বুধবার ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৭:০৪
হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি দিক বিশ্বনারীদের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ—মাওলানা তাকি আব্বাস রিজভী 

হাওজা / বর্তমান যুগে বিশ্বনারীরা-বিশেষ করে আমাদের মা, বোন, কন্যা ও পুত্রবধূরা-যদি হযরত খাদিজাতুল কুবরা সালামুল্লাহি আলাইহার জীবন থেকে পবিত্রতা ও সতীত্ব, উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা, রোজা-নামাজের প্রতি যত্ন, জিকির-ফিকিরের আদব, স্বামী ও সন্তানের পরিচর্যা এবং জীবনযাপনের অন্যান্য পদ্ধতি শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর পবিত্র সিরাতকে পথপ্রদর্শক বানান, তবে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের পাশাপাশি দীন ও দুনিয়া উভয়ই সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহলে বাইত (আ.) ফাউন্ডেশন, ভারতের সহ-সভাপতি হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা তাকি আব্বাস রিজভী বলেন, ১০ রমজান হলো উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.), মহানবী (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী এবং হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর সম্মানিতা মাতার ওফাত দিবস। ইতিহাস এই বছরকে “আমুল হুযন” (দুঃখের বছর) নামে স্মরণ করে।
তিনি আরও বলেন, হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.) নবুওয়তের পূর্বেই প্রিয় নবীজির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন। তিনি শুধু ইসলামের প্রথম ঈমানদার নারীই নন, বরং ইসলামের সত্যনিষ্ঠ, আন্তরিক সহানুভূতিশীল, নবুওয়তের সমর্থক ও সহায়ক, আশ্রয়দাত্রী এবং রহমতের নবীর জন্য পরিপূর্ণ রহমত ছিলেন। উত্তম চরিত্র, উচ্চ মর্যাদা, উদারতা, দানশীলতা, দরিদ্র ও অভাবীদের প্রতি সহমর্মিতা এবং এতিম প্রতিপালন ছিল তাঁর বিশেষ গুণাবলি।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত মর্যাদা, বংশগৌরব ও সম্পদের দিক থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সম্মানিত নারী। তাঁর মহান গুণাবলির কারণে তাঁকে “মালিকাতুল আরব” (আরবের রাণী), “নাসিরাতুর রাসূল” (রাসূলের সহায়িকা), “মুহসিনাতুল ইসলাম” (ইসলামের উপকারিণী), “উম্মুয্-দিয়াফ” (অতিথিপরায়ণা), “উম্মুল মাসাকীন” (অভাবীদের জননী) এবং “উম্মুল ইয়াতামা” (এতিমদের অভিভাবক) উপাধিতে স্মরণ করা হয়।
মাওলানা তাকি আব্বাস বলেন, এসব উপাধি থেকে বোঝা যায় যে মানবসেবা, সত্যের সমর্থন, স্বামীর খেদমত ও মানুষের উপকার সাধন ছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। একজন নারী যতই শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, দায়িত্বশীলা, চাকরিজীবী বা ধনী হোন না কেন, বিবাহের পর তিনি প্রথমত একজন স্ত্রী-এরপর অন্যান্য সম্পর্ক। স্ত্রী স্বামীর আনুগত্যশীলা, আনন্দের উৎস এবং উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থায় কল্যাণকামী। তাঁর দাম্পত্য জীবন পর্যালোচনা করলে বলা যায়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা ও মমতার, আর স্ত্রী স্বামীর জন্য শান্তি ও প্রশান্তির উৎস। তিনি স্বামীর প্রতি সকল কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছেন।
আরবের রাজকুমারী ও সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর প্রতি আনুগত্য এবং কন্যা সাইয়্যিদা ফাতিমা যাহরা (সা.)-কে আদর্শ শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত আগত নারীদের এই বার্তা দিয়েছেন-মজবুত পরিবার গড়তে সৎ ও সুশিক্ষিত সন্তান অপরিহার্য; সুশিক্ষা ও সুশাসনহীন পরিবার কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিবাহ পছন্দের হোক বা অপছন্দের-এর মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত দ্বীনদারী, তাকওয়া ও নেক আমল। নারীরা স্বামী নির্বাচনে শুধু ধন-সম্পদ নয়, ঈমান, উত্তম চরিত্র, উত্তম আচরণ ও জীবনধারাকেও বিবেচনা করবেন এবং স্বামীর ন্যায়সঙ্গত কাজ ও আল্লাহর পথে তাঁর পদক্ষেপকে সর্বদা সমর্থন করবেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা পুরুষকে নারীর অভিভাবক ও রক্ষক করেছেন এবং দায়িত্বের কারণে তাকে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যদি আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা বৈধ হতো, তবে স্ত্রী তার স্বামীকেই করত-এমন বাণীও এসেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সুস্থতাই পরিবার ও সমাজের দৃঢ়তার ভিত্তি।
ভারতের এই বিশিষ্ট আলেম বলেন, হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.) পরিবারকে শক্তিশালী করার যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তা বিশ্বনারীদের জন্য অনুসরণীয় ও পথপ্রদর্শক। নবীজির পবিত্র জবান থেকে তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে যে প্রশংসাবাণী উচ্চারিত হয়েছে, তা অন্য কোনো স্ত্রী সম্পর্কে পাওয়া যায় না। মহানবী (সা.) তাঁর সম্পর্কে বলতেন: “ইন্নি রুযিক্তু হুব্বাহা”-আল্লাহ তাঁর ভালোবাসাকে আমার রিজিক বানিয়েছেন। তিনি আরও বলতেন: “আল্লাহ আমাকে খাদিজার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দেননি। যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলত, তিনি আমার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেন; যখন মানুষ আমাকে বয়কট করত, তিনি তাঁর সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতেন। আল্লাহ আমাকে তাঁর মাধ্যমেই এমন সন্তান দান করেছেন, যা অন্য স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি।”
নিশ্চয়ই তাঁর জীবন মুসলিম উম্মাহর জন্য গৌরবের বিষয়। তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ ইসলামের পথে ব্যয় করার পরও আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতেন-“হায়! যদি আমার আরও সম্পদ থাকত, তবে আমি তা ইসলাম ও ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার পথে বিলিয়ে দিতাম, যাতে কুফর, নাস্তিকতা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে ইসলাম আরও বেশি হেদায়েতের আলো ছড়াতে পারত।”

আহলে বাইত (আ.) ফাউন্ডেশন, ভারতের সহ-সভাপতি বলেন, তাঁর আর্থিক সহায়তার কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বচ্ছল ও নির্ভার হন। আল্লাহ কুরআনে বলেন: “ওয়াওয়াজাদাকা আ’ইলান ফা আগনা”—তিনি আপনাকে অভাবী পেয়েছিলেন, অতঃপর স্বচ্ছল করে দিয়েছেন। মহানবী (সা.) নিজেও বলেছেন: “খাদিজার সম্পদের মতো কোনো সম্পদ আমাকে উপকৃত করেনি।” তাঁর সম্পদ দিয়ে নবীজি ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ, এতিম ও দরিদ্রদের সহায়তা এবং শা'আবে আবি তালিবের অবরোধকালে বনি হাশিম ও বনি মুত্তালিবের সাহায্য করেন। বহু বর্ণনায় এসেছে-আবু তালিব (আ.) ও খাদিজা (সা. আ.) নিজেদের সমস্ত সম্পদ ইসলামের পথে ব্যয় করেছিলেন।
শেষে তিনি বলেন, আজকের যুগে যদি আমাদের মা-বোন-কন্যা ও পুত্রবধূরা হযরত খাদিজাতুল কুবরা (সা.)-এর জীবন থেকে সতীত্ব, উত্তম চরিত্র, রোজা-নামাজের যত্ন, জিকির-ফিকিরের আদব, স্বামী-সন্তানের পরিচর্যা ও জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর পবিত্র সিরাতকে অনুসরণ করেন, তবে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন যেমন সুন্দর হবে, তেমনি দীন ও দুনিয়াও কল্যাণময় হবে। এর মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদাবিরোধী কুপ্রথা দূর করা এবং তালাকসংক্রান্ত নানা সমস্যা ও অপরাধ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha