তেল-অর্থ আর ক্ষমতার খেলায় মুসলিম বিশ্বের আপাত ঐক্যের ভাঙ্গন’-এই শিরোনামে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মাসুম আলী গাজীর (আয়াতুল্লাহ ইয়াকুবী সাহেবের ভারতের পশ্চিম বঙ্গের প্রতিনিধি ও মুবাল্লিগ) মুখোমুখি হয়েছেন হাওজা নিউজ সাংবাদিক। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে কীভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আন্তর্জাতিক চাপ মুসলিম দেশগুলোর প্রকৃত ঐক্যকে ব্যাহত করছে। আলোচিত হয়েছে তেলনির্ভর অর্থনীতির দুর্বলতা, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ওআইসির ব্যর্থতা ও উত্তরণের সম্ভাব্য পথ।
হাওজা নিউজ এজেন্সি:
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আজকের সাক্ষাৎকারে আমরা আলোচনা করব মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও জটিল একটি বিষয়-তেল-অর্থ আর ক্ষমতার খেলা কীভাবে মুসলিম উম্মাহর আপাত ঐক্যকে ভেঙে দিচ্ছে? এই প্রসঙ্গে আমাদের বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মাসুম আলী গাজী। তাঁকে জানাই আন্তরিক স্বাগত।
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। হাসান, আপনার এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। তেল-অর্থ আর ক্ষমতার এই খেলার ফলাফল আজ পুরো উম্মাহ ভোগ করছে। আসুন, খোলামেলা বিশ্লেষণ করি।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘আপাত ঐক্য’ বলতে কী বোঝাতে চান?
মাওলানা সাহেব, আপনি শিরোনামে ‘আপাত ঐক্যের ভাঙ্গন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আপাত ঐক্য বলতে আপনি কী বোঝাতে চান?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
ভালো প্রশ্ন। দেখুন, মুসলিম দেশগুলোতে আজ যা দেখা যায়, তা হলো ‘মুখের ঐক্য’। তারা একই প্ল্যাটফর্মে বসে, একই বক্তৃতা দেয়, ফটোসেশন করে-কিন্তু বাস্তবে কোনো যৌথ পদক্ষেপ নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের পর গাজায় যা ঘটল, তাতে ওআইসি বৈঠক করল কিন্তু কোনো কার্যকর প্রস্তাব দিতে পারল না। এই যে দেখা দেওয়া আর পালানো-এটাই ‘আপাত ঐক্য’। যখন তেলের দাম বা ক্ষমতার সমীকরণ সামনে আসে, তখন সেই ঐক্য উধাও হয়ে যায়।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: তেল-অর্থ কীভাবে ঐক্য ভাঙছে?
তেল-অর্থ কীভাবে এই ভাঙ্গনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
হাসান, তেল আজ শুধু জ্বালানি নয়-এটা ভূরাজনীতির অস্ত্র। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার-এই দেশগুলোর তেলের বিনিময় ডলারে হয়। আর ডলার মানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। তাই যখন ইসরায়েল গাজায় বোমা ফেলে, তখন এই দেশগুলো প্রকাশ্যে কিছু করতে পারে না, কারণ তাদের ব্যাংক ও অর্থনীতি পশ্চিমা ব্যবস্থায় আটকে আছে। আবার ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশ তেল বিক্রি করতে পারে না নিষেধাজ্ঞার কারণে-ফলে তারাও দুর্বল। এই অর্থনৈতিক বন্ধনই মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সত্যিকারের জোট গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ক্ষমতার খেলা বলতে ঠিক কোন দিকগুলো?
তেল ছাড়াও ক্ষমতার খেলা কীভাবে ঐক্যে বাধা দিচ্ছে?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
ক্ষমতার খেলার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো-ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তারা ইসলামের দুই বড় শক্তি, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাকে। তুরস্ক আর মিশরও এক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ছিল। আবার পাকিস্তান-ইরান সীমান্তেও উত্তেজনা আছে। এই প্রতিযোগিতার সুযোগ নিচ্ছে ইসরায়েল ও আমেরিকা। তারা চায় মুসলিম দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে ব্যস্ত থাকুক, যাতে ফিলিস্তিন ইস্যু পেছনে পড়ে যায়। আর আফসোসের বিষয়, মুসলিম শাসকরাও এই খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: সাধারণ মুসলমানের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?
এই আপাত ঐক্য ও ভাঙ্গনের জটিল খেলার ফলাফল সাধারণ মানুষকে কীভাবে স্পর্শ করছে?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
সাধারণ মুসলমান আজ বিভ্রান্ত। একদিকে তারা দেখে সৌদি আরব ও ইরান চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে-খুশির খবর। অন্যদিকে গাজার জন্য কার্যকর কোনো জোট গড়ছে না। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করে-আমাদের তেলের টাকা কোথায় যায়? কেন আমাদের নেতারা ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি করছে? কেন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ওআইসি কাজ করছে না? ফলে মানুষের মনে একটা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বুঝতে পারছে-তেল-অর্থ আর ক্ষমতার লোভই আসল শত্রু, আর সেটা ভিতর থেকেই উম্মাহকে খাচ্ছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই ভাঙ্গনের থেকে উত্তরণের পথ কী?
তাহলে মাওলানা সাহেব, এই জটিল বাস্তবতার মধ্যে কি কোনো সমাধান আছে? উম্মাহ কীভাবে এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসবে?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
অবশ্যই সমাধান আছে, তবে সেটা সহজ নয়। প্রথম কাজ হলো-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা। মুসলিম দেশগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, ডলার নির্ভরতা কমানো, ব্রিকস ও শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো জোটে শক্তিশালী ভূমিকা রাখা।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ-যাতে নিজেদের অস্ত্র তৈরি করা যায়, মিডিয়া কাউন্টার করতে পারি, খাদ্য ও জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।
তৃতীয়ত, জনসচেতনতা-জনতাকে বুঝতে হবে কে আসল শত্রু। মসজিদের মিম্বার থেকে মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত-সব জায়গায় উম্মাহর স্বার্থের কথা বলতে হবে।
চতুর্থত, নতুন নেতৃত্ব তৈরি-যে নেতৃত্ব স্বার্থ নয়, বরং ইসলামী আদর্শকে সামনে রাখবে। যখন জনতা নিজেরাই স্বার্থের শাসকদের প্রত্যাখ্যান করবে, তখন বাধ্য হয়ে নেতৃত্ব বদলাবে।
ইনশাআল্লাহ, একদিন এই তেল-অর্থ আর ক্ষমতার খেলা শেষ হবে। কিন্তু সেই দিন আসতে হলে আজ থেকেই সংগ্রাম শুরু করতে হবে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: শেষ কথা কী বলবেন উম্মাহর উদ্দেশে?
সবশেষে, মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশে আপনার একটিমাত্র বার্তা কী?
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
আমার শেষ বার্তা একটাই-উম্মাহ জাগো। তেল-অর্থ আর ক্ষমতার খেলায় হারিয়ে যেও না। মনে রেখো, তেল শেষ হয়ে যাবে, ক্ষমতা বদলাবে, কিন্তু কেয়ামত পর্যন্ত ফিলিস্তিন ও কুদসের দায়িত্ব তোমার ওপরই থাকবে। আল্লাহ কোরআনে বলেন: "তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
এই আয়াত আজকের উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় প্রেসক্রিপশন। পৃথিবীর সব মুসলিম দেশ, আরব-অনারব, সুন্নি-শিয়া-সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। তেলের টাকা যেন উম্মাহর কল্যাণে ব্যয় হয়, মুষ্টিমেয় শাসকের বিলাসিতায় নয়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
হাওজা নিউজ এজেন্সি:
মাওলানা মাসুম আলী গাজী, আপনার অমূল্য সময় ও গভীর বিশ্লেষণের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনি যেভাবে তেল-অর্থ ও ক্ষমতার খেলার জটিল জাল উন্মোচন করেছেন, তা সত্যিই চিন্তার খোরাক জোগায়।
মাওলানা মাসুম আলী গাজী:
জাজাকাল্লাহু খাইরান। সবাই দোয়ায় মনে রাখবেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাজিদুল ইসলাম শাহ
আপনার কমেন্ট