বৃহস্পতিবার ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ২০:২১
উম্মাহর ঐক্যের প্রকৃত ভিত্তি চিন্তার নতুন দিগন্ত

প্রতাবপুর দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ইসালে সওয়াব মাহফিলের কেন্দ্রীয় আলোচনায় এক ঐতিহাসিক ও গভীর চিন্তাধারার অবতারণা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দরবার শরীফের পেশ ইমাম মাওলানা রুহুল আমিন। তার ভাষণের মূল সুর ছিল মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা সম্পর্কিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিম বাংলা মেদিনীপুর জেলার প্রতাবপুর দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ইসালে সওয়াব মাহফিলের কেন্দ্রীয় আলোচনায় এক ঐতিহাসিক ও গভীর চিন্তাধারার অবতারণা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দরবার শরীফের পেশ ইমাম মাওলানা রুহুল আমিন। তার ভাষণের মূল সুর ছিল মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা সম্পর্কিত।

আধ্যাত্মিক বন্ধনই চিরস্থায়ী সমাধান

মাওলানা রুহুল আমিন তার দীর্ঘ আলোচনায় বলেন, "বর্তমান বিশ্বে উম্মাহর মধ্যকার বিভক্তি ও অনৈক্যের যেসব সমাধান প্রস্তাব করা হয়, তার বেশিরভাগই রাজনৈতিক মঞ্চকেন্দ্রিক বা সংগঠনভিত্তিক। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, রাজনৈতিক ঐক্য নশ্বর, কিন্তু আধ্যাত্মিক ঐক্য চিরন্তন। উম্মাহর প্রকৃত ঐক্য টিকে থাকে রাজনৈতিক দলের সম্মেলন মঞ্চে নয়, বরং টিকে থাকে আধ্যাত্মিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং সার্বজনীন মূল্যবোধের ছায়াতলে।"

তিনি প্রতাবপুর দরবার শরীফের উদাহরণ টেনে বলেন, "এই দরবার শরীফ শতাব্দী ধরে একটি আধ্যাত্মিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। এখানে মাযহাব, মতাদর্শ, ভাষা বা অঞ্চলভেদে কোনো বিভাজন নেই। সকলের সম্মিলন ঘটে এক আল্লাহ ও তার রাসূলের (স.) প্রতি প্রেম ও আনুগত্যের ভিত্তিতে। এটাই প্রকৃত ঐক্যের মৌলিক রূপ।"

আলোচনায় উল্লেখযোগ্য তিন স্তম্ভ

মাওলানা রুহুল আমিন তার বক্তব্যে উম্মাহর ঐক্যের জন্য তিনটি মৌলিক স্তম্ভের উপর জোর দেন:

১. মূল ভিত্তি তাওহিদ ও রিসালাত: সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে আল্লাহর একত্ববাদ ও নবী মুহাম্মদ (স.)-এর প্রতি ঈমান। এই মৌলিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই সকল প্রকার পার্থক্য ও বৈচিত্র্য সত্ত্বেও একটি অচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে উঠতে পারে।

২. সহিষ্ণুতা ও সংলাপের সংস্কৃতি: বিভিন্ন ফিকহী মাযহাব, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পার্থক্য যেন বিরোধের কারণ না হয়ে বরং জ্ঞানবিনিময় ও সমৃদ্ধির উৎস হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আন্তঃমাযহাব সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা।

৩. মানবিক কল্যাণমুখী সমাজ গঠন: একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর লক্ষ্য শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন নয়, বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক, নৈতিক ও কল্যাণমুখী সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এটিই ইসলামের সার্বজনীন বার্তার কেন্দ্রীয় বিষয়।

ইতিহাসের সাক্ষ্য ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

"ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়," বলেন মাওলানা আমিন, "যে সকল যুগে উম্মাহ আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তির উপর জোর দিয়েছে, তখনই তারা শক্তি, সমৃদ্ধি ও শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক জোট ভেঙে যায়, সীমানা বদলায়, কিন্তু হৃদয়ে হৃদয়ে গড়ে ওঠা আত্মার বন্ধন শতাব্দী পরেও টিকে থাকে। বর্তমান সময়ে যখন উম্মাহ নানা চ্যালেঞ্জ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মুখোমুখি, তখন এই আধ্যাত্মিক পুনরুজ্জীবনই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।"

বিশেষজ্ঞদের মতামত

মাওলানা রুহুল আমিনের বক্তব্যের মর্মকথা অত্যন্ত সময়োপযোগী। রাজনৈতিক উত্তাপের যুগে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে উম্মাহর মূল শক্তি তার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রীকতায়। প্রতাবপুরের মতো আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো ঐক্যের জীবন্ত মডেল হিসেবে কাজ করে।

শেষ কথা: এক হৃদয়ের ডাক

মাহফিল শেষে উপস্থিত হাজারো মানুষ মনে করেন, এই আলোচনা কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং এটি ছিল একটি আহ্বান। উম্মাহর সংহতি ও অগ্রযাত্রার পথ কেবল বৈঠক বা সম্মেলনের হলে আবদ্ধ নয়। এর ভিত্তি রচিত হতে হবে হৃদয়ে হৃদয়ে, আত্মায় আত্মায় আধ্যাত্মিক ঐক্য ও সংযোগের মাধ্যমে। রাজনীতি পরিবর্তনশীল, কিন্তু বিশ্বাসের বন্ধন চিরস্থায়ী – এই সত্যটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে প্রতাবপুর দরবার শরীফের এই ঐতিহাসিক আলোচনা।

রিপোর্ট: হাসান রেজা

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha