হাওজা নিউজ এজেন্সি: টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সামতে খোদা’-তে দেওয়া বক্তব্যে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মাদ রাফিয়ি বলেন, পবিত্র কোরআন মুসলমানদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য এবং পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাত থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কোরআন সতর্ক করে বলেছে, বিবাদ ও বিভক্তি সমাজকে দুর্বল করে এবং তার শক্তি ও সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
তিনি সূরা আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াত— “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে”—উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সময়ে এ নির্দেশনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতাও তাঁর সাম্প্রতিক বার্তায় জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
হাওজায়ে ইলমিয়ার এই অধ্যাপক বলেন, মদিনায় ইসলামী সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। প্রথমেই তিনি একটি সামাজিক সনদ ও আইন প্রণয়ন করেন, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। এমনকি মদিনার ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্যও নির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা। মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের অনেকেই তখন জীবন-জীবিকা ও আশ্রয়ের সংকটে ছিলেন। মহানবী (সা.) তাদের সঙ্গে মদিনার আনসারদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে আবদ্ধ করেন, যা ইসলামী সমাজে সংহতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, ঐক্য জোরদারের তৃতীয় পদক্ষেপ ছিল মসজিদ প্রতিষ্ঠা। মহানবী (সা.) মসজিদকে সমাজের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়সমূহ পরিচালিত হতো।
তিনি আরও বলেন, চতুর্থ পদক্ষেপ ছিল অতীতের দ্বন্দ্ব ও শত্রুতার অবসান ঘটানো। দীর্ঘদিন ধরে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত আওস ও খাজরাজ গোত্রকে মহানবী (সা.) বুঝিয়েছিলেন যে, ইসলামের আগের সংঘাতের যুগ শেষ হয়েছে এবং নতুন সমাজকে ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.) মানুষের মাঝে সরাসরি উপস্থিত থাকতেন, বিভিন্ন গোত্র ও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তাঁর জীবনাদর্শে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের বহু উদাহরণ রয়েছে। হযরত আলী (আ.)-কেও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছিল।
শত্রুর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শত্রুরা সমাজের অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারা উপলব্ধি করেছে যে সরাসরি সামরিক মোকাবিলা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা অর্থনৈতিক অবরোধ, সাংস্কৃতিক চাপ এবং সামাজিক বিভাজনের কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, বিভেদ সৃষ্টির এই প্রচেষ্টা সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহকর্মী বা সহযাত্রীদের মধ্যেও দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়। শত্রুরা সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজে বিভিন্ন চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক প্রবণতার মানুষ রয়েছে। কেউ রাষ্ট্র ও বিপ্লবের প্রশ্নে বেশি সক্রিয়, কেউ তুলনামূলকভাবে নির্লিপ্ত, আবার কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী। কিন্তু এসব পার্থক্য সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে ঐক্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনাদর্শের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও হাদিসভিত্তিক সূত্রগুলোতে ইমামদের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ ও পত্রালাপের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে কঠিন পরিস্থিতিতেও যোগাযোগ, সমন্বয় এবং সামাজিক সম্পর্ক অটুট রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াত— “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না”—উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সময়ে এ নির্দেশনার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ শত্রুরা সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়।
জনাব রাফিয়ি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর একটি দোয়া উদ্ধৃত করে বলেন, ইমাম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন, “বিপদ আসার আগেই আমাকে নিরাপত্তা ও কল্যাণ দান করুন।” এর মাধ্যমে তিনি প্রতিরোধমূলক সচেতনতার শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন অসুস্থ হওয়ার পর সুস্থ হওয়ার চেয়ে অসুস্থ না হওয়াই উত্তম, তেমনি পাপে লিপ্ত হওয়ার পর তওবা করার চেয়ে শুরু থেকেই পাপ থেকে দূরে থাকা অধিক কল্যাণকর।
এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আলী (আ.)-এর বিখ্যাত বাণী উদ্ধৃত করেন: “পাপ বর্জন করা তওবা করার চেয়ে সহজ।”
তিনি বলেন, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে প্রতিরোধমূলক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রোগ প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে উত্তম, তেমনি পাপ থেকে দূরে থাকাও পাপের পর অনুতাপের চেয়ে শ্রেয়।
যুবসমাজের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো পাপ বা নেতিবাচক আচরণ যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা পরিত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সত্যবাদিতা, সততা ও উত্তম চরিত্রও মানুষের স্বভাবে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষের উচিত নিজের জিহ্বাকে সত্য কথা বলার এবং নিজের আচরণকে উত্তম চরিত্রের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা, যাতে মিথ্যা, দুর্ব্যবহার ও সম্পর্কচ্ছেদ জীবনে স্থান না পায়।
সবশেষে তিনি বলেন, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠনের অন্যতম চাবিকাঠি হলো দৃঢ় সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তি। মানুষের অনেক সমস্যার মূল কারণ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও অঙ্গীকারের অভাব। পবিত্র কোরআনও কয়েকজন নবীকে ‘উলুল আজম’ বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সফলতার জন্য দৃঢ় সংকল্প ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
আপনার কমেন্ট