হাওজা নিউজ এজেন্সি: হাওজায়ের ইলমিয়ার একজন বিশিষ্ট শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আবেদিনী—শনিবার টেলিভিশন অনুষ্ঠান “সামতে খোদা”-তে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আত্মিক সাধনায় সময়ের গুরুত্ব এবং আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর জন্মের সঙ্গে তাওহিদের বিশেষ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর বেলায়েত সম্পূর্ণরূপে ফিতরগত (স্বভাবজাত), এবং ইমামের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কোনো ঐতিহাসিক বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত, চলমান ও প্রতিমুহূর্তের সম্পর্ক।
তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতে বলেন, সময়সমূহ মানুষের আল্লাহর পথে চলার বিভিন্ন স্তর বা মনজিল। প্রতিটি সময়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করতে পারে। এসব সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সেসব দিন, যেগুলো আল্লাহর ওলীদের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। এ ক্ষেত্রে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর অবস্থান অনন্য ও অতুলনীয়।
হযরত আলী (আ.)-এর কাবাঘরে জন্ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই জন্ম কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সচেতন ও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ঘটনা—যাতে বোঝানো হয় যে এই মহামানব সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। কাবাঘরে জন্ম আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তাঁর অস্তিত্বগত সম্পর্ককে স্পষ্ট করে এবং তাওহিদের পথে আমাদের আত্মিক যাত্রাতেও এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। এই জন্ম মানুষকে প্রকৃত কিবলার দিকে সংযুক্ত করে—যে কিবলা কাবার বাহ্যিক রূপ নয়, বরং হৃদয়ের চূড়ান্ত গন্তব্য।
হুজ্জাতুল ইসলাম আবেদিনী বলেন, আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর প্রকৃত সত্তাকে সাধারণ মানববুদ্ধি দিয়ে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তবে তাঁর সাহাবি ও শিষ্যদের মাধ্যমে আমরা তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের ঝলক দেখতে পাই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— হযরত আবু যর, সালমান, মিকদাদ ও আম্মার (রা.) তাঁদের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলী (আ.)-এর বেলায়েতের মহিমা প্রকাশ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, সমসাময়িক যুগেও এমন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর মক্তব ও আদর্শের সঙ্গে সঙ্গে অস্তিত্বগত সম্পর্ক স্থাপন করে এ সত্যকে আমাদের সময়ে জীবন্ত করে তুলেছেন। চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদি ও শহীদ মুর্তজা মুতাহহারী ছিলেন এই ধারার উজ্জ্বল উদাহরণ। আর প্রতিরোধ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শহীদ জেনারেল হাজী কাসেম সোলাইমানি ছিলেন আলী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতা, জুলুমবিরোধিতা, ভালোবাসা ও নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
হাজ্ব কাসেম সোলাইমানি সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বেলায়েতের সত্যকে বৈশ্বিক অঙ্গনে উপস্থাপন করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন—যে ব্যক্তি আলী (আ.)-কে ভালোবাসে, সে হৃদয়, ভাষা ও কর্ম—সবকিছু দিয়েই ভালোবাসে। এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব প্রকৃত নায়ক ও আদর্শ থেকে শূন্য হয়ে পড়েছিল, হাজী কাসেম মানবিকতার শিখরে দাঁড়িয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শহীদদের দীপ্তি প্রায়শই তাঁদের শাহাদাতের পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন শহীদ মুতাহহারীর শাহাদাতের পর মানুষ তাঁর চিন্তাধারা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে, তেমনি হাজ্ব কাসেম সোলাইমানির শাহাদাতের পর তাঁর নাম ও আদর্শ শত্রুদের জন্য আরও ভীতিকর হয়ে উঠেছে। এই প্রভাবের মূল উৎস হলো সেই সত্যিকারের ভালোবাসা, যা আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর প্রতি প্রেম থেকে জন্ম নেয়।
তিনি হাজী কাসেমের বিনয়ী অথচ দৃঢ় চরিত্রের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তিনি শহীদদের পরিবারের সামনে ছিলেন চরম বিনয়ী, আর বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সামনে ছিলেন অটল ও দৃঢ়। এটাই হলো আলী (আ.)-এর মক্তব থেকে পাওয়া ভারসাম্যপূর্ণ বেলায়েত— সত্যের সামনে বিনয় এবং বাতিলের সামনে দৃঢ়তা।
তিনি বলেন, মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে ইমামের সম্পর্ক স্বভাবজাত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আলাস্তু” অঙ্গীকারের সময় তাওহিদ ও নবুয়তের পাশাপাশি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর বেলায়েতের অঙ্গীকারও সকল মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। এই অঙ্গীকার ইতিহাস জুড়ে অব্যাহত রয়েছে এবং ইতিহাসের শেষেও সকল উম্মত রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি যুগে নবী ও তাঁদের ওসিগণ মানুষের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আলী (আ.)-এর সত্যের একটি অংশ প্রকাশ করেছেন, যাতে মানবজাতিকে শেষ নবী ও শেষ ওসির দিকে পরিচালিত করা যায়।
শেষে তিনি বলেন, যদি আমাদের অন্তরে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, তবে তা ফিতরতের সুস্থতার আলামত। আর যদি এই ভালোবাসা হ্রাস পায়, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা করা জরুরি। ইমাম আলী (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক একটি জীবন্ত ও চিরস্থায়ী সম্পর্ক—যা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
আপনার কমেন্ট