষুব্ধ তরুণদের ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। এসব বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, গতকাল শনিবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে জীবনযাত্রার কঠিন পরিস্থিতি ও নানা সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

জার্মানি

ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের পর শনিবার জার্মানিতেও তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

জার্মানিজুড়ে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ (Gen Z Regelt) নামের একটি উদ্যোগের আয়োজনে তরুণদের দেশব্যাপী বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে গত রাতের অস্থিরতার পর পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, শহরজুড়ে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের কেন্দ্রস্থলে সংঘটিত সহিংসতার সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং বিভিন্ন দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে আটক করে।

জার্মানির কোলন শহরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কোলন পুলিশের প্রধান ইয়োহানেস হারমানস শহরজুড়ে শেষ মুহূর্তে মিছিল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এদিকে জার্মানির ধাতব ও বৈদ্যুতিক শিল্পে আইজি মেটাল (IG Metall) ইউনিয়ন গত রাত থেকে সতর্কতামূলক ধর্মঘট শুরু করেছে। মধ্যরাতে ধর্মঘট না করার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেটের আন্ডারনাখে অবস্থিত থাইসেনক্রুপ রাসেলস্টেইন (Thyssenkrupp Rasselstein) কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রাতের শিফটের শ্রমিকেরা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করে দেন।

প্রায় ৩০০ কর্মচারী কারখানার প্রবেশপথের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই ধরনের কর্মসূচি গত রাত থেকে মিউনিখের মোবাইল যোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরএফ ৩৬০ ইউরোপ/কোয়ালকমের (RF 360 Europe/Qualcomm) কারখানাতেও শুরু হয়েছে।

আগামী সপ্তাহে এসব বিক্ষোভ জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৩৭ লাখ শ্রমিকের মজুরি নিয়ে চলমান আলোচনায় চাপ বাড়াতে চায় আইজি মেটাল ইউনিয়ন।

ইউনিয়নটি ১২ মাসের মধ্যে পাঁচ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি চাকরি ও কর্মস্থলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাবি করেছে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় দফার আলোচনায় নিয়োগকর্তারা আগামী বছর এককালীন অর্থ প্রদানের পাশাপাশি ২০২৮ সালের জুলাই মাসে ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। জার্মানির শিল্প খাতের কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের যুক্তি দেখিয়ে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও কম।

সুইজারল্যান্ড

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে গত রাতে লাংস্ট্রাসে সড়ক ও হেলভেটিয়া স্কয়ারের আশপাশেও অস্থিরতা দেখা দেয়। উচ্চ শব্দে টেকনো সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হওয়া একটি অননুমোদিত সমাবেশ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।

কয়েকজন বিক্ষোভকারী ময়লার পাত্র, স্কুটার ও বৈদ্যুতিক সাইকেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন এবং সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া কয়েকজন দোকানের কাচ ভাঙচুর করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।

সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরেও অননুমোদিত বিক্ষোভ সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় ১৫০ জন বিক্ষোভকারী ক্লারাপ্লাটজ এলাকায় সমবেত হওয়ার পর সেন্ট ইয়োহান এলাকায় চলে যান। সেখানে সেন্ট ইয়োহানপ্লাটজে কয়েকজন বিক্ষোভকারী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন।

এ সময় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের চলাচলও স্থগিত করা হয়।

অস্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতেও শনিবার তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন।

আগাম বিক্ষোভের ঘোষণা থাকায় পুলিশ সতর্কতামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছিল। তবে সেখানে অনুষ্ঠিত দুটি বিক্ষোভই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ফ্রান্স

ফ্রান্সেও গত দুই সপ্তাহান্তের মতো গতকাল শনিবার বিকেলে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় ৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, বিক্ষোভের ঘটনায় ৫২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শ্রমিক ইউনিয়ন, শিক্ষার্থী সংগঠন, স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সংগঠন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পক্ষ থেকে এসব বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

বিক্ষোভকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

গত সন্ধ্যায় প্যারিসে আতশবাজি ও বিস্ফোরকজাতীয় সামগ্রীর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিএফএমটিভি (BFMTV) টেলিভিশনে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা আগুনের শিখার মধ্যে আটকা পড়েছেন। প্যারিস ও লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ৭০ হাজার। আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত এসব বিক্ষোভের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর একটি জোটের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু প্যারিসেই প্রায় দুই লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে পুলিশ প্রায় ৪০ হাজার তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেলস্টেশন, সড়কপথ ও টোল প্লাজাগুলোতে পরিচালিত এসব অভিযানের মাধ্যমে অস্ত্র বহনকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। রাতজুড়েও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা অব্যাহত থাকার কথা রয়েছে।

পর্তুগাল

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও ভাড়া নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত শত শত মানুষের ওপর পুলিশ অভিযান চালিয়েছে।

দেশটির মধ্য-ডানপন্থী সরকারের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো নতুন ভাড়ার চুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভাড়া নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাতিল করা।

আজ রোববার ভোরেও লিসবনে আবাসন সংকট ও প্রস্তাবিত ভাড়া আইনবিরোধী একটি বিক্ষোভ শিবির পুলিশ উচ্ছেদ করে। কেন্দ্রীয় রোসিও স্কয়ারে ৫০টিরও বেশি তাঁবু নিয়ে গড়ে ওঠা ওই শিবিরের পক্ষে অবস্থান নেওয়া শত শত বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

এর আগে গতকাল হাজার হাজার মানুষ মধ্য-ডানপন্থী সংখ্যালঘু সরকারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। একই ধরনের অপেক্ষাকৃত ছোট একটি বিক্ষোভ শিবির পোর্তো শহরেও পুলিশ উচ্ছেদ করে।

বিক্ষোভকারীরা এমন একটি প্রস্তাবিত আইন বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন, যার মাধ্যমে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করে ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ করা সহজ হবে এবং নতুন ভাড়ার চুক্তির ক্ষেত্রে ভাড়া নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তুলে দেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত আইনটি সংসদে প্রাথমিক আলোচনায় উত্থাপিত হলে উগ্র ডানপন্থী চেগা (Chega) দলের ভোটদানে বিরত থাকার কারণে এটি প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্রসর হয়।

পর্তুগাল বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ আবাসন সংকটে ভুগছে। ২০১৭ সাল থেকে দেশটিতে বাড়িঘরের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে নতুন ভাড়ার চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও ভাড়া প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো প্রস্তাবিত আইনটি প্রত্যাহারের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটাভুটির আগে আইনটিতে সংশোধনী আনার বিষয়ে তিনি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে, বিরোধী সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা হোসে লুইস কার্নেইরো গতকাল সরকারকে বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেও একই স্কয়ারে বিক্ষোভ শিবির উচ্ছেদের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করায় সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha