শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬ - ১৭:৩৫
‘প্রতিরোধ’ থেকে বিশ্বের জন্য আটটি সভ্যতাগত শিক্ষা; বিশ্ব প্রতিরোধের মূল্য উপলব্ধি করেছে

ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের জুমার নামাজের খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি বলেছেন, প্রতিরোধ হলো মহান আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত একটি সচেতন, সামাজিক, সক্রিয় ও সুপরিকল্পিত ধৈর্য। তিনি বলেন, ইরানি জাতি এই প্রতিরোধের পথ অবলম্বন করে মহান লক্ষ্য অর্জন এবং ইসলামী নবসভ্যতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সাম্প্রতিক ‘তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ’ ও বৃহৎ সভ্যতাগত সংঘাত থেকে ইরানি জাতির প্রতিরোধের আটটি বৈশ্বিক ও সভ্যতাগত শিক্ষা তুলে ধরেন এবং বলেন, বিশ্ব আজ প্রতিরোধের গুরুত্ব ও মূল্য উপলব্ধি করেছে।

প্রতিরোধ ও জিহাদের দুটি মৌলিক উপাদান
তিনি বলেন, প্রতিরোধ ও জিহাদ দুটি মৌলিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমটি হলো ইজ্জত (العزة)—অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজের আত্মমর্যাদা এবং সম্মানবোধ। শত্রুর মুখোমুখি হলে যে ব্যক্তি বা জাতি নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে, তার মধ্যেই প্রকৃত প্রতিরোধের শক্তি জন্ম নেয়। ব্যক্তি থেকে সমাজ—সর্বত্র আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

দ্বিতীয়টি হলো সবর (الصبر)—অর্থাৎ কষ্ট, সংকট ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকা। দেশ, জাতি এবং আল্লাহর আদর্শ রক্ষার পথে যে কষ্ট আসে, তা ধৈর্যের সঙ্গে বহন করাই প্রকৃত প্রতিরোধের ভিত্তি।

তিনি বলেন, প্রতিরোধ ও জিহাদ এই দুই অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য—ইজ্জত ও সবরের ওপর নির্ভরশীল।

সবর একটি যুক্তিসঙ্গত নীতি
তিনি বলেন, বাধা-বিপত্তি ও কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা মানবজীবনের একটি স্বীকৃত ও যুক্তিসঙ্গত নীতি।

তিনি আরও বলেন, যে জাতির মধ্যে আত্মমর্যাদা ও ধৈর্য বিদ্যমান থাকে, সেই জাতিকে পরাজিত করা যায় না; শেষ পর্যন্ত বিজয় তাদেরই হয়।

সবর উন্নতির অন্যতম শর্ত
তিনি বলেন, মহান লক্ষ্য ও উচ্চ আদর্শ অর্জনের প্রধান শর্ত হলো ধৈর্য।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পবিত্র কুরআনে শতাধিকবার "সবর" শব্দটি বিভিন্ন রূপে উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করে।

ইসলামী শরিয়তের ভিত্তি হিসেবে সবর
তিনি বলেন, ইসলামী বর্ণনায় সবরকে শরিয়তের সব বিধানের ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

রেওয়ায়েতে সবরের বিভিন্ন দিক উল্লেখ রয়েছে—
১.  صبر على المصيبة — বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ।

২. صبر على الطاعة — আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে অবিচল থাকা।

৩. صبر عن المعصية — গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার ধৈর্য।

সবরের দুই ধরন
তিনি বলেন, সবর দুই প্রকার। প্রথমটি হলো এমন ধৈর্য, যা মানুষের ইচ্ছার বাইরে সংঘটিত বিপদ-আপদের সময় প্রয়োজন হয়।

দ্বিতীয়টি হলো নির্বাচিত বা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা ধৈর্য। অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালন, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের জন্য সচেতনভাবে কষ্টের পথ বেছে নেয়।

তিনি বলেন, কখনো কোনো বিপদ আমাদের ওপর এসে পড়ে; তখন ধৈর্য ধরতে হয়। আবার কখনো আমরা নিজেরাই আল্লাহর দায়িত্ব পালনের জন্য কঠিন পথে এগিয়ে যাই। এটিই সক্রিয় ও নির্বাচিত ধৈর্য।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক সবর
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সবর হলো নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কষ্ট সহ্য করা।

আর সামাজিক সবর হলো এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে একটি জাতি সম্মিলিতভাবে মহান আদর্শ, স্বাধীনতা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ঝুঁকি ও কষ্টকে সাদরে গ্রহণ করে।

তিনি বলেন, সমসাময়িক রাজনৈতিক ভাষায় এই সক্রিয়, সামাজিক ও সচেতন সবরকেই "মুকাওয়ামাহ" (প্রতিরোধ) বলা হয়।

প্রতিরোধের প্রকৃত অর্থ
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ইসলামি বিপ্লবের দুই নেতা—ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি—ইরান ও বিশ্বের রাজনৈতিক সাহিত্যে বহু নতুন ধারণা সংযোজন করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো মুকাওয়ামাহ (প্রতিরোধ), যা আজ ইসলামী বিশ্বে একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিরোধ হলো এমন এক সচেতন, সামাজিক, সক্রিয় ও সুপরিকল্পিত ধৈর্য, যার মাধ্যমে স্বাধীনতা, জাতির মর্যাদা এবং মহান আদর্শ অর্জনের লক্ষ্যে বড় বড় ঝুঁকি ও কষ্টকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা হয়।

এরপর তিনি পবিত্র কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করেন—

وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ.

অর্থ: আর কত নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বহু আল্লাহভীরু মানুষ যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর পথে বিপদে আক্রান্ত হয়েও তারা মনোবল হারাননি, দুর্বল হননি এবং শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করেননি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৪৬)

তিনি বলেন, এটাই আদর্শিক ও মাহদাবী সবর। আল্লাহর নেক বান্দারা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন; তারা দুর্বল হননি এবং শত্রুর প্রবল ঝড়ও তাদেরকে পিছু হটাতে পারেনি। বরং তারা দৃঢ়তার সঙ্গে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সবর কেবল একটি মানসিক গুণ নয়; বরং এটি অন্তরের দৃঢ়তা, অবিচলতা এবং সংকটের মুখে স্থির থাকার শক্তি।

এরপর তিনি আরও একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন—

 إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا.

অর্থ: তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (সূরা আলে ইমরান: ১২০)

তিনি বলেন, কুরআনের এই শিক্ষা প্রমাণ করে যে ধৈর্য ও তাকওয়া শত্রুর ষড়যন্ত্র মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ থেকে বিশ্বের জন্য আটটি শিক্ষা
খুতবার দ্বিতীয় অংশে আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং চলমান বৃহৎ সভ্যতাগত সংঘাত বিশ্ববাসীর সামনে এমন কিছু বাস্তবতা উন্মোচিত করেছে, যা ইতিহাসের গতিপথকে প্রভাবিত করবে। তাঁর ভাষায়, এ যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; বরং এটি বিশ্বসভ্যতার জন্য শিক্ষণীয় একটি ঘটনা।

প্রথম শিক্ষা: সমসাময়িক বিশ্বের নৈতিক ব্যবস্থার পতন
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রথম শিক্ষা হলো সমসাময়িক বিশ্বের নৈতিক ব্যবস্থার পতন।

তিনি বলেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবসভ্যতা আগে কখনো এমন নৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়নি। আজ বিশ্বের সম্পদ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলো নৈতিকতার ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য থেকেও বঞ্চিত হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, মানবতার বিবেক আজ শোকাহত। ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের একাংশও এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ কেবল জনগণের কণ্ঠস্বর হয়েই রয়ে গেছে; ক্ষমতাসীন শক্তিগুলো তাদের জুলুম ও আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, আজ বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়েছে এবং মানবসভ্যতা একটি নতুন ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা: আন্তর্জাতিক আইন ও ব্যবস্থার পতন
তিনি বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায়ের মুখে হয় নীরব থেকেছে, নয়তো অত্যাচারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, বাস্তবে তা কখনোই তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ভেঙে পড়েছে এবং বিশ্বকে আবার এমন এক জঙ্গলে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে শক্তিই ন্যায় নির্ধারণ করছে।

তৃতীয় শিক্ষা: আমেরিকা ও জায়োনিস্টদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হয়েছে
তিনি বলেন, অতীতে আমেরিকা ও জায়োনিস্টদের প্রকৃত চেহারা মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করে তুলে ধরতে হতো। কিন্তু আজ তাদের প্রকৃত রূপ সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, শিশুহত্যা, গণহত্যা, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং সামরিক ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য না করে নির্মম হামলা—এসবই আজ আমেরিকা ও জায়োনিস্টদের বাস্তব চিত্র হিসেবে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

চতুর্থ শিক্ষা: তাদের সঙ্গে আলোচনার ওপর কোনো আস্থা নেই
তিনি বলেন, অতীতে বড় বড় শত্রুরাও আলোচনার টেবিলে কিছু ন্যূনতম নীতি ও অঙ্গীকার রক্ষা করত।

কিন্তু তিনি বলেন, সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে যে এই অপরাধীরা নিজেদের প্রথম চুক্তি ও অঙ্গীকারই লঙ্ঘন করেছে।

তিনি বলেন, ফলাফল হলো—তাদের কোনো কথার ওপর ভরসা করা যায় না। যে তাদের কথায় বিশ্বাস করবে, সে হয় সরলতার কারণে করবে, নয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে করবে।

পঞ্চম শিক্ষা: ধার করা নিরাপত্তা কোনো কাজে আসে না
তিনি বলেন, অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পেরেছে যে আমেরিকার কাছ থেকে ধার করা নিরাপত্তা কিংবা তার ওপর নির্ভরশীলতা কোনো উপকারে আসে না।

এরপর তিনি অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশে বলেন, তোমরা যতদিন ইসলাম ও ইরানের শত্রুদের পাশে থাকবে, ততদিন আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন তোমাদের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা: আমেরিকার কাচের প্রাসাদ
তিনি বলেন, মানবজাতির জানা উচিত যে আমেরিকা একটি কাচের প্রাসাদে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, আমেরিকা বালুর ওপর দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, কিন্তু তার ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরান, প্রতিরোধ অক্ষ এবং ইরানি জাতির সামনে আমেরিকা দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।

সপ্তম শিক্ষা: ইরানি জাতি কখনোই পিছু হটবে না
তিনি বলেন, নেতানিয়াহু, ট্রাম্প এবং তাদের সহযোগীরা জেনে রাখুক—এই জাতি ইসলাম, ইসলামি বিপ্লব, নেতৃত্ব এবং সশস্ত্র বাহিনীর পাশে অটল রয়েছে। তারা কখনোই পিছু হটবে না।
 

তিনি আরও বলেন, এই জাতি তাদের আদর্শের জন্য সদা প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও দ্বিধা করবে না।

অষ্টম শিক্ষা: বিশ্ব প্রতিরোধের মূল্য উপলব্ধি করেছে
তিনি বলেন, আজ বিশ্ব বুদ্ধিদীপ্ত ও সচেতন প্রতিরোধের মূল্য উপলব্ধি করেছে।

তিনি বলেন, শত্রুরা আমাদের আত্মসমর্পণের স্বপ্ন দেখেছিল; কিন্তু সেই স্বপ্ন তারা কবরে নিয়েই যাবে। আত্মসমর্পণ করতে হলে শত্রুকেই সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিপ্লবের শহীদ নেতৃবৃন্দ, ইরানের শহীদ এবং প্রতিরোধের শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

প্রতিরোধের পথ অব্যাহত রাখতে যা প্রয়োজন
তিনি বলেন, ইরানি জাতি এই পথ অব্যাহত রাখবে। তবে বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে প্রতিরোধকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয় অপরিহার্য—

• সচেতনতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা;
• সাহস এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় উপস্থিতি;
• বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি;
• মহান আদর্শকে কেন্দ্র করে জাতীয় ও সামাজিক ঐক্য;
• এবং ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নেতৃত্বের অনুসরণ।

তিনি বলেন, এসব শর্ত পূরণ করতে পারলেই জাতি তার প্রতিরোধের পথ সফলভাবে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।

সামরিক শক্তি আজকের বিশ্বের অপরিহার্য বাস্তবতা
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, বর্তমান বিশ্বে সামরিক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় জীবনের অপরিহার্য শর্ত।

তিনি বলেন, সামরিক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা সশস্ত্র বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারের দায়িত্ব। বর্তমান বিশ্বে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শর্ত।

তিনি আরও বলেন,
যারা সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিত না, তারা ভুল করেছিল।

তিনি বলেন, প্রতিরোধের এই পথ অব্যাহত রাখতে জিহাদি ব্যবস্থাপনা (مدیریت جهادی) অপরিহার্য এবং জনগণকেও এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে হবে।

সাংস্কৃতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
তিনি বলেন, প্রতিরোধের ধারাকে শক্তিশালী করতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশে, বিশেষ করে কোমে, হিজাব ও ইসলামী মূল্যবোধের বিষয়ে আমাদের আরও যত্নবান হতে হবে। এ দায়িত্ব সবার।

তিনি আরও বলেন, প্রতিরোধকে টিকিয়ে রাখতে সমাজের পবিত্রতা ও নৈতিক শুদ্ধতা অপরিহার্য।

আরবাঈন একটি সভ্যতাগত ঘটনা
আয়াতুল্লাহ আরাফি ইরান ও ইরাকে আরবাঈনের আয়োজন সফল করতে যারা কাজ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, একটি গৌরবোজ্জ্বল, শত্রুভীতিসঞ্চারী এবং সভ্যতাগত তাৎপর্যপূর্ণ আরবাঈন আয়োজনের জন্য যারা চেষ্টা করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

তিনি আরও বলেন, আরবাঈনের মহাসমাবেশ একটি গভীর গবেষণার বিষয় এবং এর ওপর আরও বেশি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কুরআনের দৃষ্টিতে সবর
তিনি বলেন, সবর কেবল বিপদ সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে মহান লক্ষ্য অর্জনের পথে অবিচল রাখে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পবিত্র কুরআনে একাধিক স্থানে সবরের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি পুনরায় কুরআনের বাণী উদ্ধৃত করেন—

 إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا.

অর্থ: তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
— সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১২০

তিনি বলেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে ধৈর্য ও তাকওয়া শত্রুর ষড়যন্ত্র মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

সবরের প্রকৃত অর্থ
তিনি বলেন, সবর কেবল মানসিক সহিষ্ণুতা নয়।

বরং সবর হলো—
• দৃঢ়চিত্ততা,
• অন্তরের স্থিরতা,
• ঈমানে অটল থাকা,
• এবং সংকট, ভয় ও প্রলোভনের মতো ‘মানসিক জীবাণু’র বিরুদ্ধে আত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

সক্রিয় সবরই প্রতিরোধ
তিনি বলেন, কখনো মানুষ অনিচ্ছাকৃত বিপদের মুখোমুখি হয়—সেখানে ধৈর্য ধরতে হয়।

আবার কখনো মানুষ স্বেচ্ছায় আল্লাহর সন্তুষ্টি, ন্যায়, স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য কঠিন পথ বেছে নেয়।

তিনি বলেন, এই দ্বিতীয় ধরনের ধৈর্যই সক্রিয় সবর, আর আধুনিক ভাষায় একেই ‘প্রতিরোধ (মুকাওয়ামাহ)’ বলা হয়।

প্রতিরোধের সংজ্ঞা
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, প্রতিরোধ হলো এমন এক সচেতন, সামাজিক, সক্রিয়, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী ধৈর্য, যার মাধ্যমে স্বাধীনতা, জাতির মর্যাদা এবং মহান আদর্শ অর্জনের জন্য বড় বড় ঝুঁকি ও কষ্টকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা হয়।

তিনি বলেন, ইরানি জাতি এই প্রতিরোধকে মহান আদর্শ বাস্তবায়ন এবং ইসলামী নবসভ্যতার পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।

কুরআনের আলোকে আদর্শিক প্রতিরোধ
তিনি এ সময় পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন—

وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ.

অর্থ: আর কত নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বহু আল্লাহভীরু মানুষ যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর পথে বিপদে আক্রান্ত হয়েও তারা মনোবল হারাননি, দুর্বল হননি এবং শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করেননি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।
— সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬

তিনি বলেন, এটাই আদর্শিক ও মাহদবী সবর। আল্লাহর নেক বান্দারা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন; তারা দুর্বল হননি, ভেঙে পড়েননি এবং শত্রুর প্রবল ঝড়ও তাদের পিছু হটাতে পারেনি।

সমাপনী দোয়া
খুতবার সমাপ্তিতে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা, ইরানি জাতির বিজয়, শহীদদের উচ্চ মর্যাদা, আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম জাতিকে হেফাজতের জন্য দোয়া করেন।

তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি মুসলিম উম্মাহকে ঐক্য, ঈমান, ধৈর্য এবং প্রতিরোধের শক্তিতে সমৃদ্ধ করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha