সোমবার ৫ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৫:২৯
কারবালার কণ্ঠস্বর হযরত জয়নাব (সা.আ.): সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক

হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন সাহস, ন্যায়বিচার ও সত্যের এক অমর প্রতীক। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর তিনি জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নির্ভীক কণ্ঠে কথা বলে ইসলামের প্রকৃত বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন এবং কারবালার আত্মত্যাগকে ইতিহাসে চিরজাগরুক করে রাখেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ১৫ই রজব হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় নাতনি হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে এই দিনে বিশ্বের মুসলমানরা গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন।

ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী। তাঁর জীবন ছিল ঈমান, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে কারবালার যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তাঁর নেতৃত্ব ও ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

হযরত জয়নাব (সা.আ.) জন্মগ্রহণ করেন হিজরি ৬ সনের জমাদিউল আউয়াল মাসের ৫ তারিখে, মদিনায়। তিনি এমন এক পবিত্র পরিবারে লালিত-পালিত হন, যা কুরআনের আলো ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষায় সমৃদ্ধ ছিল। তাঁর পিতা ইমাম আলী (আ.) তাঁকে ন্যায়বিচার, আত্মমর্যাদা ও নেতৃত্বের শিক্ষা দেন এবং মাতা হযরত ফাতিমা (সা.) তাঁকে দয়া, পবিত্রতা ও আত্মত্যাগের আদর্শে গড়ে তোলেন।

শৈশবকাল থেকেই হযরত জয়নাব (সা.আ.) অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা ও বাগ্মীতার পরিচয় দেন। ইসলামী জ্ঞান ও কুরআন-হাদিসে তাঁর গভীর দখল ছিল এবং তিনি সুস্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় সত্য তুলে ধরতে পারতেন।

কারবালার ইতিহাসে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ৬১ হিজরির ১০ মুহাররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দে) সংঘটিত কারবালার যুদ্ধে তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর ৭২ জন সঙ্গী ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার জালিম বাহিনীর বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আত্মোৎসর্গ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন কারবালার অন্তরালের শক্তি। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের নৈতিক ও মানসিক সাহস জুগিয়েছেন, নারী ও শিশুদের দেখাশোনা করেছেন এবং চরম বিপর্যয়ের মাঝেও আহলে বাইতের শিবিরের মনোবল অটুট রেখেছেন।

ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের পর হযরত জয়নাব (সা.আ.) অবিচল দৃঢ়তায় নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বন্দিত্বের কঠিন ও অপমানজনক পরিস্থিতিতেও তিনি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং কুফা ও দামেস্কের দরবারে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে ইয়াজিদি শাসনের মুখোশ উন্মোচন করেন। তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের ভাষণই কারবালার রক্তস্নাত ইতিহাসকে ন্যায় ও সত্যের অনন্য দলিলে পরিণত করে।

আজ তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীতে মুসলমানরা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ত্যাগ, সংগ্রাম ও অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁর জীবনকথা পাঠ, দোয়া ও চিন্তন-মননের মাধ্যমে মানুষ ন্যায়, ঈমান ও মানবতার পথে অবিচল থাকার প্রেরণা লাভ করে।

কারবালার কণ্ঠস্বর হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—জুলুমের বিরুদ্ধে নীরবতা নয়, বরং সাহসী অবস্থান গ্রহণই সত্যিকার ঈমানের প্রকাশ। তাঁর আদর্শ যুগে যুগে মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা জোগাতে থাকবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha