শনিবার ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১১:৫৪
ইসলামী বিপ্লব আধুনিক যুগে ইসলামকে পুনরায় ইতিহাসের মঞ্চে এক সক্রিয় শক্তি হিসেবে ফিরিয়ে এনেছে

হাওযা / তুরস্কের গবেষক ও লেখক ইউসুফ তাজগুন বলেন: ইমাম খোমেনি (রহ.)–এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি ধর্মকে শুধু আখিরাতের জন্য নয়, বরং পার্থিব জীবনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্যও প্রাসঙ্গিক মনে করতেন। তিনি আধ্যাত্মিকতাকে রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করেন এবং ফিকহকে কেবল কিছু বিধি-বিধানের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি গতিশীল ও সর্বব্যাপী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করেন, যা জীবনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁর মতে, “বেলায়াতে ফকীহ” তত্ত্বই এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা তুরস্কের আহলে বাইত উলামা সমিতির (এহলাদের) অন্যতম আলেম ইউসুফ তাজগুনের সঙ্গে ইসলামী বিপ্লব নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। তিনি কোমের হাওযা ইলমিয়ার শিক্ষার্থী, গবেষক ও লেখক। তিনি জানান, ছাত্রজীবনে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন ইমাম খোমেনি (রহ.), আল্লামা তাবাতাবায়ী এবং আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদীর দ্বারা। সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
হাওজা নিউজ এজেন্সি: সর্বপ্রথম আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি জানেন, আমরা বর্তমানে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বার্ষিকী উদযাপন করছি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে? আপনি কি একে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন, নাকি বৃহত্তর অর্থে একটি সভ্যতাগত আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করেন?
ইউসুফ তাজগুন: ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবকে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা মানে তার আত্মাকে অনুধাবন না করা। নিঃসন্দেহে একটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে এবং রাজতন্ত্র থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটি ছিল রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে মানসিক ও বিশ্বাসগত স্তরে। আধুনিক বিশ্বের “ধর্ম ব্যক্তিগত ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়”—এই দাবির বিপরীতে বিপ্লব ছিল এক নতুন আবির্ভাব।
আমি এই বিপ্লবকে আধুনিক যুগে ইসলামকে পুনরায় ইতিহাসের মঞ্চে এক সক্রিয় শক্তি হিসেবে প্রত্যাবর্তন বলে মনে করি। এটি ছিল একটি বাস্তব প্রচেষ্টা—দেখিয়ে দেওয়ার যে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও শিক্ষার সমষ্টি নয়; বরং আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিনির্মাণের সক্ষমতাও তার রয়েছে।
সভ্যতা শুধু শহর ও প্রতিষ্ঠান নয়; বরং মানুষ-চিন্তা, জ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গি, ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক এবং ন্যায়বিচারের ধারণাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলামী বিপ্লব ঠিক এই ক্ষেত্রগুলোতেই হস্তক্ষেপ করেছে এবং “কেমন মানুষ?”, “কেমন সমাজ?” ও “কেমন রাষ্ট্র?”—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ওহির ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী বিপ্লব কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং একটি সভ্যতা গঠনের প্রচেষ্টা।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: আপনার মতে ইসলামী বিপ্লবের মৌলিক বার্তা কী?
ইউসুফ তাজগুন: ইসলামী বিপ্লবের মূল বার্তা হলো—“স্বাধীনতা ও মর্যাদা কেবল আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।” বিপ্লব অভ্যন্তরীণ স্বৈরশাসন এবং বহিঃশক্তির আধিপত্য—উভয়ের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। “না পূর্ব, না পশ্চিম”—এই স্লোগান কেবল রাজনৈতিক অবস্থান ছিল না; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল।
ইসলামী বিপ্লব মুসলমানদের মধ্যে এই চেতনা জাগ্রত করেছে যে তারা অন্যদের নির্মিত মতাদর্শ অনুসরণে বাধ্য নয়; বরং নিজেদের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্ব প্রণয়ন করতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম সমাজগুলোকে প্রায়ই পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের ছায়ায় সংজ্ঞায়িত হতে হয়েছে। ইসলামী বিপ্লব ঘোষণা করেছে—“আমাদেরও বলার মতো কথা আছে।”
তিনি আরও বলেন, ইসলামী বিপ্লব আত্মত্যাগ, শাহাদাত, ধৈর্য ও প্রতিরোধের মতো ধারণাগুলোকে পুনরায় সামাজিক চেতনায় ফিরিয়ে এনেছে। এগুলো কেবল স্লোগান ছিল না; বরং যুদ্ধকাল ও নিষেধাজ্ঞার সময় বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: আজকের মুসলমানদের জন্য ইমাম খোমেনি (রহ.)–এর চিন্তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কী?
ইউসুফ তাজগুন: ইমাম খোমেনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি ধর্মকে শুধু আখিরাতের জন্য নয়, বরং দুনিয়াবি জীবন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক মনে করতেন। তিনি আধ্যাত্মিকতাকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেন এবং ফিকহকে একটি গতিশীল ও সর্বব্যাপী ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন। “বেলায়াতে ফকীহ” তত্ত্ব এই কাঠামোর মধ্যে কেবল একটি রাজনৈতিক মডেল নয়; বরং সামাজিক দিকনির্দেশনায় ধর্মের তাত্ত্বিক কাঠামো।
তিনি বলেন, ইমাম খোমেনির চিন্তায় রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই। তিনি যেমন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তেমনি একজন বিশিষ্ট আরিফও ছিলেন। তাঁর “চেহেল হাদিস” ও “আদাবুস সালাত” গ্রন্থে আত্মশুদ্ধি, আন্তরিকতা ও আধ্যাত্মিক সাধনার বিষয় আলোচিত হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; বরং

নৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্র।
তাজগুন জোর দিয়ে বলেন, আজকের মুসলমানদের জন্য ইমামের চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো “ভয়ের সীমা অতিক্রম করা।” বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যেও তিনি এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন—“সত্যভিত্তিক রাজনীতি কি সম্ভব?” অনেক মুসলিম সমাজের সমস্যা উপকরণের অভাব নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানে শিক্ষালাভকারী একজন আলেম হিসেবে আপনার ছাত্রজীবনে কোন ব্যক্তিত্ব আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন?
ইউসুফ তাজগুন: ইরানে অধ্যয়নকালে হাওযার পাঠ্যক্রমের গভীর বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে উসুলুল ফিকহ এমন একটি পদ্ধতিগত ও গভীর চিন্তাধারা গড়ে তোলে, যা শুধু ফিকহ নয়, সামগ্রিক চিন্তার কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।
ব্যক্তিত্বের দিক থেকে নিঃসন্দেহে দুইজন মহান ব্যক্তিত্ব—ইমাম খোমেনি (রহ.), যিনি আমাদের জীবন, বিশ্ব, ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছেন; এবং আল্লামা তাবাতাবায়ী (রহ.), যিনি সঠিক ও গভীর ধর্মবোধ গঠনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদীর আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সংলাপের পদ্ধতি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ছিল। তিনি ঐতিহ্য রক্ষা করলেও আধুনিক যুগের প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেননি।
শেষে তিনি বলেন, এসব মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের শিখিয়েছেন—ইসলামী চিন্তা কোনো স্থবির ঐতিহ্য নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত, সৃজনশীল, সমালোচনামূলক এবং সময়ের সঙ্গে সংলাপ করতে সক্ষম ধারাবাহিকতা।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামী বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ করে তরুণদের জন্য আপনার বার্তা কী?
ইউসুফ তাজগুন: আমি বলতে চাই, বিপ্লব শুরু হয় মন ও হৃদয় থেকে। যদি একজন তরুণ তার বিশ্বাসগত উৎস সম্পর্কে অবগত না থাকে, তবে সে অজান্তেই অন্যের ধারণায় চিন্তা করবে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি—সবাই একটি অর্থবহ জগত নির্মাণ করছে। তরুণদের—বরং আমাদের সবার—ক্লাসিক জ্ঞানের পাশাপাশি সময়ের ভাষাও শিখতে হবে। কার্যকর উপস্থিতি কেবল স্লোগানে নয়; বরং জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
শেষে তিনি হাওযা নিউজ এজেন্সিকে এই সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, তারা এই সংস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক বিষয়বস্তু মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করেন। তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে এই গণমাধ্যমের সংবাদ, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ ইসলামী বিশ্বে সচেতনতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেন তাদের সেবা বরকতময় ও স্থায়ী হয় এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করা হয়।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha