হাওজা নিউজ এজেন্সি: তিনি বলেন, এই দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অবস্থান, বক্তব্য, কর্মকাণ্ড ও অবদান সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য তাঁদের জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ এবং স্থায়ী সাহিত্যকর্ম রচনা করা প্রয়োজন।
কোমের আলাভি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেবাননের হিজবুল্লাহর শহীদ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর স্মরণে আয়োজিত ‘শামের ইতিহাসের অনন্য ব্যক্তিত্ব’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নাসরুল্লাহর সংগ্রামী জীবন এবং তাঁর চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আয়াতুল্লাহ তাবসি।
শহীদ নাসরুল্লাহর জীবন ও কর্ম নিয়ে স্থায়ী সাহিত্যকর্ম রচনার আহ্বান
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর মতো বিরল ব্যক্তিত্বকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে সবাইকে কলম ধরতে হবে। তাঁর বক্তব্য, অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক সংকলন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার উদ্যোগ কেবল মৃত্যুবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং তাঁদের জীবন ও অবদান নিয়ে স্থায়ী গ্রন্থ রচনা করতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের সম্পর্কে জানতে পারে।
নেতৃত্বের প্রতি গভীর অনুগত ছিলেন শহীদ নাসরুল্লাহ
কোমের হাওজায়ে ইলমিয়ার শিক্ষক সমিতির সদস্য আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। তিনি নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং সেই আদর্শ অনুসরণ করে চলতেন।
হাসান নাসরুল্লাহর একটি স্মৃতিচারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তেহরানে ইসলামি দেশগুলোর এক সম্মেলনে সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যের পর শহীদ নাসরুল্লাহ উপস্থিত জনতার ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে গিয়ে হাত চুম্বন করেন।
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, নাসরুল্লাহ জানিয়েছিলেন, আরব ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লোকজন তাঁর সঙ্গে করমর্দন ও ছবি তোলার জন্য সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতেন। কিন্তু তিনি সর্বোচ্চ নেতার হাত চুম্বন করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে বিশ্ব জানতে পারে, তাঁর শক্তি ও প্রভাবের উৎস কোথায়।
ইমাম খামেনেয়ীর আদর্শ থেকেই শক্তি পেতেন নাসরুল্লাহ
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তাঁর শক্তি ও প্রভাবের উৎস হিসেবে ইসলামি বিপ্লব এবং বেলায়েতে ফকিহের আদর্শের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে বিবেচনা করতেন। প্রতিরোধ আন্দোলনের এই নেতা ইমাম খামেনেয়ীর আদর্শ থেকেই শক্তি অর্জন করেছেন বলে মনে করতেন তিনি।
ইরানের পরিস্থিতি, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং হাওজায়ে ইলমিয়াগুলোর বিষয়েও নাসরুল্লাহর বিশেষ আগ্রহ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় নেতৃত্ব, ইরান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি সব সময় সচেতন ও সক্রিয় ছিলেন।
লেবাননের সমাজ ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনেছিলেন নাসরুল্লাহ
লেবাননের পরিবর্তনে শহীদ নাসরুল্লাহর ভূমিকা তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, তাঁর কর্মকাণ্ড কেবল সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনেও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হিজবুল্লাহ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় প্রচারক ও আলেম তৈরি, মর্সিয়া পাঠক ও ধর্মীয় শোকগাথা পরিবেশনকারী গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আয়াতুল্লাহ তাবসি আরও বলেন, লেবাননে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা এবং ধর্মীয় সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হয়েছিল। এ ধারাবাহিকতায় আল-মাহদি বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেবাননে শোকানুষ্ঠানের বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসান নাসরুল্লাহর সময়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠান ব্যাপকতা লাভ করে। মহররম মাসে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়াহ এলাকা যেন একটি বিশাল হুসাইনিয়ায় পরিণত হতো।
আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনেও ছিল হাসান নাসরুল্লাহর প্রভাব
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, শহীদ হাসান নাসরুল্লাহর প্রভাব কেবল লেবাননের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর ওপরও তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল।
ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর সঙ্গে নাসরুল্লাহর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সম্পর্ক বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্যে সংযোগ জোরদার করেছে এবং আহলে বাইতের (আ.) সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করেছে।
ইতিহাসজুড়েই প্রতিরোধের অগ্রভাগে ছিলেন আলেমরা
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, হাওজা ইলমিয়াগুলো সব সময় শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে শিয়া আলেমরা ধর্ম ও আহলে বাইতের (আ.) আদর্শ রক্ষায় ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
বিভিন্ন সময়ে বহু আলেমের শাহাদাত, নির্বাসন ও কারাবরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নানা চাপ ও নিপীড়নের মুখেও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। শহীদ আলেমদের জীবন ও অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে মরহুম আল্লামা আমিনির রচিত শুহাদাউল ফাদিলা গ্রন্থটির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় প্রতিরোধ আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকেছে। বিভিন্ন সময়ে আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রয়োজনে জীবনও উৎসর্গ করেছেন।
সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের শক্তিমত্তা শহীদ নেতার সুপরিকল্পনার ফল
সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তিমত্তা প্রসঙ্গে আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, শত্রুরা মনে করেছিল, ইরাক বা ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছিল, ইরানেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরান সম্পর্কে তাদের হিসাব-নিকাশ সঠিক প্রমাণিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে অংশ না নিলে ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যেত।
আয়াতুল্লাহ তাবসি বলেন, ইরানের এই শক্তিমত্তা শহীদ নেতার সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির ফল। শাহাদাতের আগে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন। শত্রুরা মনে করেছিল, তাঁকে শহীদ করার মাধ্যমে তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা সম্পূর্ণ অলীক প্রমাণিত হয়েছে।
শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর জীবন ও অবদান নিয়ে লেখার আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে আয়াতুল্লাহ তাবসি শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর ব্যক্তিত্ব ও জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শহীদ ইমামকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে সবাইকে কলম ধরতে হবে। শহীদ আয়াতুল্লাহ আল-উজমা ইমাম খামেনেয়ী ছিলেন সমসাময়িক যুগের এক বিরল ও অনন্য ব্যক্তিত্ব।
কোমের হাওজায়ে ইলমিয়ার শিক্ষক সমিতির এই সদস্য বলেন, তাঁর জীবন ও অবদান তুলে ধরার উদ্যোগ কেবল স্মরণানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা, কর্মকাণ্ড ও নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্থায়ী সাহিত্যকর্ম রচনা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর জীবন ও অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে।
আপনার কমেন্ট