সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ - ১১:৪০
ইয়েমেনের জনগণকে বোঝাতে ‘হুথি’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয় কেন?

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘হুথি’ শব্দটির বারবার ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে এটি ইয়েমেনের জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক বাহিনীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিকল্প নামে পরিণত হয়েছে। অথচ এটি কেবল শব্দ নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং এ ধরনের ব্যবহার ইয়েমেন ও দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পাঠকের ধারণা গঠনে প্রভাব ফেলে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ইয়েমেনের ঘটনাবলি গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ‘হুথি’ শব্দের ব্যবহার এবং এর বিভিন্ন প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে।

ন্যারেটিভ তৈরির যুদ্ধের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাস্তবতাকে বিকৃত করার আগেই শব্দের ব্যবহার বদলে দেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি শব্দ বা পরিচয় কোনো দেশ, জাতি কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের মনে ভিন্ন চিত্র তৈরি করতে পারে। ইয়েমেনের ঘটনাবলি গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যায়। কিছু গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ‘ইয়েমেন সরকার’, ‘ইয়েমেনের জনগণ’ কিংবা ‘ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী’র মতো পরিচয়ের পরিবর্তে ‘হুথি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যেন একটি দেশের সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে পরিচিত করা যায়।

বিশেষ করে ফিলিস্তিনের প্রতি ইয়েমেনের অবস্থান, গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং লোহিত সাগরের পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়। অনেক প্রতিবেদনে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর ঘোষিত বা পরিচালিত অভিযানকে ‘হুথিরা হুমকি দিয়েছে’ কিংবা ‘হুথিরা জাহাজে হামলা চালিয়েছে’—এভাবে তুলে ধরা হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয়টি হলো সানাভিত্তিক প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কিংবা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক অভিযান।

‘হুথি’ শব্দটি আনসারুল্লাহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হুসাইন বদরুদ্দিন আল-হুথির পারিবারিক নাম থেকে এসেছে। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিভাষায় এ শব্দটি মূলত ওই আন্দোলনকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তাই আনসারুল্লাহ আন্দোলনকে নির্দিষ্টভাবে বোঝাতে ‘হুথি’ পরিচয়ের ব্যবহার নিজেই ভুল বা অবমাননাকর নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই শব্দ একটি দেশ, তার জনগণ কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয়ের বিকল্প হয়ে ওঠে এবং ইয়েমেনের যাবতীয় ঘটনাবলিকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেখা হয়।

এই নামকরণের অন্যতম প্রভাব হলো, একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠাতার পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। আনসারুল্লাহ দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, সাংগঠনিক ব্যবস্থা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ভিত্তিসম্পন্ন একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অথচ বিশেষ করে যখন ‘হুথি’ শব্দটি আন্দোলনটির নিজস্ব নামের পরিবর্তে বারবার ব্যবহার করা হয়, তখন এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, এটি একটি পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সীমিত গোষ্ঠী মাত্র; সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ইয়েমেনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকা রাখা একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এ ধরনের নামকরণ আন্দোলনটির বিকাশ, বিস্তৃতি এবং এর সামাজিক উপস্থিতির পেছনের বাস্তবতাগুলো পাঠকের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে পারে।

অন্যদিকে, গণমাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দের অর্থ ও প্রভাব সব সময় এক রকম হয় না। কোনো কোনো প্রতিবেদনে ‘হুথি’ শব্দটি কেবল আনসারুল্লাহকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে ‘হুথি মিলিশিয়া’র মতো শব্দ যুক্ত করা কিংবা নেতিবাচক শব্দের সঙ্গে বারবার এ পরিচয় ব্যবহার করা হলে তা ওই আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন এবং এর বিরুদ্ধে জনমনে ধারণা তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এমন বয়ানে কোনো আন্দোলনের অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানার আগেই পাঠকের মনে একধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

এ ছাড়া এ ধরনের শব্দচয়ন আনসারুল্লাহর সামাজিক ভিত্তি সম্পর্কে জনমনে কী ধারণা তৈরি হচ্ছে, তার ওপরও প্রভাব ফেলে। কোনো আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে তার প্রতিষ্ঠাতার পারিবারিক নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, এর কর্মকাণ্ড ও প্রভাব কেবল একটি পরিবার বা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের অবস্থান ও প্রভাব বুঝতে হলে এর ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, সমর্থকগোষ্ঠী এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ইয়েমেনের সব মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আনসারুল্লাহর সঙ্গে এক কিংবা দেশটির জনগণের একটি অংশের এই আন্দোলনের বিরোধিতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায়।

পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং কিছু আরব গণমাধ্যমে এ শব্দের ব্যাপক প্রচলনও এমন ধারণা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। কোনো সংকটের সংবাদ পরিবেশনে একটি বিশেষ পরিভাষা যখন প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়, তখন অন্য গণমাধ্যমগুলোও প্রায়ই একই শব্দচয়ন অনুসরণ করে। এমনকি সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা প্রতিষ্ঠানকে আরও নির্ভুলভাবে বর্ণনা করার মতো শব্দ থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়। এভাবে একটি শব্দের ব্যবহার ধীরে ধীরে ঘটনাবলি তুলে ধরার প্রচলিত কাঠামোয় পরিণত হয়, যা বাস্তবতার সব দিক তুলে ধরে না।

তবে এ ক্ষেত্রে শব্দটির বিভিন্ন প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। কোনো সংবাদ যদি সরাসরি আনসারুল্লাহ আন্দোলনের অবস্থান বা কর্মকাণ্ড নিয়ে হয়, তাহলে আন্দোলনটির নাম কিংবা এর পরিচিত নাম ব্যবহার করা স্বাভাবিক। কিন্তু সংবাদটি যদি ইয়েমেনের জনগণ, সানাভিত্তিক সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে হয়, তাহলে এসব পৃথক পরিচয়ের পরিবর্তে সব ক্ষেত্রে ‘হুথি’ শব্দ ব্যবহার করা গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও তথ্যের নির্ভুলতা ক্ষুণ্ন করে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha