শনিবার ১৭ অক্টোবর ২০২৬ - ১২:০৫
সৌদির পক্ষ নেওয়ার আগে ইরাক সরকারের উচিত ইয়েমেনে বোমা হামলার নিন্দা জানানো: নাজাফের জুমার ইমাম

হাওজা নিউজ এজেন্সি— ইয়েমেনে চলমান বোমা হামলার নিন্দা না জানিয়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে আনসারুল্লাহর হামলার প্রতিবাদ করায় ইরাক সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন নাজাফের জুমার নামাজের ইমাম সাইয়্যেদ সদরুদ্দিন কাবাঞ্চি। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আগে ইয়েমেনের ওপর হামলার নিন্দা জানানো উচিত বাগদাদের।

ইরাকের নাজাফে ফাতিমিয়া গ্র্যান্ড হুসাইনিয়ায় জুমার নামাজের খুতবায় কাবাঞ্চি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, আঞ্চলিক সংকট ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।

আর্থিক সংকটের মধ্যে নতুন মন্ত্রণালয় ও পদ সৃষ্টি
ইরাকের আর্থিক সংকটের মধ্যে তিনটি নতুন মন্ত্রণালয়—ডিজিটাল অর্থনীতি, পর্যটন ও রাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়—গঠন এবং মন্ত্রিসভার প্রধানের জন্য চারটি উপপ্রধানের পদ সৃষ্টির সমালোচনা করেন কাবাঞ্চি। তিনি বলেন, সরকারি অর্থের অপচয় না করার বিষয়ে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

ইয়েমেনে হামলার নিন্দা না জানানোয় ইরাক সরকারের সমালোচনা
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে আনসারুল্লাহর হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরাক সরকার। এ প্রসঙ্গে কাবাঞ্চি বলেন, মুসলমানদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই তিনি সমর্থন করেন না। তবে সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আগে ইয়েমেনিদের ওপর চলমান বোমা হামলার নিন্দা জানানো উচিত ইরাক সরকারের।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সৌদি আরবের উদ্যোগে ইয়েমেনে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলায় ইসরায়েল, পাকিস্তান ও তুরস্কের সংশ্লিষ্টতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ইয়েমেনে হামলার নিন্দা না জানিয়ে রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দরে আনসারুল্লাহর হামলার দ্রুত প্রতিবাদ জানানো ইরাক সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

শেইখ কাবাঞ্চি বলেন, “যে ব্যক্তি প্রথমে অন্যায় শুরু করে, সে-ই অধিক অন্যায়কারী।” তিনি মনে করেন, ইয়েমেনে হামলার বিষয়ে নীরব থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানানো ন্যায়সংগত অবস্থান নয়।

গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় হামলার নিন্দার আহ্বান
শেইখ কাবাঞ্চি গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ায় বোমা হামলারও নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি দখল করা সিরিয়া ও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ এ বিষয়ে আরব বিশ্বের নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

আজারবাইজানে হিজাব নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা
আজারবাইজানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকাদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেন শেইখ কাবাঞ্চি। তাঁর দাবি, দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম। এ সিদ্ধান্তের কারণে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ঘটনায় নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের কথা বলা ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কোথায়? এ বিষয়ে ইরাক সরকারের নিন্দা জানানো এবং আজারবাইজানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ইসলামী মূল্যবোধের ওপর আঘাত।

তাকওয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার পথ
খুতবায় শেইখ কাবাঞ্চি তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা অর্জনের অন্যতম উপায় হিসেবে তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আ'রাফের ৯৬ নম্বর আয়াত এবং সূরা আল-মায়িদার ৬৬ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করেন।

সূরা আল-আ'রাফের ৯৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর যদি জনপদগুলোর অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।”

শেইখ কাবাঞ্চি দাবি করেন, যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন ৫৫ হাজার চুরির ঘটনা ঘটে। চুরি হওয়া পণ্যের বার্ষিক মূল্য ২২০ কোটি পাউন্ড এবং চুরি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে ব্যয় হয় আরও ১৮০ কোটি পাউন্ড। অর্থাৎ, এ খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি পাউন্ড। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বে ১২০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।

তাঁর মতে, তাকওয়া অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বর্ণনায় আমল কবুলের শর্ত
খুতবায় শেইখ কাবাঞ্চি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একটি রেওয়াত বা বর্ণনা তুলে ধরেন। বর্ণনা অনুযায়ী, এক ব্যক্তি দুটি রুটি ও দুটি ডালিম চুরি করে তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রতিটি ভালো কাজের জন্য ১০টি করে সওয়াব পাওয়া গেলে মোট ৪০টি সওয়াব হবে। অন্যদিকে, চারটি চুরির জন্য চারটি গুনাহ বাদ দিলে তাঁর ৩৬টি সওয়াব অবশিষ্ট থাকবে।

কিন্তু ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর এ হিসাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করা হয়। আয়াতটিতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই কবুল করেন।”

তাকওয়া সংকট থেকে উত্তরণ ও রিজিকের পথ দেখায়
খুতবায় কাবাঞ্চি বলেন, তাকওয়া মানুষকে সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখায় এবং এমন উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করে, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতের কথা উল্লেখ করেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha