হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হাওজা ইলমিয়ার শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজেম সিদ্দিকি রোববার ইমাম খোমেনি (রহ.) মাদ্রাসায় নৈতিক শিক্ষার এক অধিবেশনে পবিত্র কোরআনে সিরাতে মুস্তাকিমের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন।
কোরআনে সিরাতে মুস্তাকিমের ধারণা
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে ‘সিরাত’ শব্দটি একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে ‘সাবিল’ ও ‘তারিক’ শব্দগুলো একাধিক পথ বোঝাতে পারে। তবে যেসব পথ মানুষকে মহান আল্লাহর দিকে পরিচালিত করে, সেগুলো সবই আল্লাহর অভিমুখে যাত্রা এবং ঐশী লক্ষ্যে পৌঁছানোর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সিরাত ও সাবিলের ধারণাগত পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সূচনা থেকে গন্তব্যের দিকে যাত্রা করলে সে বিভিন্ন পথ অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে ‘সিরাত’ শব্দের ব্যবহারে একটি বিশেষ পথের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলাম, ঈমান, ইবাদত, ইখলাস ও বিনয়-এসবই মানুষকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করে। তবে এসব পথে চলা ব্যক্তিরা পূর্ণতা, আল্লাহর নৈকট্য এবং হেদায়েত লাভের ক্ষেত্রে একই স্তরে অবস্থান করেন না।
সিরাতে মুস্তাকিমের প্রথম বৈশিষ্ট্য: আল্লাহর নৈকট্য
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি সিরাতের প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন:
“আর যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৬)
তিনি বলেন, সিরাতে মুস্তাকিম এমন একটি পথ, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়। এ পথে চলা মানেই মহান আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: পথটি সরল ও অবিচল
তিনি সিরাতে মুস্তাকিমের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে এর সরলতাকে উল্লেখ করে বলেন, সিরাতে মুস্তাকিম এমন একটি পথ, যেখানে কোনো বিচ্যুতি, বক্রতা বা বেখাপ্পা বাঁক নেই। এটি এমন এক সুদৃঢ় পথ, যা পথিককে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। এ কারণেই পবিত্র কোরআন সিরাতে মুস্তাকিমের কথা বলেছে এবং মানুষকে এ পথে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: অন্য পথগুলোর ওপর পরিব্যাপ্তি ও তত্ত্বাবধান
হাওযা ইলমিয়ার এই শিক্ষক সিরাতের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, সিরাত কেবল অন্য পথগুলোর পাশাপাশি থাকা একটি পথ নয়; বরং অন্য পথগুলোকে এর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে বুঝতে হয়। সিরাতের অধিকারীরা পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বিশেষ অবস্থানে রয়েছেন এবং তাঁদের তত্ত্বাবধানাধীন বিষয়গুলোর ওপর তাঁদের পরিব্যাপ্তি রয়েছে।
সিরাতে মুস্তাকিমের সঙ্গে বেলায়াতের সম্পর্ক
সূরা মায়েদার ৫৫ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়াতের মর্যাদা তুলে ধরেন। আয়াতটিতে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই তোমাদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং সেই মুমিনরা, যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং রুকু অবস্থায় থাকে।” (সূরা আল-মায়েদা: ৫৫)
তিনি বলেন, সিরাতে মুস্তাকিমের ব্যাখ্যায় বেলায়াতের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। কারণ, আল্লাহ যাঁদের প্রতি নিয়ামত দান করেছেন, তাঁদের পথের সঙ্গে বেলায়াত ও ঐশী হেদায়েতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সূরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করে তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে চারটি গোষ্ঠীকে আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন নবী-রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিরা।
আয়াতটিতে বলা হয়েছে:
“আর যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে, তারা তাঁদের সঙ্গী হবে, যাঁদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন-নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ। আর তাঁরা কতই না উত্তম সঙ্গী!” (সূরা আন-নিসা: ৬৯)
তিনি বলেন, হেদায়েতের পথে এই চার শ্রেণির মানুষের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের সান্নিধ্যে থাকা মানুষকে ঐশী হেদায়েত ও নূর লাভের সুযোগ করে দেয়।
সূরা ফাতিহায় যখন আমরা বলি, “তাঁদের পথ, যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন”, তখন আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এমন ব্যক্তিদের পথে পরিচালিত করেন, যাঁরা তাঁর নিয়ামত লাভ করেছেন। অর্থাৎ, শুধু তাঁদের পথ চিনে নেওয়াই নয়; বরং সেই পথে চলা এবং তাঁদের নূর ও হেদায়েত থেকে উপকৃত হওয়াও আমাদের কাম্য।
নবী (সা.) ও আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর হেদায়েতি অবস্থান
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি বলেন, আল্লাহর নিরঙ্কুশ বেলায়াত তাঁর মনোনীত হেদায়েতের নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) মানুষের হেদায়েতের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। সত্যের পথ তাঁদের কাছে গিয়ে মিলিত হয় অথবা অন্য পথগুলো তাঁদের হেদায়েতের আলোকে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
তাঁর মতে, সিরাতে মুস্তাকিমের সঙ্গে আল্লাহর ওলিদের বেলায়াত ও হেদায়েতের মৌলিক সম্পর্ক রয়েছে।
তাশরিয়ি ও তাকভিনি হেদায়েতের পার্থক্য
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি তাশরিয়ি ও তাকভিনি হেদায়েতের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে বলেন, পথ দেখানো মহানবী (সা.) ও তাঁর ওসিদের মৌলিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহর মনোনীত একদল বান্দা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“আর আমরা তাঁদের এমন নেতা বানিয়েছিলাম, যাঁরা আমাদের নির্দেশ অনুসারে পথনির্দেশ করতেন।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৩)
তিনি বলেন, এই হেদায়েত আল্লাহর নির্দেশের অধীনে সম্পন্ন হয়। নবী ও ইমামগণ তাঁদের হেদায়েতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশের অনুসারী।
তিনি হেদায়েতকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করেন:
১- তাশরিয়ি হেদায়েত বা পথ প্রদর্শন: মানুষকে সত্যের পথ দেখিয়ে দেওয়া।
২- তাকভিনি হেদায়েত বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া: মানুষের জন্য সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপযুক্ত পরিস্থিতি ও সুযোগ সৃষ্টি করা।
যে ব্যক্তি তাশরিয়ি হেদায়েত গ্রহণ করে সত্যের পথে পা বাড়ায়, সে তাকভিনি হেদায়েত লাভের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে।
হেদায়েত গ্রহণের জন্য অন্তরের প্রস্তুতি
সূরা আনআমের ১২৫ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তার বক্ষ সংকীর্ণ ও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, সত্য গ্রহণ করা কেবল সত্যের কথা শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য মানুষের অন্তরের প্রস্তুতি এবং আল্লাহর তাওফিকও প্রয়োজন।
আল্লামা তাবাতাবায়ির তাফসির আল-মিজান-এর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকভিনি হেদায়েতের অর্থ হলো, আল্লাহ মানুষের অন্তরে সত্য গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেন এবং তার পথের বাধাগুলো দূর করে দেন। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি এই হেদায়েত থেকে বঞ্চিত থাকে, সত্যের মুখোমুখি হলে তার পক্ষে তা গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে।
অতএব, কাউকে পথ দেখানো এবং সেই পথে চলার উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আল্লাহ ও রাসুল (সা.) সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ও মহানবী (সা.)-এর পথকে সিরাতে মুস্তাকিম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা হুদের ৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক সরল পথের ওপর রয়েছেন।” (সূরা হুদ: ৫৬)
এ ছাড়া সূরা ইয়াসিনের শুরুতে মহানবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আপনি রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত, সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত।” (সূরা ইয়াসিন: ৩-৪)
তিনি বলেন, এসব আয়াত ঐশী পথ এবং রাসুলের পথের সুদৃঢ়তা ও সরলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। সিরাতে মুস্তাকিম আল্লাহর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও কর্তৃত্বের অধীন। এ কারণে পথটির প্রকৃতিতে কোনো বিচ্যুতি বা বক্রতা নেই। মানুষকে গন্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তার এই পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, উদাসীনতা ও বিচ্যুতি।
শয়তান ও আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা
সূরা হিজরের ৩৯ থেকে ৪১ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, শয়তান মানুষকে বিপথগামী করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা এর ব্যতিক্রম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“এটি আমার কাছে পৌঁছানোর সরল পথ।” (সূরা হিজর: ৪১)
তিনি বলেন, এ বক্তব্য আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের বিশেষ মর্যাদা এবং তাঁদের ওপর শয়তানের প্রভাব বিস্তারের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
মানুষ যতক্ষণ আল্লাহর বন্দেগি ও তাঁর নির্ধারিত পথে অবিচল থাকে, ততক্ষণ শয়তান অন্যদের মতো সহজে তাকে বশীভূত করতে পারে না। তবে উদাসীনতা এবং সত্যের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানুষকে পদস্খলনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং তাকে মূল পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সিরাতে মুস্তাকিম ও বিপথগামিতার মধ্যে পার্থক্য
সূরা ফাতিহার “তাঁদের পথ, যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন”-এই বাক্যটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সিরাতে মুস্তাকিম একটি সুনির্দিষ্ট পথ, যার সূচনা ও গন্তব্য স্পষ্ট। এই পথ মানুষকে আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিকে পরিচালিত করে।
অন্যদিকে, রয়েছে সেই পথ, যাঁরা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়েছেন অথবা হেদায়েত থেকে বিচ্যুত হয়েছেন।
“তাদের পথ নয়, যারা ক্রোধের শিকার হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে”-এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, মানুষ হয় সিরাতে মুস্তাকিমে অবস্থান করে আল্লাহর হেদায়েত লাভ করবে, নয়তো এ পথ থেকে দূরে সরে গিয়ে বিচ্যুতি ও পতনের দিকে অগ্রসর হবে।
তবে সব মানুষের অবস্থান এক নয়। সিরাতে মুস্তাকিমের অনুসারীদের মধ্যে যেমন ঈমান ও পূর্ণতার মাত্রাগত পার্থক্য রয়েছে, তেমনি হেদায়েত থেকে দূরে সরে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও বিচ্যুতি ও অন্ধকারের মাত্রা এক নয়।
তিনি আরও বলেন, ইসলাম, ঈমান, ইবাদত, ইখলাস ও বিনয়-এসব মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যায়। কিন্তু সবাই সমান মাত্রায় পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। ঈমান ও ইখলাসেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। অন্যদিকে, কুফর, নাস্তিকতা, অস্বীকার ও পাপাচার মানুষকে হেদায়েতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রেও বিচ্যুতির মাত্রা সবার জন্য এক নয়।
বৃষ্টির পানির উদাহরণে হেদায়েতের বিভিন্ন স্তর
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি সূরা হুদের আয়াত এবং আয়াতুল্লাহ আল-উজমা জাওয়াদি আমুলির তাফসিরে আলোচিত হেদায়েত লাভের বিভিন্ন স্তরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মানুষের গ্রহণক্ষমতা বোঝাতে বৃষ্টির পানির উদাহরণ দেন।
তিনি বলেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে প্রথমে ছোট ছোট জলধারায় প্রবাহিত হয়, পরে নদীতে মিলিত হয় এবং কখনো বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার রূপ নেয়। কিন্তু সব ভূমির ধারণক্ষমতা এক রকম নয়। প্রতিটি ভূমি তার নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী পানি গ্রহণ করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম সিদ্দিকি বলেন, সিরাতকে পানির সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা আল্লাহর নূর ও রহমত লাভের ক্ষেত্র তৈরি করে। তবে এই উৎস থেকে প্রত্যেক মানুষের উপকৃত হওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে তার ধারণক্ষমতা ও যোগ্যতার ওপর। কেউ বেশি উপকৃত হয়, আবার কেউ তুলনামূলকভাবে নিম্ন স্তরে থাকে।
যেমন পানি কখনো সমুদ্রের গভীরে পৌঁছে যায়, আবার কখনো কেবল তার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রবাহিত হয়; তেমনি আল্লাহর হেদায়েত ও নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বেলায়াত: আমল ও ইবাদতের প্রাণশক্তি
বেলায়াতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়েত অনুসারে, সিরাতে মুস্তাকিমের সঙ্গে নিরঙ্কুশ বেলায়াত এবং আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) ও আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদার সম্পর্ক রয়েছে। আর তাঁদের সবাই মহানবী (সা.)-এর হেদায়েতের আলোয় অবস্থান করেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, বেলায়াত ছাড়া হেদায়েত পূর্ণতা লাভ করে না। কারণ, মানুষের ইবাদত ও আমল বীজের মতো, যা বেড়ে ওঠার জন্য পানি ও প্রাণশক্তির প্রয়োজন হয়। বেলায়াত সেই আমলগুলোর বিকাশ ও পরিপূর্ণতার ক্ষেত্র তৈরি করে।
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের উল্লেখ করে তিনি বলেন:
“আর আমি পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)
তিনি ব্যাখ্যা করেন, পানি যেমন জীবনের উৎস, তেমনি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বেলায়াত মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে প্রাণসঞ্চারী ভূমিকা পালন করে। এটি আমলের বিকাশ এবং ঐশী হেদায়েত লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
এই দৃষ্টিতে ইসলাম ও ঈমানকেও বেলায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে বুঝতে হবে। যেমন, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত পূর্ণাঙ্গ মানবসত্তার সঙ্গে সংযোগ এবং ঐশী হেদায়েত গ্রহণের মাধ্যমে আরও গভীর তাৎপর্য ও প্রভাব লাভ করে।
উপসংহার
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজেম সিদ্দিকি বক্তব্যের শেষে সিরাতে মুস্তাকিমের পথে চলা এবং আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, দোয়া ও ইবাদতের সময় মানুষের প্রার্থনা কেবল সত্যের পথ চিনে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত, তিনি যেন আমাদের নবী-রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের পথে পরিচালিত করেন। এর মাধ্যমে আমরা যেন তাঁদের নূর ও হেদায়েত থেকে উপকৃত হতে পারি এবং মহান আল্লাহর নির্ধারিত গন্তব্যের আরও নিকটবর্তী হতে পারি।
আপনার কমেন্ট