শনিবার ২৯ মার্চ ২০২৫ - ১১:৫৬
যাকাতুর ফিতরা দানের খাতসমূহ ও অন্য শহরে স্থানান্তরের বিধান

শরিয়তের হুকুম-আহকাম বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ তাকী মুহাম্মাদী শেখ “রমযান মাসে ফিতরার যাকাতের খাত ও স্থানান্তর পদ্ধতি” সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র রমযান মাসে প্রতিদিন আপনার সাথে থাকছে ‘রমজান গাইড লাইল। এই সিরিজে রমজান মাস সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধানসমূহ মারজায়ে তাকলীদের মতামতসহ উপস্থাপন করা হচ্ছে। 

ফিতরার যাকাত অন্য শহরে পাঠানো: মারজায়ে তাকলীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সংশ্লিষ্ট বিধান 

ফিতরার যাকাত সংক্রান্ত একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন হলো, এক শহর থেকে অন্য শহরে এটি পাঠানো যায় কিনা। 

এ বিষয়ে মারজায়ে তাকলীদগণের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, যা মুকাল্লিদদের জানা অপরিহার্য। 

অধিকাংশ মারজায়ে তাকলীদের বিশিষ্ট মত অনুযায়ী, ইহতিয়াতে ওয়াজিব হলো ফিতরার যাকাত সেই শহরেই প্রদান করা যেখানে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে। 

অর্থাৎ, মুকাল্লিদের উচিত ফিতরার যাকাত সেই এলাকার প্রয়োজনীদের মধ্যে বণ্টন করা যেখানে ঈদের রাতের সূর্যাস্তের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং অন্য শহরে স্থানান্তর করা থেকে বিরত থাকা। 

এই দৃষ্টিভঙ্গি ইহতিয়াতে ওয়াজিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মারজায়ে তাকলীদগণ এটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য জোরালো সুপারিশ করেছেন। 

তবে, কিছু মারজায়ে তাকলীদ যেমন আয়াতুল্লাহ শুবাইরি জানজানি ও আয়াতুল্লাহ সোবহানী ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে, ফিতরার যাকাত অন্য শহরে পাঠানো জায়েয এবং এতে কোনো শরয়ী সমস্যা নেই। 

কিছু মুকাল্লিদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, যদি অতীতে এই বিধান না জেনে অন্য শহরে ফিতরা পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের করণীয় কী?

এর উত্তরে বলা যায় যে, অতীতে যা প্রদান করা হয়েছে তা যথেষ্ট এবং পুনরায় প্রদান করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, অন্য শহরে ফিতরা পাঠানো ইহতিয়াত ওয়াজিবের পরিপন্থী হলেও এটি ফিতরার মূল হুকুম বাতিল করে না এবং যাকাতের দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। 

তবে এটি জেনেশুনে অন্য শহরে ফিতরা পাঠানোর অনুমতি নয়। অর্থাৎ, যদি কেউ এই বিধান জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য শহরে পাঠান, তবে যদিও ফিতরার মূল দায়িত্ব আদায় হয়েছে, তবুও তিনি ইহতিয়াত ওয়াজিব লঙ্ঘন করেছেন। 

অতএব, জোরালো সুপারিশ হলো যে, এখন থেকে মুকাল্লিদের উচিত ঈদুল ফিতর যেখানে উদযাপন করেছেন সেখানকার প্রাপকদের মধ্যে ফিতরা বণ্টন করা। 

যাকাতুর ফিতরার খাতসমূহ: মারজায়ে তাকলীদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি

যাকাতুর ফিতরার সঠিক খাত নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টি ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং মারজায়ে তাকলীদগণ এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন, যা মুকাল্লিদদের জানা অত্যাবশ্যক। 

মারজায়ে তাকলীদগণের মধ্যে দুইটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে: 

প্রথম গ্রুপ: ইমাম খোমেনী (রহ.)-সহ একদল মারজর মতে, ফিতরার যাকাতের খাত সাধারণ যাকাতের খাতের মতোই। 

এই মত অনুযায়ী, ফিতরার যাকাত কুরআনে উল্লিখিত যাকাতের আটটি খাতেই (ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী, নতুন মুসলিমদের মন জয় করা, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে ও মুসাফির) ব্যয় করা যাবে। 

তবে এই মতানুসারে, ফিতরা শিয়া ফকীরদেরকে দেওয়া মুস্তাহাব, কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়। 

দ্বিতীয় গ্রুপ: অন্যদিকে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, আয়াতুল্লাহ সিস্তানী, আয়াতুল্লাহ মাকারেম শিরাজী ও আয়াতুল্লাহ ওয়াহীদ খোরাসানীর মতো মারজগণ আরও সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। 

তারা ইহতিয়াতে ওয়াজিব হিসেবে ফতোয়া দিয়েছেন যে, ফিতরার যাকাত শুধুমাত্র শিয়া ফকীরদের জন্যই নির্ধারিত। 

অর্থাৎ, এই মারজাগণের মতে, যতক্ষণ শিয়া ফকীর পাওয়া যায়, ততক্ষণ অন্য খাতে বা অ-শিয়াদেরকে ফিতরা দেওয়া উচিত নয়। 

মারজায়ে তাকলীদগণের মধ্যে এই মতপার্থক্য শরয়ী বিধান উদ্ভাবনে বিভিন্ন ইজতিহাদের ফলাফল। 

মুকাল্লিদদের উচিত নিজ নিজ মারজার নির্দেশনা অনুসরণ করা: 

- যদি প্রথম গ্রুপের অনুসারী হন, তবে ফিতরা যাকাতের আটটি খাতেই ব্যয় করতে পারবেন (তবে শিয়া ফকীরদেরকে দেওয়া উত্তম)। 

- যদি দ্বিতীয় গ্রুপের অনুসারী হন, তবে ইহতিয়াত ওয়াজিব অনুযায়ী শুধুমাত্র শিয়া ফকীরদেরকেই ফিতরা দিতে হবে। 

এই ফিকহী বিধানের পার্থক্য ফিতরার যাকাতের বিশেষ গুরুত্ব ও ইসলামের আর্থিক ইবাদতসমূহ মধ্যে এর মর্যাদাকে নির্দেশ করে, যা পবিত্র রমযান মাসের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী দায়িত্ব হিসেবে পালন করা হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha