হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজা উপত্যকায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতির চার মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়েও গাজার মানুষ ইসরায়েলি হামলা, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়ের অভাবসহ নানাবিধ দুর্ভোগের সঙ্গে লড়াই করছে।
অনেক শহীদের মরদেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে এবং হাজারো রোগী ও আহত ব্যক্তি গাজার বাইরে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ফিলিস্তিনি নাগরিক মুহাম্মদ মুনইম পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে গাজার মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে মৌখিক ও লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন, যার সারাংশ নিচে তুলে ধরা হলো:
রহমত ও দয়ার মাস এসে গেছে; কিন্তু গাজার মানুষ সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন মানবিক সংকটের মধ্যে এ মাসে প্রবেশ করছে।
মাসের পর মাস সংঘর্ষ ও কঠোর অবরোধের ফলে অবকাঠামো, বাজার, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবুতে বসবাস করছে।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৫ লাখ জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো নিরাপদ পানি, খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ওষুধের তীব্র সংকটে রয়েছে।
তাঁবুর জীবন ও মৌলিক সুবিধাবঞ্চনা
যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, তারা এখন তাঁবু, স্কুল কিংবা আধা-ভাঙা ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত উষ্ণতা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই। ফলে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য রোগ—যেমন ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ—বাড়ছে।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা
অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিক সেবা দিচ্ছে। এখনো ১৮,৫০০-এর বেশি রোগী—যার মধ্যে প্রায় ৪,০০০ শিশু রয়েছে—গাজার বাইরে চিকিৎসার অপেক্ষায় আছে। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ সেবার তীব্র ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে।
ত্রাণবাহী ট্রাকের পরিসংখ্যান
যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি মানবিক সহায়তাবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গড়ে মাত্র ১৪৫টি ট্রাক প্রবেশ করেছে—যা নির্ধারিত চাহিদার ৩০ শতাংশেরও কম।
৬,০০০-এর বেশি ট্রাক—যেগুলোতে খাদ্য, ওষুধ, তাঁবু ও মানবিক সামগ্রী রয়েছে—মিশরে প্রবেশের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। প্রবেশ করা সহায়তার প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্যসামগ্রী এবং মাত্র ৫ শতাংশ ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।
রাফাহ ক্রসিং: শুধু যাত্রীদের জন্য
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাফাহ সীমান্তপথ কেবল যাত্রী, রোগী ও পরিবারের যাতায়াতের জন্য খোলা হয়েছে; কিন্তু মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি সহায়তাবাহী ট্রাকগুলোও নিয়মিতভাবে প্রবেশ করতে পারছে না এবং সীমিত পথ ও দীর্ঘ তল্লাশির মুখোমুখি হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও রমজানের ভবিষ্যৎ
বর্তমানে গাজায় খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি। প্রবেশ করা সহায়তাও লাখো মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়—বিশেষ করে রমজান মাসে, যখন ইফতার ও সাহরির খাবারের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বহু মানুষ সীমিত খাদ্য রেশন ও অল্প সহায়তা নিয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
রমজানে গাজার মানুষ উন্নতির আশায় দোয়া করছে, রোজা রাখছে এবং কঠিন সময়েও মানবিক মূল্যবোধ ও ঈমান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—জীবিকা সংকট, অপর্যাপ্ত ত্রাণ, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের ঘাটতি—এ রমজানকে তাদের জীবনের অন্যতম কঠিন রমজানে পরিণত করবে।
মুহাম্মদ মুনইম তাঁর প্রতিবেদনে রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার পর থেকে যাতায়াতের পরিসংখ্যানও উল্লেখ করেছেন: ২৭৫ জন গাজা ত্যাগ করেছেন, ২১৩ জন ফিরে এসেছেন এবং ২৬ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কুদসে রমজানি বিধিনিষেধ
গাজার বাইরে, দখলকৃত কুদসে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের অবস্থাও কঠিন হয়ে উঠেছে। তারা প্রতিদিন উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঝুঁকিতে থাকেন এবং রমজান মাসে আল-আকসা মসজিদে নামাজ আদায়ে উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধের মুখে পড়ছেন।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ রমজানে তারাবিহ ও জুমার নামাজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে তা হলো: আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স: নারীদের জন্য ৫০ বছর, পুরুষদের জন্য ৫৫ বছর।
তারাবিহ ও জুমার রাতে সর্বোচ্চ ১০,০০০ মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন।
পশ্চিম তীরের বাসিন্দারা (কুদসের বাসিন্দা নন) কেবল জুমার নামাজে অংশ নিতে পারবেন।
পুরাতন কুদস ও আল-আকসায় প্রবেশে ১৮০ জনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্মীরা সতর্ক করেছেন যে এসব বিধিনিষেধ ইবাদতের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করছে এবং দখলদার নীতির অংশ হিসেবে কুদসে ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি কমানোর উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়েছে। তারা বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সুযোগ সৃষ্টি অব্যাহত থাকলে উত্তেজনা অনিবার্যভাবে বিস্ফোরিত হবে এবং যেকোনো সংকট বৃদ্ধির দায় দখলদার সরকারের ওপর বর্তাবে।
এদিকে ইয়েদিওত আহারোনোত পত্রিকা জানিয়েছে, রমজানকে সামনে রেখে ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনী সতর্কতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শিগগিরই পশ্চিম তীরের উত্তরে সামরিক মহড়া পরিচালনা করবে, যা দখলদারিত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
আপনার কমেন্ট