হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যেগুলো শুধু একটি সময় বা পরিস্থিতির জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও দিকনির্দেশনা হয়ে থাকে। ইসলামি ইতিহাসে ইমাম হাসান (আ.)-এর সুলহ ছিল তেমনি এক দূরদর্শী ও নৈতিক সিদ্ধান্ত, যা মুসলিম উম্মাহর রক্তপাত এড়াতে এবং বৃহত্তর ঐক্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আজকের এই যুগে, যখন আমরা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সহিংসতা এবং নেতৃত্ব সংকটের মুখোমুখি, তখন প্রশ্ন আসে—ইমাম হাসান (আ.)-এর সেই সুলহ ও শান্তিপূর্ণ কৌশল কতটা প্রাসঙ্গিক? তাঁর সেই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও কৌশল বর্তমান সংকট নিরসনে কী বার্তা দেয়?
এই বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনায় আমরা একজন বিশেষজ্ঞ অতিথির সঙ্গে মতবিনিময় করব, যিনি আলো ফেলবেন ইতিহাস, দর্শন এবং সমসাময়িক রাজনীতি—এই তিনটি প্রেক্ষাপটে ইমাম হাসান (আ.)-এর শান্তির নীতির তাৎপর্যের ওপর।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
জনাব আখতার আলী সাহেব, আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে সময় দেওয়ার জন্য।
আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনা করব,
ইমাম হাসান (আ.) এর শান্তির কৌশল এবং তার প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন রাজনৈতিক সংকটে। প্রথমেই জানতে চাই, আপনি ইমাম হাসান (আ.)-এর সুলহকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আখতার আলী: ওয়ালাইকুমুসসালাম। ধন্যবাদ আপনাকে। ইমাম হাসান (আ.)-এর সুলহ ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি দূরদর্শী, নৈতিক এবং মানবিক কৌশল। অনেকেই একে দুর্বলতা ভেবে ভুল করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল রক্তপাত রোধে একটি মহান আত্মত্যাগ। তিনি ইসলামের ভবিষ্যৎ ও উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে ব্যক্তিগত অবস্থান ত্যাগ করেছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলাদলি ও সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে আপনি কি মনে করেন এই ‘সুলহনীতি’ আমাদের জন্য আজও পথপ্রদর্শক হতে পারে?
আখতার আলী: নিঃসন্দেহে। আজকের বিশ্বে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে, বিভাজন, সাম্প্রদায়িকতা, এবং অহংবোধ থেকে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ইমাম হাসান (আ.) আমাদের শেখান—সবচেয়ে বড় জয় হলো শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন, এমনকি যদি তা আত্মত্যাগের বিনিময়ে হয়। আজকের নেতারা যদি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতেন, তাহলে বহু সংকট এড়ানো সম্ভব হতো।
ইমাম হাসান (আ.) তো সত্য ও ন্যায়ের ওপর ছিলেন। তাহলে তিনি অন্যায় শাসকের সঙ্গে সুলহ করলেন কেন?
আখতার আলী: খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইমাম হাসান (আ.) জানতেন, সেই সময় যুদ্ধ মানে ইসলামি সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা, অবর্ণনীয় রক্তপাত এবং ইসলামের মূল চেতনার বিপর্যয়। তিনি যুদ্ধ জিতলেও উম্মাহ ভেঙে যেতো। তাই তিনি এমন একটি শান্তিচুক্তি করলেন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাস্তবতা ও কৌশলের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছেন। এটি একপ্রকার 'নির্মল প্রতিরোধ'।
বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য ইমাম হাসান (আ.) এর এই উদাহরণ থেকে আপনার বার্তা কী?
আখতার আলী: আমার বার্তা একটাই—ক্ষমতা ধরে রাখাই নেতৃত্ব নয়, বরং জাতির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রকৃত নেতৃত্ব। নেতা যদি ইমাম হাসান (আ.)-এর মতো ধৈর্য, প্রজ্ঞা, ও আত্মত্যাগের মানসিকতা ধারণ করতে পারেন, তবে যে কোনো জাতিকে বিভেদের অন্ধকার থেকে ঐক্যের আলোতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক কথা। আপনি কি মনে করেন, আজকের রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও বিভক্তির যুগে শান্তি ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা কতটা বাস্তবসম্মত?
আখতার আলী: বাস্তবসম্মত এবং জরুরি। কারণ যুদ্ধ বা সহিংসতা কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। শান্তি, সংলাপ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব। ইমাম হাসান (আ.) এর পথ অনুসরণ না করলে আমাদের সমাজ শুধু ধ্বংসের দিকেই এগোবে।
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার চিন্তাভাবনা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয়। সাক্ষাৎকারের শেষে, আপনি যদি তরুণ প্রজন্মকে একবারে কোনো বার্তা দিতে চান, সেটা কী হবে?
আখতার আলী: তরুণরাই আগামীর নেতৃত্ব। আমি বলব—ইমাম হাসান (আ.)-এর মতো চিন্তা করো, শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও, উসকানি ও বিভেদ থেকে দূরে থেকো। সত্যিকারের শক্তি লুকিয়ে আছে ধৈর্য ও নৈতিকতার ভিতরে।
জাযাকাল্লাহ খাইর, হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আখতার আলী সাহেব। আপনার মূল্যবান সময় ও কথাগুলো আমাদের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করবে ইনশাআল্লাহ।
আখতার আলী: আল্লাহ আপনাদেরকে তাওফিক দিন সত্যের পথে চলার। ধন্যবাদ।
সাক্ষাত্কার গ্রহণ: মাজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট