হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
বিশেষ সাক্ষাত্কার
হাওজা নিউজ এজেন্সি আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। মাননীয় হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মাকবুল হাসান সাহেব, আজকের এই আলোচনায় আপনাকে স্বাগতম। আমরা আলোচনা করতে চাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় ইরানের ভূমিকা এবং এই বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যিদ আলী খামেনেইয়ের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। প্রথমেই জানতে চাই, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষাকে একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে?
মাওলানা মাকবুল হাসান: ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। প্রথমত, আপনার জন্য দোয়া রইল। ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি সভ্যতা। ইরানীয় ভূখণ্ডে হাজার হাজার বছরের জ্ঞান, দর্শন, শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য এবং অবশ্যই ইসলামী ঐতিহ্যের এক অপার সম্পদ রয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের দর্শন হলো, একটি জাতির শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য তার সাংস্কৃতিক শিকড়ের গভীরতার মধ্যেই নিহিত। সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেই (দা.) বারবার বর্ণনা করেছেন যে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন একটি জাতির জন্য সামরিক আগ্রাসনের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। তাই, নিজেদের পরিচয়, মূল্যবোধ ও উত্তরাধিকার রক্ষা করা জাতীয় নিরাপত্তার অঙ্গ। এটি একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার কারণ, সংস্কৃতি হল জাতির প্রাণ। প্রাণ হারালে দেহ অর্থহীন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। সর্বোচ্চ নেতা কীভাবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টিকে ইসলামী বিপ্লবের মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের সাথে সংযুক্ত করেছেন?
মাওলানা মাকবুল হাসান: দেখুন, ইসলামী বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও নৈতিক নবজাগরণ। ইমাম খোমেনী (রহ.) এবং তার যোগ্য উত্তরসূরি সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই (দা.) সবসময় বলেছেন, বিপ্লবের সত্যিকারের সাফল্য তখনই, যখন মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সর্বোচ্চ নেতার মতে, আমাদের ঐতিহ্য দুইটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে: প্রাক-ইসলামী ইরানের হাজার বছরের গৌরবময় জ্ঞানভাণ্ডার এবং ইসলামের ১৪০০ বছরের উজ্জ্বল ও মানবতাবাদী শিক্ষা। ইসলামী প্রজাতন্ত্র এই দুইয়ের সমন্বয়েই এগিয়েছে। তিনি শিয়া ইসলামের ধর্মীয় ঐতিহ্য, যেমন আশুরার চেতনা, আরবাঈন, মাজার ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং এগুলোর শিক্ষাকে সমাজে প্রচারের ওপর জোর দিয়েছেন। একইসাথে, ফেরদৌসী, সাদী, হাফিজ, রুমী, ইবনে সিনা, বীরজান্দীর মতো মনীষীদের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখতে এবং তাদের চিন্তাধারা পাঠদান, গবেষণা ও প্রচারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। এর পেছনে লক্ষ্য হল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মবিশ্বাসী ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে তোলা।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: বাস্তবে এর প্রয়োগ কীভাবে দেখা যায়? ইরান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় কী কী বাস্তব ও প্রতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছে?
মাওলানা মাকবুল হাসান: ইরান এই ক্ষেত্রে একটি মডেল। আপনি দেখেন:
১. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হস্তশিল্প ও পর্যটন সংস্থা: এটি একটি বৃহৎ মন্ত্রণালয়ের মতো কাজ করে। তারা দেশের অগণিত ঐতিহাসিক নিদর্শন, মসজিদ, প্রাসাদ, গ্রন্থাগার, জাদুঘর, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে কাজ করে।
২. ইরানের ইসলামিক প্রচার সংস্থা, আইআরআইবি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন: ইসলামী ও জাতীয় ঐতিহ্য ভিত্তিক সিনেমা, নাটক, সাহিত্য, সঙ্গীত ও ডকুমেন্টারি তৈরি ও প্রচারে নিয়োজিত।
৩. শিক্ষা ব্যবস্থা: পাঠ্যপুস্তকে ইরানের সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও ইসলামী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
৪. আন্তর্জাতিক অঙ্গন: ইউনেস্কোর সাথে সহযোগিতা করে ইরানের বহু সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধন করানো হয়েছে। পাশাপাশি, ইসলামী সভ্যতার বিরুদ্ধে চলে আসা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের মুখে সত্য তুলে ধরার জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে ইরান সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
৫. নির্দেশনা ও বাজেট বরাদ্দ: সর্বোচ্চ নেতা সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে এবং বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে এই কাজকে গতিশীল রেখেছেন। তিনি বলেছেন, "সাংস্কৃতিক কাজ অর্থনৈতিক কাজের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।"
হাওজা নিউজ এজেন্সি: কিছু মহল মনে করে, ইসলামী ব্যবস্থা প্রাচীন ইরানের প্রাক-ইসলামী ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে। এই ধারণা কতটা সঠিক?
মাওলানা মাকবুল হাসান: এটি একটি ভুল ধারণা, একটি অপপ্রচার। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই তার প্রাক-ইসলামী গৌরবকে অস্বীকার করেনি। বরং, সর্বোচ্চ নেতা সুস্পষ্ট বলেছেন, "ইসলাম আমাদের কাছে এসেছে একটি পরিপূর্ণ, সৌন্দর্য-প্রিয়, জ্ঞান-সন্ধানী ও মহান সংস্কৃতির উপর।" নওরোজ, ইরানের সবচেয়ে বড় প্রাক-ইসলামী উৎসব, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। নকশে জাহানের মতো স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, যে সকল ঐতিহ্য তাওহিদ, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়, সেগুলোকে সম্মান করা হয়। ইসলাম এখানে ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে নি, বরং তা পরিশোধন ও পরিপূর্ণ করেছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: বিশ্বায়ন ও পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের যুগে ইরান কীভাবে তার সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষা করছে?
মাওলানা মাকবুল হাসান: এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বোচ্চ নেতা একে "সাংস্কৃতিক আগ্রাসন" নাম দিয়েছেন। এর মোকাবিলায় ইরানের কৌশল হল:
· সাংস্কৃতিক আত্মনির্ভরতা: নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎপাদন, মিডিয়া, ইন্টারনেট সামগ্রী (জাতীয় তথ্যপ্রবাহ) শক্তিশালী করা।
· যুবসমাজের সচেতনতা: তরুণ প্রজন্মকে তাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে গর্ববোধ করতে শিক্ষা দেওয়া।
· পরিবারের ভূমিকা: পরিবারকে সংস্কৃতি রক্ষার প্রথম দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলার উপর জোর।
· সক্রিয় মোকাবিলা: পশ্চিমা সংস্কৃতির বিকৃত ও বস্তুবাদী দিকগুলোর সমালোচনা করে ইসলামী ও ইরানি বিকল্প বিশ্বের সামনে উপস্থাপন।
লক্ষ্য হল, দরজা বন্ধ করা নয়, বরং প্রবাহকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক রূপান্তর তৈরি করে বিশ্বে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিচয় তুলে ধরা।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় ইরানের এই ভূমিকা বিশ্বের, বিশেষত মুসলিম বিশ্বের জন্য কী বার্তা বহন করে?
মাওলানা মাকবুল হাসান: ইরানের বার্তা পরিষ্কার: আপনি যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চান, তাহলে আপনাকে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। আপনাকে বিদেশী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বন্ধ করে, নিজের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। মুসলিম বিশ্ব আজ যে সংকটে, তার একটি বড় কারণ সাংস্কৃতিক দাসত্ব। ইরান দেখিয়েছে যে, ইসলাম ও জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা রেখেও আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উন্নয়নে সমান তালে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এটি একটি জীবন্ত প্রমাণ যে, সত্যিকারের উন্নতি ও অগ্রগতি তখনই টেকসই হয়, যখন তা নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। বিশ্বের কাছে ইরানের উদাহরণটি হল আত্মসম্মানবোধ, ঐতিহ্যচেতনা এবং ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার এক অনন্য সমন্বয়।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: মাননীয় হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মাকবুল হাসান সাহেব, আপনার মূল্যবান সময় ও চমৎকার বিশ্লেষণের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
মাওলানা মাকবুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ। সকলের প্রতি শুভকামনা। আসসালামু আলাইকুম।
সাক্ষাত্কার গ্রহণ: হাসান রেজা
আপনার কমেন্ট