হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া—বিশেষত The New York Times—এ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু চাঞ্চল্যকর শিরোনাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা কূটনৈতিক মহল থেকে সাধারণ জনমত পর্যন্ত ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি উত্তরসূরি মনোনীত করেছেন!
সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেয়ি তাঁর অধিকাংশ ক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের কাছে হস্তান্তর করেছেন!
যত দ্রুত সম্ভব ইরান ত্যাগ করুন, বিদেশিরা!
ইরানে পরিস্থিতি সংকটজনক!
নেতৃত্ব হত্যার আশঙ্কা!
প্রথম নজরে এগুলো সাধারণ সংবাদ শিরোনাম বলে মনে হলেও, বাস্তবে এগুলো একটি নির্দিষ্ট বয়ান (Narrative) তৈরি করছে।
এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব সম্পর্কিত অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন তথ্য জনমনের মনস্তত্ত্ব, অর্থনৈতিক আচরণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভাইরাল হওয়া এসব খবরকে ইরানি জনগণের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকাণ্ড প্রভাবিত করা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পরিবেশ তৈরির সচেতন প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
আমেরিকান মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান ব্যাপক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেয়ি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানির কাছে অর্পণ করেছেন। The New York Times-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে ইরানের ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিপ্লবী গার্ডের তিন সদস্য এবং দুই সাবেক কূটনীতিকের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা হুমকির পর আলি লারিজানি বাস্তবে সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়গুলো দেখভাল করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব শিরোনাম কি কেবল তথ্য সরবরাহ করছে, নাকি কোনো বৃহত্তর কূটনৈতিক খেলার অংশ? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare) কখনো কখনো প্রচলিত যুদ্ধের চেয়েও কম প্রভাবশালী নয়।
ইরানের মতো একটি দেশে, যেখানে বিপ্লবী ব্যবস্থার ভিত্তি আদর্শিক ঐক্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে, নেতৃত্ব সংক্রান্ত গুজব বা জল্পনা বড় ধরনের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা কোনো ব্যক্তির সরাসরি মনোনয়নের মাধ্যমে নির্বাচিত হন না। এই ক্ষমতা রয়েছে ‘মজলিসে খোব্রেগান-এ-রাহবারি’ (বিশেষজ্ঞ পরিষদ)-এর হাতে, যা আলেমদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সংস্থা। এই পরিষদই সর্বোচ্চ নেতার নিয়োগ ও তদারকির অধিকারী।
বর্তমান নেতার মতামত অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে বটে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওই পরিষদেরই। অতএব “মনোনয়ন” শব্দটিকে সরাসরি নিয়োগ হিসেবে না দেখে বরং একটি ইঙ্গিত বা অভ্যন্তরীণ পরামর্শ হিসেবে বোঝা উচিত।
তবে যদি সংবাদটি সত্যও হয়, তাহলে একে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে—যার লক্ষ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রতিরোধ করা। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বিশেষজ্ঞ পরিষদের এখতিয়ারেই থাকবে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে মাত্র দু’জন সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন—রুহুল্লাহ খোমেনি এবং আলি খামেনেয়ি। তৃতীয় নেতৃত্ব নির্বাচন ইরানের বিপ্লবী ব্যবস্থার জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভারসাম্যকেই প্রভাবিত করবে না, বরং সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (পাসদারান)—এর ভূমিকাকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে।
ইরানকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করার ভুল যারা করছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত, আদর্শভিত্তিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্বের প্রশ্নকে চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করলে সাময়িক মনোযোগ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করা যায় না।
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলো:
সংবাদের উৎস যাচাই করা,
সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা বোঝা,
আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার বদলে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা।
কারণ তথ্যের এই যুগে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়—মনের ভেতরেও লড়া হয়। আর ইরান এই মানসিক যুদ্ধে নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করতে প্রস্তুত নয়; কেননা তারা অস্ত্রের শক্তির পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপরও পূর্ণ আস্থা রাখে। সুতরাং ইরানকে ভেনেজুয়েলা মনে করার ভুল করা উচিত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি উত্তরসূরি মনোনীত করেছেন! মাওলানা তাকী আব্বাস রিজভী
আপনার কমেন্ট