সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ - ১৪:১৪
ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা গভীর চিন্তাগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত

হাওজা ইলমিয়ার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপপ্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ মুফিদ হুসাইনি কোহসারি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান গত কয়েক দশকে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, কৌশলগত দলিল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পরিচালনাগত মডেল তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর হতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কোমের ইসলামিক সায়েন্সেস অ্যান্ড কালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ‘রাজনৈতিক বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে হাওজা ইলমিয়ার আন্তর্জাতিক সক্ষমতা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থা একটি বিস্তৃত বিষয়। অর্থনীতি, গণমাধ্যম, শিল্পকলা, শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব। এসব অভিজ্ঞতা শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও কাজে আসতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি লেবাননের হিজবুল্লাহর কথা উল্লেখ করেন, যারা সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যম ও সামাজিক ক্ষেত্রেও কাজ করছে।

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা

হুসাইনি কোহসারি বলেন, ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

১- কৌশলগত দলিল ও পরিকল্পনা: ইরানে শিক্ষা সংস্কার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার ও নারী এবং মাহদিবাদী সংস্কৃতির বিকাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজস্ব কৌশলগত পরিকল্পনা ও নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

২- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংগঠনিক কাঠামো: বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি কার্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা বিস্তারের বিভিন্ন উদ্যোগ ইরানের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। ‘আমিন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৬ হাজার মাদ্রাসা ও স্কুলে ১৬ হাজার আলেম দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কাজ শুধু জামাতের নামাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিকাশেও তাঁরা ভূমিকা রাখছেন।

৩- আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব: শহীদ আয়াতুল্লাহ বেহেশতি, শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহহারি, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ এবং শহীদ হাজি কাসেম সোলাইমানিকে তিনি ধর্মীয়, সামাজিক ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব ব্যক্তিত্বের চিন্তাধারা ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করা প্রয়োজন।

৪- ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি: ইসলামী শাসনব্যবস্থা শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা বা ব্যবহারিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা, গভীর ধর্মীয় জ্ঞান ও দার্শনিক চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও সমাজ পরিচালনা বিষয়ে ইরানে বিভিন্ন তাত্ত্বিক গবেষণা ও চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে।

৫- গবেষণা ও পদ্ধতিগত সক্ষমতা: ফিকাহ ও উসুলে ফিকাহ, সময় ও স্থানের প্রভাব, বিবেক-বুদ্ধির ভূমিকা, জনস্বার্থ এবং শরিয়তের উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষণা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার নতুন মডেল তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

৬- নতুন রাজনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত ধারণা: ধর্মীয় গণতন্ত্র, জিহাদি ব্যবস্থাপনা এবং বাসিজি চিন্তাধারার মতো ধারণাগুলো ইসলামী বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। এগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ইরানে ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক মানবসম্পদ তৈরির জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বাকেরুল উলুম বিশ্ববিদ্যালয়, ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মোতাহহারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইমাম খোমেনি (রহ.) ইনস্টিটিউট উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতির প্রয়োজনীয়তা

হুসাইনি কোহসারি বলেন, ইসলামী শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে বই, গবেষণাপত্র, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সফটওয়্যার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ধর্মীয় প্রচারক এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্ষমতাও কাজে লাগাতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, পশ্চিমা চিন্তাধারার সমালোচনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর পাশাপাশি ইসলামী অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থার ইতিবাচক বিকল্প মডেলও উপস্থাপন করতে হবে। কারণ পশ্চিমা ব্যবস্থাই সমাজ পরিচালনার একমাত্র পদ্ধতি নয়।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষ, নাস্তিক ও কমিউনিস্ট সমাজেও ইসলামী চিন্তাধারা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিকের প্রতি আগ্রহী মানুষ পাওয়া সম্ভব। এজন্য প্রথমে নিজেদের সক্ষমতাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং এরপর বিভিন্ন দেশের মানুষের চিন্তাগত অবস্থান ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো উপস্থাপন করতে হবে।

শেষে তিনি বলেন, হাওজা ইলমিয়া ও ইসলামী বিপ্লবের অর্জনগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হলে গবেষণা, শিক্ষা, প্রচার, গণমাধ্যম ও সাংগঠনিক সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha