শুক্রবার ৪ এপ্রিল ২০২৫ - ১৯:০৭
ইসলামে ইনফাকের গুরুত্ব ও ইনফাক ত্যাগের ভয়াবহ পরিণতি

ইসলাম এমন একটি দ্বীন যা কেবল ইবাদতের উপরই জোর দেয় না; বরং মানুষের সামাজিক, নৈতিক ও সমাজিক দায়িত্বের প্রতিও গভীর গুরুত্ব আরোপ করে। এসব দায়িত্বের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইনফাক’ বা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে বারবার এই আমলের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি— ইনফাক না করলে এর পরিণতি কী হতে পারে? ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইনফাক ত্যাগ করা শুধু একটি নেক আমল বর্জন নয়; বরং এর পার্থিব ও পরকালীন প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক।

আসুন কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এই পরিণতিগুলো বিশদভাবে জানি: 

১. মৃত্যু-পূর্ববর্তী গভীর অনুশোচনা: মৃত্যুর সময় মানুষ তার সারা জীবনের অবহেলিত আমলগুলোর কথা স্মরণ করে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:  “সেদিন (মৃত্যুকালে) সে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে আরও কিছু সময় দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম! (সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩:১০) 

কিন্তু তখনকার অনুশোচনা বৃথা, কারণ আমলের সুযোগ চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। 

২. কৃপণতা: অন্তরের রোগ: ইনফাক না করা হৃদয়কে সংকীর্ণ করে তোলে। ধীরে ধীরে ব্যক্তি কৃপণতা নামক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়, যা আল্লাহ ও মানুষের নিকট ঘৃণিত। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন:  “যারা কৃপণতা করে ও মানুষকে কৃপণতা শিক্ষা দেয়... তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আন-নিসা ৪:৩৭) 

৩. সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের বিস্তার: ধনীরা ইনফাক না করলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে। গরিবরা বাধ্য হয়ে চুরি, ঘুষ, এমনকি ধর্মীয় বিচ্যুতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে ইনফাক থেকে বিরত রাখে, কিন্তু আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন:  ”শয়তান তোমাদের (ইনফাক করার সময়) দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের ওয়াদা করেন।” (সূরা আল-বাকারা- ২:২৬৮) 

৪. *আধ্যাত্মিক পতন:* ইনফাক ঈমানের পরিপূর্ণতা আনে ও অন্তরকে পবিত্র করে। পক্ষান্তরে, ইনফাক ত্যাগ করলে আত্মা কালিমাগ্রস্ত হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যারা স্বীয় সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে... তাদের আমল আল্লাহর নিকট পবিত্রভাবে গৃহীত হয়।” (সূরা আল-বাকারা ২:২৬৫) 

৫. সমাজের অবক্ষয়: ইনফাকের অভাবে সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহ সতর্ক করেন: “আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯৫) 

৬. দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি: কুরআনে কারুন-এর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যে তার সম্পদের অহংকারে ইনফাক থেকে বিরত থাকায় আল্লাহ তাকে সম্পদসহ ভূগর্ভে বিলীন করে দেন (সূরা আল-কাসাস ২৮:৭৬-৮২)। এই ঘটনা প্রতিটি কৃপণ ব্যক্তির জন্য সতর্কবাণী। 

পরিশেষে বলা যায়, ইনফাক শুধু গরিবের অধিকার পূরণই নয়; বরং এটি ঈমানের দাবি ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। আল্লাহ বলেছেন:  “তোমরা কখনো পূণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা নিজের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো।”
(সূরা আলে ইমরান ৩:৯২) 

অতএব, আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে অন্যের মুখে হাসি ফুটানোই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। মনে রাখবেন, “যে ব্যক্তি উপকার করে, সে নিজের জন্যই উপকার করে!” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬)

গ্রন্থসূত্র: ইনফাক— আয়াতুল্লাহ জাওয়াদ মুহাদ্দিসী 

হাওজা নিউজ এজেন্সি/ রাসেল আহমেদ রিজভী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha