হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘মিডল ইস্ট আই’-এর লেখক ও বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান এক বিশ্লেষণে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের তুলনা করে লিখেছেন, ওয়াশিংটন আবারও একটি পুরোনো সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে: কোনো শত্রুকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকা মানেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করার সক্ষমতা থাকা নয়।
বিলিয়ন ডলারের মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ব্যর্থতা
আল-আরিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছিল। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের দৈনিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে।
অন্যদিকে, ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোও বিমা কোম্পানি ও জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝাতে পারেনি যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিরাপদ।
যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ব্যর্থ কৌশল
লেখক বলেন, গত সাত মাসে ওয়াশিংটন তিনটি পথ পরীক্ষা করেছে:
১. ব্যাপক বোমাবর্ষণ;
২. ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে সামুদ্রিক অবরোধ;
৩. এরপর পাল্টাপাল্টি হামলা আরও সরাসরি ও তীব্র করা।
কিন্তু এসবের কোনোটিই হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
ব্যয়ের অসমতা
বিশ্লেষণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ব্যয়ের তুলনা। আল-আরিয়ান লিখেছেন, প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের একটি ড্রোনকে ১০ কোটি ডলারের একটি স্টেলথ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতেই হবে-এমন নয়। যদি ওই ড্রোন প্রতিপক্ষকে ২০ লাখ ডলারের একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে বাধ্য করে, বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় অথবা সামুদ্রিক পরিবহনের বিমা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, তাহলেও সেটি তার উদ্দেশ্য পূরণ করেছে।
মার্কিন ধ্বংসক্ষমতা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি
লেখকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং আঞ্চলিক আকাশসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে, ওয়াশিংটন এখনো তেহরানকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেনি।
তাঁর ভাষায়, মূল প্রশ্ন এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কতটা রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে
আল-আরিয়ানের মতে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার তাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারবে না। ইরান তাদের প্রতিবেশী এবং চীন তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
এ কারণে তাঁর মতে, এসব দেশের কিছু অংশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পুরোপুরি মার্কিন নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে এগোচ্ছে। লেখক তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা চুক্তি’কে এই প্রবণতার একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হরমুজে ভিয়েতনাম যুদ্ধের শিক্ষা
আল-আরিয়ানের মতে, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল যে তারা ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেই যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের সক্ষমতা অর্জিত হয় না।
তাঁর মতে, হরমুজে বর্তমান পরিস্থিতি আবারও সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ফলাফল অর্জনের মধ্যকার এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে তুলেছে।
উপসংহার
আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির অর্থ ও কার্যকারিতা পরিবর্তিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্যাপক পরিসরে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু হরমুজের যুদ্ধ দেখিয়েছে-বিশাল মার্কিন নৌবহর একাই জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানি, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ওয়াশিংটনের পছন্দের ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে না।
লেখকের দৃষ্টিতে, এটাই সেই শিক্ষা, যা যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে পেয়েছিল, ১৯৯১ সালের পর ভুলে গিয়েছিল এবং হরমুজ আবারও তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
আপনার কমেন্ট