রবিবার ৪ জানুয়ারী ২০২৬ - ১২:১৪
ইরান, আমেরিকা ও ইতিহাস: ধর্মীয় আদর্শ বনাম ক্ষমতার রাজনীতি

শুনছি নাকি ইরানে 'আয়াতুল্লাহ বিরোধী' একটি গ্রুপ আন্দোলনে নেমেছে৷ কেউ পক্ষে বা কেউ বিপক্ষে লিখছেন৷ তবে আমেরিকা যেভাবে ইরান'কে দেখে, ইরান সেভাবে নয়৷ অধুনা বিশ্বে যেভাবে ইরানে 'আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত' সরকার দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে চলছে, সেভাবে গোটা বিশ্বে এত দীর্ঘদিনের শাসন ব্যবস্থা কেউ দেখাতে পারেনি৷ 

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, 

প্রতিবেদন: মুস্তাক আহমদ

শুনছি নাকি ইরানে 'আয়াতুল্লাহ বিরোধী' একটি গ্রুপ আন্দোলনে নেমেছে৷ কেউ পক্ষে বা কেউ বিপক্ষে লিখছেন৷ তবে আমেরিকা যেভাবে ইরান'কে দেখে, ইরান সেভাবে নয়৷ অধুনা বিশ্বে যেভাবে ইরানে 'আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত' সরকার দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে চলছে, সেভাবে গোটা বিশ্বে এত দীর্ঘদিনের শাসন ব্যবস্থা কেউ দেখাতে পারেনি৷ 

কিন্তু আজ বিভিন্ন লেখা ইরান প্রশ্নকে শুধুমাত্র সমসাময়িক রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় সংঘাতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করলে মূল বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। কারণ এই সংঘাতের শিকড় কেবল কূটনীতি বা অর্থনীতিতে নয়—বরং ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শিক অবস্থানের গভীরে গাঁথা। একদিকে ইরানে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শন, আর অন্যদিকে গোটা বিশ্বে  ক্ষমতা-কেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী রাজনীতি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবী–রাসূলদের ও মাসুম ইমামদের পথ বরাবরই শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর সাথে আদর্শিক সংঘর্ষ হয়েছে। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল, মুয়াবিয়া ইয়াজিদ কিংবা রোমান সাম্রাজ্য—সবাই নিজেদের সময়ের ‘সুপার পাওয়ার’ ছিল। কিন্তু তারা টিকে ছিল শুধুমাত্র বাহ্যিক শক্তির জোরে, আদর্শের ন্যায্যতায় নয়।
 ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় এই ইতিহাস কেবল অতীত নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি শিক্ষা। আর সেটাই বোঝার বিষয় এই যে, আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত ইরান সেই নবী রসুল বা মাসুম ইমামগণদের আলোয় আলোকিত একটি আদর্শ, অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত সরকার কারবালায় ইমাম হুসাইন(আঃ)-এর নীতি'তে চলমান একটি ব্যবস্থা৷৷

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে যে পথ বেছে নেয়, তা ছিল সরাসরি পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক ঘোষণা। এই বিপ্লব শুধু শাসক পরিবর্তন নয়, বরং একটি ধর্মীয়–রাজনৈতিক দর্শনের পুনরুত্থান—যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানেই আমেরিকার সাথে ইরানের মূল দ্বন্দ্বের সূচনা।  একদিকে ইয়াজিদ আর অপদিকে ইমাম হুসাইন (আঃ) যেমন কারবালায় অবস্থানে ছিলো, আজ তারই জ্বলন্ত একটি প্রেক্ষাপট৷ ৬১ হিজরীতে কারবলার পর যেমন ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর নাম মুছে যায় নি, তাঁর রেখে যাওয়া আন্দোলনও নিভে যায়নি৷ আজ সেই আলোর ছটা ইরানে 'আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত সরকার' দন্ডায়মান৷ এটি নিছক কোন রাস্ট্র, নিছক কোন রাজনীতি, নিছক কোন দেশ নয়৷ বরং ইরান হুসাইনী আন্দোলনের সেই আদর্শের বহিঃপ্রকাশ৷

