বুধবার ৭ জানুয়ারী ২০২৬ - ০৯:৪৩
হযরত জয়নাব (সা.আ.) আশুরাকে অমর করে তুলেছেন

কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের মাধ্যমে যে মহান আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ত—যদি না হযরত জয়নাব (সা.আ.) তাঁর সাহসী অবস্থান, প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণ ও অতুলনীয় আত্মমর্যাদার মাধ্যমে সেই আন্দোলনের বার্তাকে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরতেন। তিনি কেবল একজন প্রত্যক্ষদর্শী নন; তিনি ছিলেন কারবালার বিপ্লবের রক্ষক, ব্যাখ্যাকার ও জীবন্ত কণ্ঠস্বর। হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর হাত ধরেই আশুরা শোকের স্মৃতি ছাড়িয়ে চিরন্তন চেতনায় রূপ নিয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ড. মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন কারবালা ও আশুরার প্রেক্ষাপটে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ঐতিহাসিক ও চিন্তাগত ভূমিকা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো।

হযরত জয়নাব (সা.আ.): ইতিহাসের বর্ণনাকারী নন, ইতিহাসের দিকনির্দেশক
ড. মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন বলেন, “কারবালাকে যদি আমরা কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখি, তবে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ভূমিকার গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তিনি ইতিহাস লিখেছেন কেবল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নয়, বরং দৃঢ় অবস্থান, বজ্রকণ্ঠ ভাষণ ও নৈতিক সাহসের মাধ্যমে।”

তাঁর মতে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইসলামের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর কাঁধেই এসে পড়ে। কুফা ও শামের দরবারে তাঁর ভাষণ জুলুমের মুখোশ উন্মোচন করে এবং সত্যকে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে।

হযরত জয়নাব (সা.আ.) ও প্রতিরোধের শিল্পভাষা
ড. ফারুক হুসাইন বলেন, “হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জীবন নিজেই এক পূর্ণাঙ্গ নাট্যকাব্য—যেখানে শোক আছে, কিন্তু ভেঙে পড়া নেই; আছে প্রতিবাদ, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; আছে আত্মমর্যাদা, কিন্তু অহংকার নয়।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মুসলিম সমাজ এখনো এই মহীয়সী নারীর চরিত্রকে শিল্পের ভাষায় যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেনি। অথচ তাঁর একটি ভাষণ, একটি দৃষ্টি কিংবা একটি নীরব অবস্থান শত শত বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।

সমকালীন বিশ্বে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর প্রাসঙ্গিকতা
ড. মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন বলেন, “আজকের পৃথিবীতে সত্য ও মিথ্যার সংঘর্ষ আর কেবল তলোয়ারের মাধ্যমে হয় না। এই লড়াই চলে মিডিয়া, প্রচারণা, শব্দ ও ছবির মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় হযরত জয়নাব (সা.আ.) আমাদের শেখান—কীভাবে সাহস, প্রজ্ঞা ও ভাষার শক্তি দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।”

তিনি বলেন, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার আসনে বসা শাসকের সামনে সত্য উচ্চারণ করা—হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর এই অবস্থান আজকের সাংবাদিক, লেখক ও চিন্তাবিদদের জন্য এক অনন্য আদর্শ।

শিশু-কিশোরদের মানস গঠনে হযরত জয়নাব (সা.আ.)
ড. ফারুক হুসাইনের মতে, “আমরা যদি শিশুদের সামনে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে কেবল শোকের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরি, তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় আড়াল হয়ে যায়।”

তিনি মনে করেন, শিশু ও কিশোরদের জন্য হযরত জয়নাব (সা.আ.) হওয়া উচিত সাহস, জ্ঞান, আত্মসম্মান ও নেতৃত্বের আদর্শ। গল্প, নাটক, কবিতা, অ্যানিমেশন ও সাহিত্য—এই মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে তাঁর চরিত্র নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত করা সম্ভব।

আলেমদের ভূমিকা: হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর বার্তাকে যুগোপযোগী করা
ড. মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন বলেন, “একজন আলেম কেবল অতীত বর্ণনা করেন না; তিনি অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেন। হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ভাষণ ও অবস্থানকে যদি আমরা সমকালীন ভাষায় উপস্থাপন করতে পারি, তবে তা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, দায়িত্ববোধ ও সৃজনশীলতা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর জীবনই প্রমাণ করে—নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই প্রকৃত সৃজনশীলতার জন্ম হয়।

তরুণ প্রজন্ম ও হযরত জয়নাব (সা.আ.)
ড. ফারুক হুসাইন বলেন, “আজকের তরুণরা কেবল উপদেশে সন্তুষ্ট হয় না; তারা জীবন্ত আদর্শ খোঁজে। হযরত জয়নাব (সা.আ.) এমন এক আদর্শ, যাঁর জীবন সাহস, সচেতনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি।”

তিনি বলেন, কোনো তরুণ যদি নাটক, গল্প বা চিত্রকল্পে হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মতো দৃঢ় ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন চরিত্রের মুখোমুখি হয়, তবে সেই প্রভাব তার চিন্তা ও জীবনবোধে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে।

হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর কণ্ঠেই কারবালা ইতিহাসের গণ্ডি অতিক্রম করে চিরন্তন চেতনায় রূপ নিয়েছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সত্যকে অমর করতে সবসময় তলোয়ারের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো দৃঢ় অবস্থান, প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষা ও আত্মমর্যাদাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রাসেল আহমেদ 

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha