হাওজা নিউজ এজেন্সি: শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) তাঁর দারসে খারিজে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর একটি হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবাদতে ইখলাস, অন্তরের পবিত্রতা এবং দুনিয়াবি আসক্তি থেকে হৃদয়কে রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)’র হাদীস উল্লেখ করে বলেন—
طُوبَى لِمَنْ أَخْلَصَ لِلَّهِ الْعِبَادَةَ وَالدُّعَاءَ، وَلَمْ يَشْغَلْ قَلْبَهُ بِمَا تَرَى عَيْنَاهُ، وَلَمْ يَنْسَ ذِكْرَ اللَّهِ بِمَا تَسْمَعُ أُذُنَاهُ، وَلَمْ يَحْزُنْ صَدْرَهُ بِمَا أُعْطِيَ غَيْرُهُ.
সৌভাগ্য তারই, যে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর উদ্দেশে ইবাদত ও দোয়া করে; চোখে যা দেখে তা দিয়ে নিজের অন্তরকে ব্যস্ত করে না; কানে যা শোনে, তা যেন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে; আর অন্য কাউকে কোনো নিয়ামত দেওয়া হয়েছে বলে— সে অন্তরে দুঃখ বা হিংসা পোষণ করে না।
হাদিসের ব্যাখ্যা: শহীদ ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) বলেন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দোয়া ও ইবাদতে পরিপূর্ণ ইখলাস। অর্থাৎ, প্রতিটি আমল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ কোনো ইবাদত অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সেই ইখলাস ধরে রাখতে পারেন না। আমলের মাঝপথে দুনিয়াবি স্বার্থ, আত্মপ্রদর্শন বা অন্য নানা উদ্দেশ্য নিয়তের সঙ্গে মিশে যায়। তাই শুধু ইখলাস নিয়ে আমল শুরু করাই যথেষ্ট নয়; বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই ইখলাস অক্ষুণ্ণ রাখাই প্রকৃত বান্দার পরিচয়।
শহীদ ইমাম বলেন, মানুষের চোখ সবসময় দুনিয়ার নানা চাকচিক্য, সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় বিষয়ের মুখোমুখি হয়। এসব দৃশ্য যদি হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তাহলে ইবাদতের বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ন হয়। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের অন্তরকে এমনভাবে পাহারা দেওয়া, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত আসক্তি সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি একজন আলেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, মানুষের উচিত নিজের হৃদয়ের জন্য একটি দরজা তৈরি করা, যাতে নিষিদ্ধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। যদিও এটি অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু প্রকৃত শিল্প এখানেই।
তিনি আরও বলেন, কানও মানুষের অন্তরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। মানুষ সবকিছু শোনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না। কিন্তু সে যা শুনবে, তা যেন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। একজন মুমিনের জন্য এ বিষয়েও সর্বদা সতর্ক থাকা জরুরি।
হাদিসের শেষ অংশের ব্যাখ্যায় শহীদ ইমাম বলেন, অন্যের প্রাপ্তি, সাফল্য বা মর্যাদা দেখে অন্তরে হিংসা বা কষ্ট পোষণ করা ইখলাসের পরিপন্থী। হিংসা মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। বরং একজন মুমিনের উচিত, তার ঈমানদার ভাই বা বোনের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা।
তিনি বলেন, প্রকৃত ইবাদত শুধু বাহ্যিক আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তরকে দুনিয়ার মোহ, গাফেলকারী বিষয় এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রেখে প্রতিটি আমলকে একমাত্র আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ রাখা—এটাই প্রকৃত বন্দেগির শিল্প এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ।
সূত্র: শহীদ ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’রর দারসে খারিজে হাদিসের ব্যাখ্যা, ১৩৮৭/২/২৯ (১৮ মে ২০০৮)।
আপনার কমেন্ট