হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ হাদি ফাল্লাহ রেডিও মাআরেফের “গানজে সা'দাত বা সৌভাগ্যের সোপান” অনুষ্ঠানে “হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ধৈর্যশীলতার পুরস্কার” শীর্ষক আলোচনায় তাঁর জীবনের এই অসাধারণ দিকটি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। আলোচনাটি জ্ঞানান্বেষী ও চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ধৈর্যশীলতার পুরস্কার সম্পর্কে বলা হয়েছে: “যখন হযরত খাদিজা (সা.আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিয়ে করলেন, তখন মক্কার মহিলারা তাকে একা রেখে দিয়েছিলেন।”
হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট ও অপবাদ
উল্লেখ্য, হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর মর্যাদা, বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থান এতই উচ্চ ছিল যে তিনি কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করতেন না। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্যতম সম্মানিত নারী এবং সফল ব্যবসায়ী। একসময় মক্কার অনেক নারী তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন এবং তাঁর উদারতা ও দানশীলতা থেকে উপকৃত হতেন।
কিন্তু যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিয়ে করলেন এবং নবুওয়াতের দাওয়াত প্রকাশ্যে শুরু হলো, তখন সেই সমাজের একাংশ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। তারা তাঁর কাছে আসা বন্ধ করে দেয়, সালাম বিনিময় বন্ধ করে দেয় এবং অন্যদেরও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিরুৎসাহিত করে। যেন এই মহীয়সী নারীকে একঘরে করে দেওয়ার জন্য তারা পরস্পরের সঙ্গে এক অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল।
তারা তাঁর সম্মানিত স্বামী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ দিত, নবুওয়াতের সত্যতাকে অস্বীকার করত এবং নানা কুৎসা রটনা করত। অথচ হযরত খাদিজা (সা.আ.) কখনো তাঁর স্বামীর সত্য মিশন থেকে বিচ্যুত হননি। বরং প্রতিটি অপবাদ ও কষ্টের মুহূর্তে তিনি নবীজির পাশে অটল থেকেছেন। সামাজিক বয়কট, মানসিক নির্যাতন ও একাকীত্ব—সবকিছু তিনি ধৈর্যের সঙ্গে বহন করেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে শেবে আবি তালিবের অবরোধের সময়ও তাঁর ত্যাগ ও সহনশীলতা বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিন বছরব্যাপী কঠিন অবরোধে তিনি তাঁর সমগ্র সম্পদ ব্যয় করেন ইসলামের স্বার্থে এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও কষ্ট সহ্য করেন অবিচল ঈমান নিয়ে। তাঁর এই আত্মত্যাগই ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে মুসলমানদের টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল।
মাতৃত্বের অনন্য অধ্যায়: হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর সান্ত্বনা
যখন হযরত খাদিজা (সা.আ.) গর্ভবতী হলেন এবং তাঁর গর্ভে ধারণ করলেন উম্মে আবিহা, হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)-কে—তখন তাঁর জীবনে এক অলৌকিক অধ্যায় সূচিত হয়। ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ফাতিমা (সা.আ.) মাতৃগর্ভ থেকেই তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: “তিনি মায়ের গর্ভ থেকে তার সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন।”
এটি ছিল এক অনন্য ও আধ্যাত্মিক ঘটনা, যা প্রমাণ করে যে এই পরিবার ছিল ধৈর্য, পবিত্রতা ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে ধন্য। হযরত খাদিজা (সা.আ.) এই বিষয়টি গর্ভের সন্তানের সঙ্গে অনুভব করতেন ও আলাপ করতেন, কিন্তু সম্ভবত বিস্ময় বা লজ্জাবোধ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তা আলোচনা করতেন না।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে প্রবেশ করে শুনলেন যে খাদিজা (সা.আ.) কারও সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে খাদিজা, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?”
তিনি উত্তরে বললেন,
“আমার গর্ভের এই ভ্রূণের সঙ্গে কথা বলছি; সে আমার সঙ্গে কথা বলে এবং আমাকে সান্ত্বনা দেয়।”
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হে খাদিজা, জিবরাইল আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে এটি একটি কন্যাসন্তান।”
“সে হবে পবিত্র বংশধর।”
“আল্লাহ তাআলা অচিরেই আমার বংশধারা তার মাধ্যমে স্থাপন করবেন।”
“এবং তার বংশধর থেকে ইমামগণ আবির্ভূত হবেন।”
এই সুসংবাদ শুধু একটি সন্তানের আগমনের বার্তা ছিল না; এটি ছিল ভবিষ্যতের এক মহিমান্বিত ইতিহাসের ঘোষণা—যেখানে ইমামদের পবিত্র ধারা হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করবে।
ধৈর্যের পুরস্কার ও চিরন্তন প্রভাব
হযরত খাদিজা (সা.আ.)-এর ধৈর্য ছিল তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি। তিনি ছিলেন প্রথম বিশ্বাসী নারী, প্রথম সমর্থক, প্রথম সহযোদ্ধা—যিনি নবুওয়াতের কঠিনতম সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সম্পদ, তাঁর মানসিক দৃঢ়তা, তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে।
তিনি প্রমাণ করেছেন—ধৈর্য কেবল সহ্য করার নাম নয়; বরং সত্যের পথে অবিচল থাকা, প্রতিকূলতার মাঝেও আল্লাহর প্রতি আস্থা অটুট রাখা এবং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো নীরব শক্তি ধারণ করাই প্রকৃত ধৈর্য।
এই মহীয়সী নারী তাঁর ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ত্যাগের মাধ্যমে শুধু একজন আদর্শ স্ত্রী বা মা হিসেবেই নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য আদর্শ রূপে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সামাজিক বয়কট, অপবাদ ও প্রতিকূলতা সাময়িক; কিন্তু ঈমান, ধৈর্য ও আত্মত্যাগ চিরন্তন।
আপনার কমেন্ট