অপরদিকে জায়োনবাদী ইজরাঈল, বিটেন, আমেরিকার বৈদেশিক নীতি ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারের ওপর দাঁড়িয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তারা নিজেকে ‘বিশ্বের অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে—কখনো গণতন্ত্রের নামে, কখনো মানবাধিকারের অজুহাতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই নীতির ফল হয়েছে যুদ্ধ, রাষ্ট্রধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয়। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক ও আফগানিস্তান—ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই এই সত্য স্পষ্ট। অতএব এবারও আমেরিকার মুখে চুনকালী৷ 

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই আধিপত্যবাদ কেবল রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি নৈতিক সংকট। ইরানে আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত সরকার তা মোটেও চায় না,  তার কারণ ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনে ক্ষমতা কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ লক্ষ্য নয়—বরং তা ন্যায়, ইনসাফ ও মানুষের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম। ইরান তার রাজনৈতিক অবস্থানে এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে দাঁড়াতে চেয়েছে বলেই তারা পশ্চিমা শিবিরের চোখে ‘অসহনীয়’ হয়ে উঠেছে। মজার কথা এই ধারনা সৌদি সরকার বা অন্যান্য মুসলিম দেশের নেই৷ তাই তারা আমেরিকার কফায় ওঠে ও বসে৷

এবার আসি মূল কথায় — ইরানে আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত সরকারের ধর্মীয় বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে— আর সেটা হলোঃ "ইমাম মাহদী (আঃ)-এর প্রতীক্ষা ও তাঁর আগমনের প্রস্তুতির ধারণা।" শিয়া ইসলামি চিন্তায় জুলুমবিরোধী অবস্থান, অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়তা এবং সত্যের পক্ষে অটল থাকা—এই বিশ্বাসেরই অংশ। ফলে ইরানের রাজনৈতিক প্রতিরোধ কেবল রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে আমেরিকার ইতিহাস বলে দেয়, তারা এমন কোনো আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মেনে নিতে পারে না, যা তাদের বিশ্বনিয়ন্ত্রণের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই ইরানকে ‘হুমকি’ বানিয়ে উপস্থাপন করা, নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়া—সবই একই পুরোনো কৌশলের অংশ। তাই ভয়ের কোন কারন নেই৷  ইতিহাস এটাও বলে, আদর্শকে শক্তি দিয়ে দমন করা যায় না।

আজকের বিশ্ব ক্রমেই বহু-মেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় আমেরিকার একচ্ছত্র নেতৃত্বের ধারণা দুর্বল হচ্ছে। আমেরিকার চোখ রাঙানির ভয়ে সবাই বশ্যতা স্বীকার করলেও ৪৫ বছর ধরে ইরানে আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত সমাজ দাঁড়িয়ে আছে অকুতভয়ে ৷ এটি ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সেই ইমামতি ধর্মীয় বিশ্বাস৷ আর এভাবেই ইতিহাসনির্ভর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দাঁড়ানো রাষ্ট্রগুলো নতুনভাবে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। আর ইরান সেই প্রবণতারই একটি 

গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সুতরাং ইরান–আমেরিকা দ্বন্দ্বকে যদি ইতিহাসের দীর্ঘ ধারায় দেখা হয়, তবে এটি স্পষ্ট হয়—এটি কেবল দুই রাষ্ট্রের বিরোধ নয়। এটি মূলত আদর্শ বনাম আধিপত্য, বিশ্বাস বনাম শক্তির দম্ভ, এবং নৈতিকতার দাবি বনাম রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষ। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোন পথকে বৈধতা দেবে—সে প্রশ্নের উত্তর অতীত বহুবার দিয়েছে, ভবিষ্যতও তার ব্যতিক্রম হবে না। অতএব আয়াতুল্লাহ প্রভাবিত ইরানকে দমন করা যাবে না৷

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha