হাওজা নিউজ এজেন্সি: সন্তান প্রতিপালন ও পারিবারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো তুলনা করার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা। প্রথম দৃষ্টিতে এ আচরণটি সহজ, এমনকি কখনো কখনো ভালো উদ্দেশ্যপ্রসূত বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করা তাদের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, মানসিক শান্তি এবং স্বাভাবিক বিকাশের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে ইরানি আলেম ও সন্তান প্রতিপালন ও পরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন পরিবার ও সন্তান প্রতিপালনে তুলনার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো হলো—

ভুল তুলনা: মানুষের স্বাভাবিক পার্থক্যকে উপেক্ষা করা
তুলনা করার ভিত্তিটিই অনেক সময় সঠিক নয়। কারণ মানুষে মানুষে স্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব সক্ষমতা, সামর্থ্য ও বৈশিষ্ট্য আছে—শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মানসিক এবং আবেগগত দিক থেকে।
কেউ হয়তো বলেন, ‘আমি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না।’ কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কীভাবে করতে হয়।’ এ ক্ষেত্রে তাকে ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি শেখানো সম্ভব এবং এতে তাকে সহযোগিতা করা যায়।
কিন্তু এমনও হতে পারে, একজন ব্যক্তি ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি জানেন, তবু সুন্দর কথা বলা বা বিশেষ কোনো আচরণের মাধ্যমে তা প্রকাশ করার সক্ষমতা তাঁর নেই। অর্থাৎ বিষয়টি সবসময় শুধু ‘না জানা’র কারণে হয় না; কখনো ব্যক্তির সামর্থ্য, মানসিক গঠন কিংবা ব্যক্তিত্বের ধরনই তাকে অন্যের মতো আচরণ করতে দেয় না।
তাই একজন স্বামীকে তাঁর স্ত্রীর বোনের স্বামীর সঙ্গে তুলনা করা মৌলিকভাবেই ভুল। ওই ব্যক্তি যে কাজটি করছেন, স্বামীকেও যে হুবহু একইভাবে করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। মানুষ একে অপরের অনুরূপ নয়; তাদের সক্ষমতাও এক নয়। যে কাজ একজনের কাছে সহজ ও স্বাভাবিক, সেটিই অন্যের কাছে কঠিন কিংবা তার সামর্থ্যের বাইরেও হতে পারে।
ফলে পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কে তুলনা শুধু সম্পর্কের উন্নতিতে সহায়ক নয়; বরং তা অভিমান, অপর্যাপ্ততার অনুভূতি এবং আবেগগত দূরত্ব তৈরি করতে পারে। সঠিক পদ্ধতি হলো প্রত্যেক ব্যক্তির সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে বোঝা এবং তার নিজস্ব সামর্থ্যের মধ্যে তাকে বিকশিত হতে সহায়তা করা।
‘তুলনাপ্রবণ মন’ নিজের জন্যও ক্ষতিকর
তুলনা শুধু যাকে তুলনা করা হচ্ছে তারই ক্ষতি করে না; যিনি সবসময় অন্যকে তুলনা করেন, তিনিও ধীরে ধীরে এর নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত হন।
মানুষের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগগত সক্ষমতা এক নয়। কারও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বেশি হতে পারে, আবার অন্য কেউ আবেগ বোঝা কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে বেশি দক্ষ হতে পারেন।
তাই আমাদের মন যেন সবসময় অন্যকে অন্যের সঙ্গে মেলানোর প্রবণতায় আক্রান্ত না হয়। কারণ তুলনাপ্রবণ মানুষ ধীরে ধীরে প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেন। এর ফলে অন্যদের মধ্যে যেমন ‘আমি যথেষ্ট নই’—এমন অনুভূতি তৈরি হয়, তেমনি তুলনাকারী নিজেও অসন্তুষ্টি, অতিরিক্ত বিচার-বিশ্লেষণ এবং অবাস্তব প্রত্যাশার শিকার হন।
আচরণগত পার্থক্যের পেছনে রয়েছে পারিবারিক পরিবেশ ও অতীত
তুলনা ভুল হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো মানুষের আবেগগত, মানসিক ও সামাজিক চাহিদার পার্থক্য।
উদাহরণস্বরূপ, আবেগপ্রবণ মানুষ সাধারণত অন্যের প্রতি বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন। কারণ তাঁর নিজেরও হয়তো ভালোবাসা পাওয়ার প্রয়োজন বেশি এবং তিনি ভালোবাসার প্রকাশকে সহজে উপলব্ধি ও অনুভব করেন। আবার কেউ হয়তো মনোযোগ ও মমতাপূর্ণ কথার মাধ্যমে ভালোবাসা অনুভব করেন; অন্য কেউ ভালোবাসাকে দায়িত্বশীলতা, সহযোগিতা কিংবা বাস্তব কাজের মাধ্যমে গ্রহণ ও প্রকাশ করেন।
অর্থাৎ মানুষের সক্ষমতা যেমন এক নয়, তাদের প্রয়োজনও এক নয়। তাই সবাই একইভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করবেন, একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন কিংবা একই পদ্ধতিতে দায়িত্ব পালন করবেন—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় একজন মানুষের শৈশব, পারিবারিক শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ। প্রত্যেক মানুষ ভিন্ন পরিবার ও ভিন্ন পরিবেশে বড় হন। কোনো পরিবারে বাবা-মায়ের সচেতনতা বেশি হতে পারে, সাংস্কৃতিক পরিবেশ উন্নত হতে পারে, ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ বেশি থাকতে পারে কিংবা সন্তানদের কথোপকথন ও জীবনদক্ষতা শেখানোর পদ্ধতি অন্য পরিবারের চেয়ে উন্নত হতে পারে।
ফলে কেউ যদি ভালো পারিবারিক পরিবেশ, সচেতন বাবা-মা কিংবা ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে যোগাযোগ ও পারিবারিক দক্ষতায় এগিয়ে থাকেন, অন্য একজন হয়তো এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে এসব শেখার সুযোগ কম ছিল।
এখন এই দুই ব্যক্তি যখন দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজনের কাছে অন্যজনের মতো আচরণ করার প্রত্যাশা করা ন্যায়সংগত নয়।
এখানেই তুলনা মৌলিকভাবে ভুল হয়ে যায়। কারণ তখন আমরা দুজন মানুষকে তাঁদের অতীত, পারিবারিক পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনা না করেই একই মানদণ্ডে বিচার করছি। এ ধরনের তুলনা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি তা গঠনমূলকও নয়।
তুলনার বিকল্প: গ্রহণযোগ্যতা ও বিকাশ
স্বামী-স্ত্রীকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে প্রত্যেকের নিজস্ব অবস্থান ও সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একজন মানুষ যখন তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাসহ গ্রহণযোগ্যতা অনুভব করেন, তখন তাঁর মধ্যে মূল্যবোধ ও নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়ে। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করার জন্যও বেশি প্রস্তুত হন।
একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের কাছে সাধারণত তারাই বেশি প্রিয়, যারা আমাদের আমাদের মতো করেই গ্রহণ করেন—আমাদের সক্ষমতা, দুর্বলতা, বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতাসহ। তাঁরা আমাদের বোঝার চেষ্টা করেন; বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন না।
অন্যদিকে কেউ যদি প্রতিবার বলেন—‘তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে শেখো’, ‘তোমার বাবার কাছ থেকে শেখো’, ‘তোমার মায়ের কাছ থেকে শেখো’ কিংবা ‘অমুকের মতো হও’, তাহলে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই আমাদের মধ্যে অপর্যাপ্ততা ও কষ্টের অনুভূতি তৈরি করেন।
এ ধরনের আচরণ উন্নতির পথ তৈরি করার পরিবর্তে অনেক সময় আবেগগত দূরত্ব, অভিমান ও সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে দেয়।
মানুষের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগগত সক্ষমতা, প্রয়োজন, পারিবারিক পরিবেশ এবং জীবন-অভিজ্ঞতা একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই একজন মানুষকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার ভিত্তিই অনেক ক্ষেত্রে ভুল।
দাম্পত্য জীবনে সঠিক পথ হলো তুলনা করা নয়; বরং সঙ্গীকে বোঝা, তাঁর সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করা এবং তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি ও সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁকে বিকশিত হতে সহযোগিতা করা।
কারও উন্নতি চাইলে তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন নেই। বরং তার নিজের গতকাল ও আজকের মধ্যে পার্থক্যটি দেখিয়ে তাকে আরও ভালো হওয়ার পথে উৎসাহিত করাই বেশি কার্যকর।
আপনার কমেন্ট