হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রোযার উপকারিতা: ইসলাম ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
রোজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, এটি শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক উপকারিতার এক অনন্য উপহার। ইসলাম আমাদের জন্য যা ফরজ করেছে, তার প্রতিটি বিধানের পেছনে রয়েছে অপার জ্ঞান ও কল্যাণ।
১. কুরআনের আলোকে রোজার গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" (সূরা বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যায়, রোজা আমাদের চরিত্র গঠনের জন্য এবং আল্লাহভীতির (তাকওয়া) উন্নতির জন্য ফরজ করা হয়েছে।
২. হাদিসের আলোকে রোজার উপকারিতা:
নিম্নে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরা হলো,যে হাদীস গুলি দ্বারা আমরা সহজে বুঝতে পারব রোজা রাখা আমাদের জন্য কতটা উপকারী ও কল্যাণকর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"রোজা রাখো, তাহলে তোমরা সুস্থ থাকবে।" (মুসনাদে আহমদ)
এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায়, রোজা শুধুমাত্র আত্মিক সাধনার মাধ্যম নয়, এটি শারীরিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম আলী (আ.) বলেন:
"রোজা মানুষের আত্মাকে সংযত করে, প্রবৃত্তিকে দমন করে এবং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।" (নাহজুল বালাগা)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোজা কেবল ইবাদত নয়, এটি আমাদের মানসিক ও শারীরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
"রোজা দেহকে বিশ্রাম দেয় এবং শরীরের জন্য উপকারী।" (তুহাফুল উকূল)
আধুনিক বিজ্ঞানও বলে যে, রোজার ফলে হজমতন্ত্র বিশ্রাম পায় এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর হয়।
ইমাম রিদা (আ.) বলেন:
"মানুষ যখন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়, তখন তার দেহে প্রশান্তি আসে এবং আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।" (উয়ুন আখবারুর রিদা)
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ক্ষুধা শরীরের কোষগুলোকে নবায়ন করে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
"রোজা আত্মাকে শক্তিশালী করে, দেহকে সুস্থ রাখে এবং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।" (আল-কাফি)
রোজা মানসিক দৃঢ়তা আনে, যা ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়।
৩- সামাজিক সংহতি:
রোজা সামাজিক সমতা ও সংহতি বৃদ্ধি করে। ধনী-গরীব সবাই একইভাবে রোজা রাখে, যা সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা তৈরি করে। রোজার মাধ্যমে মানুষ ক্ষুধার্ত ও দরিদ্রদের কষ্ট অনুভব করতে পারে, যা তাদের মধ্যে দানশীলতা ও সহানুভূতির গুণ বৃদ্ধি করে।
৪- আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার উপকারিতা
বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, রোজার মাধ্যমে আমাদের শরীর অনেক উপকার পায়। কিছু প্রধান উপকারিতা হলো:
হজমতন্ত্রের বিশ্রাম: দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার ফলে পাকস্থলী এবং হজমতন্ত্র বিশ্রাম পায়, যা পরবর্তী সময়ে হজম প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ডিটক্সিফিকেশন: রোজা শরীরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। দীর্ঘক্ষণ পানাহার না করার ফলে শরীর নিজেই ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: রোজা ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং মেটাবোলিজমের উন্নতি ঘটায়।
রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণ: বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, রোজা রাখলে রক্তচাপ এবং ব্লাড সুগার স্বাভাবিক থাকে, যা ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের জন্য উপকারী।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: রোজার ফলে মস্তিষ্কে নিউরোট্রফিন উৎপন্ন হয়, যা স্মৃতিশক্তি বাড়ায় ও মানসিক স্থিতিশীলতা আনে।
দীর্ঘায়ু ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: গবেষণা বলে যে, অনিয়মিত খাওয়া (ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং) দীর্ঘায়ুর সহায়ক এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
উপসংহার
রোজা কেবল ধর্মীয় বিধান নয়, এটি আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নতির একটি অনন্য ব্যবস্থা। কুরআন, হাদিস ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান একযোগে এর উপকারিতা প্রমাণ করে। তাই রোজাকে কষ্ট মনে না করে এটিকে আনন্দ ও কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
আসুন, আমরা আনন্দ ও আন্তরিকতার সঙ্গে রোজা রাখি এবং এর অফুরন্ত কল্যাণ লাভ করি।
কবির আলী তরফদার কুম্মী।
তারিখ: ২৭/০২/২০২৫
আপনার কমেন্ট