হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজা উপত্যকা বহু দশক ধরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব, অবরোধ এবং সামরিক আগ্রাসনের শিকার। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলায় গাজায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। লক্ষাধিক নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, এবং খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অপরদিকে, আরব বিশ্ব, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো, এই ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং তারা কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই প্রবন্ধে গাজার উপর ইসরায়েলের অত্যাচার এবং আরব দেশগুলোর নীরবতার কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।
গাজার উপর ইসরায়েলের অত্যাচার
১. গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
গাজার উপর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় গাজার অন্তত ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু ও নারী।
ফিলিস্তিনের হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, ফলে আহতদের চিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী ফসফরাস বোমা ও নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল।
২. অবরোধ ও মানবিক সংকট
ইসরায়েল ২০০৭ সাল থেকে গাজাকে সম্পূর্ণ অবরোধ করে রেখেছে, যার ফলে খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রবাহ সীমিত হয়ে পড়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে, যার ফলে গাজার ৯০% জনগণ অনাহারের মুখে পড়েছে।
গাজায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাবে হাজার হাজার শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে গেছে, ফলে বহু মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।
৩. রাজনৈতিক দমননীতি ও নিপীড়ন
গাজার জনগণের উপর ইসরায়েলি দমননীতি কয়েক দশক ধরে চলমান।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ।
ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উপর দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে বন্দী করা হচ্ছে।
ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করার জন্য তথ্য যুদ্ধ ও ভুয়া প্রচারণা চালাচ্ছে।
আরব জাতির চুপ থাকার কারণ
১. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ
অনেক আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং সরাসরি ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য "আব্রাহাম চুক্তি" স্বাক্ষর করে।
সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেনি, তবে কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত জোটে রয়েছে এবং তারা মনে করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তাদের পশ্চিমা সমর্থন বৃদ্ধি পাবে।
২. অর্থনৈতিক স্বার্থ ও পশ্চিমা প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে তেল ও গ্যাস ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আরব দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে না।
অনেক আরব নেতাই পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চান এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৩. আরব দেশগুলোর আন্তঃদ্বন্দ্ব ও বিভক্তি
আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পারস্পরিক বিভাজনের কারণে তারা ফিলিস্তিনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গাজার ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মিশর ও জর্ডান ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছে এবং তারা নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থের কারণে গাজার প্রতি কঠোর অবস্থান নিতে চায় না।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব থাকায় তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
৪. স্বৈরাচারী শাসন ও গণআন্দোলন দমন
বেশিরভাগ আরব দেশ স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে রয়েছে, যেখানে জনগণের মতামত উপেক্ষা করা হয়।
আরব বিশ্বে সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকলেও, সরকারগুলো বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দমন করছে।
অনেক দেশে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি না হয়।
কিছু দেশে সরকার ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করছে, ফলে জনগণের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
উপসংহার
গাজায় ইসরায়েলের বর্বরতা অব্যাহত থাকলেও, আরব জাতির প্রতিক্রিয়া নির্লিপ্ত ও নিষ্ক্রিয়। রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, কূটনৈতিক চুক্তি ও স্বৈরাচারী শাসনের কারণে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে সাধারণ আরব জনগণের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি প্রবল। যদি গণআন্দোলন ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়, তাহলে আরব বিশ্বকে ফিলিস্তিনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা যেতে পারে। গাজার জনগণের দুর্ভোগ নিরসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং আরব দেশগুলোর উচিত ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা।
রিপোর্ট: হাসান রেজা
আপনার কমেন্ট