হাওজা নিউজ এজেন্সি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের সমাজে সাংস্কৃতিক রুচির পরিবর্তনের কারণে অনেক ইরানি পরিবারের ঘরে বই যেন কেবল সাজসজ্জার সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বইয়ের গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন, জীবনে কোনো কিছুই বইয়ের বিকল্প হতে পারে না।
বিশিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদদের মতে, একটি জাতির সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ কেবল বইয়ের তাকের ওপর গড়ে ওঠে না; বরং সেই হাতের মধ্যেই গড়ে ওঠে, যে হাত বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টায়। পরিচালিত অসংখ্য গবেষণার ফলাফলও দেখিয়েছে, একটি সমাজের মানুষের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম-সচেতনতা বৃদ্ধিতে বই পড়ার অভ্যাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ, কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি বিষয়কে উপেক্ষা করা উচিত নয়। সেটি হলো মায়ের নিজের বই পড়ার অভ্যাস। কারণ বইপাঠী মায়েরাই চিন্তাশীল ও মননশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর।
আন্তর্জাতিক গবেষণার উদ্বেগজনক ফলাফল
পাঠদক্ষতা মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গবেষণা হলো PIRLS (Progress in International Reading Literacy Study)। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ অনুধাবনের সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
এই গবেষণার ফলাফল ইরানের জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। যেখানে আন্তর্জাতিক গড় স্কোর ৫০০, সেখানে ইরানি শিক্ষার্থীদের গড় স্কোর ৪১৩। অর্থাৎ পাঠ অনুধাবনের ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
তবে এসব সংখ্যা কেবল একটি র্যাংকিং বা অবস্থান নির্দেশ করে না; বরং এগুলো ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতও দেয়। এর অর্থ হলো, নতুন প্রজন্মের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং কোনো লেখা গভীরভাবে অনুধাবনের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষামূল্যায়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের বিশ্লেষণে এই দুর্বলতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পার্থক্যের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যালয় বা শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা সরাসরি পারিবারিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর মধ্যে রয়েছে ঘরে থাকা বইয়ের সংখ্যা, বাবা-মায়ের সাংস্কৃতিক আলোচনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—মায়ের বই পড়ার অভ্যাস ও আচরণ।
শিশুদের পাঠদক্ষতা বৃদ্ধিতে বইপাঠী মায়ের ভূমিকা
এ বিষয়ে ফারহাঙ্গিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মেহদি ইউসুফি বলেন, যেসব শিশুর মায়েদের প্রতিদিন বই পড়ার অভ্যাস রয়েছে, তারা পাঠ অনুধাবনের পরীক্ষায় গড়ে তাদের সহপাঠীদের তুলনায় ৪৫ নম্বর বেশি অর্জন করেছে। তাঁর মতে, এটি প্রমাণ করে যে মায়ের জ্ঞান ও পাঠাভ্যাস সন্তানের জ্ঞান ও পাঠদক্ষতার ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, ১৪০১ (২০২২) সালের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ প্রতি মাসে অন্তত একটি পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়েন। দুঃখজনকভাবে, এই পরিসংখ্যানে মায়েদের অংশগ্রহণও কম।
তবে যেসব পরিবারে মা সপ্তাহে অন্তত একবার বই পড়েন, সেসব পরিবারের সন্তানদেরও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অন্য পরিবারের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। অর্থাৎ মায়ের অল্প সময়ের পাঠাভ্যাসও সন্তানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
বইপাঠের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে মায়ের ভূমিকা
হাওজায়ে ইলমিয়ায়ে খাওয়াতিনের গবেষক নরজেস শেকারজাদে বলেন, পরিবারে বইপাঠের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মা হলেন প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর ব্যক্তি।
তিনি বলেন, ঘরের শান্ত পরিবেশে একজন মায়ের হাতে বই দেখে যে জীবন্ত উদাহরণ শিশু পায়, তা তার মনে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে, যা হাজার ঘণ্টার সরাসরি শিক্ষামূলক পরামর্শ দিয়েও তৈরি করা কঠিন।
কারণ, এভাবে শিশু বই পড়াকে কোনো বাধ্যতামূলক কাজ হিসেবে দেখে না; বরং জীবনের একটি স্বাভাবিক ও আনন্দদায়ক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। ফলে পরবর্তী জীবনেও সে এই অভ্যাস ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের উদ্যোগে শিশুর বিকাশ ও মনোবিজ্ঞানের ওপর একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, যেসব মায়েরা প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিনিট করে সন্তানদের গল্প পড়ে শোনাতেন, তাদের সন্তানদের শব্দভাণ্ডার ও পাঠ অনুধাবনের সক্ষমতা সমবয়সী অন্যান্য শিশুর তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এই প্রক্রিয়াকে ‘ভালোবাসার সঙ্গে পাঠ’ বলা হয়। এর মাধ্যমে শেখার প্রক্রিয়াটি শিশুর নিরাপত্তাবোধ, ভালোবাসা ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
গল্প বলা মায়েরাই গড়ে দেন সন্তানের চিন্তার ভিত্তি
নরজেস শেকারজাদে আরও বলেন, মায়ের কণ্ঠ, তাঁর স্নেহময় উপস্থিতি এবং গল্প আবিষ্কারের আনন্দ—সবকিছুই শিশুর মনে শব্দ ও ভাষাকে জীবন্ত ও স্থায়ী করে তোলে।
এ কারণেই শিশুর বিকাশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের প্রথম পাঁচ বছরেই ভাষা ও আবেগের মৌলিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। এ সময়ে একজন গল্প বলা মা মূলত তাঁর সন্তানের চিন্তাশক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেন।
কারণ প্রতিটি গল্পের মাধ্যমে মা শুধু শিশুর ভাষাগত দক্ষতাই বাড়ান না; বরং তার কল্পনাশক্তি, মানসিক শৃঙ্খলা, চিন্তাশক্তি ও কথোপকথনের দক্ষতাও বিকশিত করেন।
এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ যে, বইপাঠী মায়ের প্রভাব শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যে পরিবারে বই পড়া দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ, সেখানে একটি বিশ্লেষণধর্মী ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ তৈরি হয়। এমন পরিবারের সন্তানদের মধ্যে প্রশ্ন করা, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
চিন্তাশীল ও অনুসন্ধিৎসু প্রজন্মের নির্মাতা
এর ফলে সন্তানরা শেখে—চিন্তা করা একটি মূল্যবান বিষয়। কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে রাগ, বিরোধ বা আক্রমণাত্মক আচরণের পরিবর্তে জ্ঞান, যুক্তি ও বিবেচনাবোধের আশ্রয় নেওয়া যায়।
এ কারণেই মাকে অনেক সময় ‘সমাজের নীরব শিক্ষক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারণ নিজের আচরণ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন, যারা চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে শেখে। আর এটিই একটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি।
এই প্রতিবেদনের শেষ কথাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘মা ও শিশুর বই’ এবং ‘ছোট ঘরোয়া পাঠাগার’-এর মতো সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা বই পড়ার জন্য একজন মায়ের নিজের আগ্রহ, উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তের চেয়ে কার্যকর আর কিছুই হতে পারে না।
যে ঘরে একজন মা বই পড়েন, সেই ঘরই শিশুর জন্য একটি সদা-জাগ্রত বিদ্যালয়ে পরিণত হয়—যেখানে সে আরও ভালোভাবে বুঝতে শেখে, আরও শান্তভাবে কথা বলে এবং আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখে।
আপনার কমেন্ট