হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রমজান কেবল একটি মাস নয়, এটি একটি মহাজাগতিক ইবাদত। এটি এমন এক সময় যখন আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে রহমতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
"রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের সুস্পষ্ট নিদর্শন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রমজানের মূল ভিত্তি হলো ‘জ্ঞান’ এবং ‘হেদায়েত’, যা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কঠোর আত্মসংযম।
১. সিয়ামের প্রকৃত দর্শন: কেবল ক্ষুধা নয়, বরং তাকওয়া
রমজানের রোজা রাখা মানে কেবল তৃষ্ণা আর ক্ষুধাকে সহ্য করা নয়। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এই উপবাসের গভীরতা ব্যাখ্যা করে বলেছেন:
"যখন তোমরা রোজা রাখো, তখন যেন তোমাদের কান, চোখ, চুল, ত্বক এবং শরীরের প্রতিটি অঙ্গও রোজা রাখে (অর্থাৎ পাপ থেকে বিরত থাকে)। তোমাদের রোজা রাখার দিনটি যেন সাধারণ দিনের মতো না হয়।" (আল-কাফি)
এই মহৎ শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, রমজান হলো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অপবিত্রতা থেকে নিজেকে মুক্ত করার এক ঐশ্বরিক সুযোগ।
২. কোরআন ও আহলে বাইত: হেদায়েতের অবিচ্ছেদ্য সূত্র
রমজান হলো কুরআনের বসন্তকাল। আর এই কুরআনকে সঠিকভাবে বোঝার চাবিকাঠি হলো নবী পরিবার বা আহলে বাইত (আ.)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত হাদীস (হাদীসে সাকোলাইন) অনুযায়ী, কুরআন এবং আহলে বাইত একে অপরের পরিপূরক। রমজানে আমরা যখন কুরআন তিলাওয়াত করি, তখন আহলে বাইতের আদর্শ আমাদের শেখায় কীভাবে সেই কুরআনের শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হয়।
ইমাম আলী (আ.) রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন:
"কতই না রোজাদার আছে যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই জোটে না; আর কতই না ইবাদতকারী আছে যাদের ইবাদতের বিনিময়ে জাগরণ ও কষ্ট ছাড়া আর কিছুই জোটে না।" (নাহজুল বালাগা, হিকমত ১৪৫)
অর্থাৎ, অন্তরের পবিত্রতা ছাড়া কেবল বাহ্যিক আচার কোনো কাজে আসে না।
৩. সহমর্মিতা ও দানের মহিমা
রমজান আমাদের শেখায় অভাবী মানুষের আর্তনাদ শুনতে। আহলে বাইতের প্রতিটি সদস্য ছিলেন দানশীলতার মূর্ত প্রতীক। ইমাম হাসান (আ.) তাঁর জীবনের অর্জিত সম্পদ একাধিকবার আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। রমজান আমাদের সেই ত্যাগের শিক্ষা দেয়। যখন আমরা ইফতারের সুস্বাদু খাবারের সামনে বসি, তখন যেন আমাদের হৃদয়ে সেইসব মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগে যারা অনাহারে দিন কাটায়।
৪. লাইলাতুল কদর: মহিমান্বিত রজনী
রমজানের শেষ দশকে লুকিয়ে আছে ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদরের রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। কুরআনে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে।" (সূরা আল-কদর: ১)
এই রাতে মালাইকা (ফেরেশতাগণ) এবং ‘রূহ’ অবতীর্ণ হন। এই রাতটি হলো নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। আহলে বাইতের শিক্ষা অনুযায়ী, এই রাতে জেগে থেকে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে আমরা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারি। রমজান আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে, যেখানে আমরা আমাদের আসল রূপ দেখতে পাই। এটি তওবা বা ফিরে আসার মাস। আহলে বাইতের দেখানো পথে যদি আমরা এই মাসটিকে অতিবাহিত করতে পারি, তবেই আমাদের রোজা হবে প্রকৃত ‘ইবাদত’। আসুন, এই পবিত্র মাসে আমরা কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং গোটা মানবতার মুক্তি ও শান্তির জন্য দোয়া করি।
সৈয়দ ইয়াসিন মেহদী ইফাজ
আপনার কমেন্ট