হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাতের গণসমাবেশের সমন্বয় পরিষদের প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে এক বৈঠকে আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি গত কয়েক মাসে দেশের অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও জনগণকে মাঠে সংগঠিত ও সক্রিয় রাখার কাজে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তিনি এই উদ্যোগকে এক বিরাট গৌরবের বিষয় বলে অভিহিত করেন।
নবী-রাসুল, আল্লাহর ওলি, মহান শহীদ এবং বিশেষ করে শহীদ ইমাম ও নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ইসলামী উম্মাহ, ইরানের জনগণ, ইসলামী বিপ্লব, প্রতিরোধ অক্ষ, জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী, নেতৃত্ব এবং এই বৃহৎ আন্দোলন ও গণসমাবেশের সঙ্গে যুক্ত সকলের জন্য আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ কামনা করেন।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ: ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু বছর বিশ্লেষণ চলবে
গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ সদস্য আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, গত সাত থেকে আট মাসে তিনি কোম ও অন্যান্য স্থানে বক্তৃতা এবং সমাবেশে বিভিন্ন বিষয় ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। গত দুই বছরে তাঁর বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর তিনি মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। শহীদ নেতার জানাজা ও দাফনের পর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও তাঁর ব্যাপক যোগাযোগ হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০০টিরও বেশি বিদেশি প্রতিনিধিদল উপস্থিত হয়েছিল। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ও যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এমনকি দেশের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে, যখন স্থায়ীভাবে অবস্থান করার মতো নির্দিষ্ট স্থানও ছিল না, তখনো এসব যোগাযোগ বন্ধ হয়নি।
উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই উদ্যোগের অগ্রভাগে এসেছেন এবং জনগণের উপস্থিতি বজায় রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন। সাম্প্রতিক যুদ্ধে যা ঘটেছে, তা এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যা সামরিক, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের গবেষক ও চিন্তাবিদদের বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে বিশ্লেষণ করতে হবে।
আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা: ইরান ও বিশ্বের ইতিহাসে এক স্থায়ী অভিজ্ঞতা
আয়াতুল্লাহ আরাফি ইরান ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের ইতিহাসে আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই অভিজ্ঞতা ইরানের রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে এই যুদ্ধ নিয়ে বিশ্লেষণ ও গবেষণা চলছে। রাজনৈতিক ইতিহাস ও সামাজিক পরিবর্তনের বিচারে এটি একটি স্বতন্ত্র ঘটনা।
আট বছরের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের শেষ পর্যায় এবং যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়ে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর বিবৃতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই বিবৃতি ও পরবর্তী বক্তব্যগুলোতে পবিত্র প্রতিরক্ষাকে পথনির্দেশক মশাল হিসেবে অমর করে রাখার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তিনি দেখেছেন, আট বছর ধরে সব ধরনের কষ্ট ও মূল্য দিতে হয়েও ইরানের জনগণ যেভাবে প্রতিরোধ করেছে, তা বিভিন্ন দেশের জনগণ ও চিন্তাবিদদের বিস্মিত করে।
আয়াতুল্লাহ আরাফির ভাষায়, পবিত্র প্রতিরক্ষা এখনো বিশ্বজুড়ে পরিবর্তন ও অনুপ্রেরণার উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে চাপ ও কঠিন পরিস্থিতির মুখে একটি জাতির দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং এর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্ম এবং রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণে থেকে যায়।
ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর আন্দোলন ও ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস বদলে দেওয়া চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
আয়াতুল্লাহ আরাফি গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর আন্দোলন ও ইসলামী বিপ্লবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেন।
প্রথম অধ্যায়: ১৫ খোরদাদ ১৩৪২ ফারসি সালের গণঅভ্যুত্থান
তিনি বলেন, প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৫ খোরদাদ ১৩৪২ ফারসি সালের গণঅভ্যুত্থান। সে সময় বিশ্বজুড়ে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব ছিল প্রবল। বহু বিশ্লেষণে বলা হচ্ছিল, ইসলামের যুগ শেষ হয়ে আসছে এবং মানুষের মন, চিন্তা ও জীবনযাত্রায় বস্তুবাদী সংস্কৃতি পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করবে।
এমন পরিস্থিতিতে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর আন্দোলন বিশ্বে প্রচলিত বস্তুবাদী চিন্তাধারার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ১৩৪২ ফারসি সালের আন্দোলনের শুরুর দিকে তাঁরা কিশোর ছিলেন এবং কোমে বসবাস করতেন। ১৫ খোরদাদের গণঅভ্যুত্থান সরাসরি প্রত্যক্ষ না করলেও তাঁরা এর পরবর্তী প্রভাব দেখেছিলেন। তখন বিশ্বের বহু প্রচলিত তত্ত্ব ও বিশ্লেষণে ধর্মের ভূমিকা শেষ হয়ে যাওয়া এবং পাশ্চাত্য ও বস্তুবাদী সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হতো।
তিনি আরও বলেন, ফয়জিয়া মাদরাসা ও মসজিদে আজমে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর বজ্রকণ্ঠ এবং ইরানের সাহসী নারী-পুরুষের প্রতিবাদ বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। যদিও সে সময় অনেকেই এই আন্দোলনের তাৎপর্য বুঝতে পারেননি, কেউ কেউ একে উপহাস করেছিলেন, আবার অনেকে মনে করেছিলেন, এর কোনো ফল হবে না।
বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যাপক বিরোধিতা এবং নিন্দার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি সাময়িক একটি আন্দোলন, যা দ্রুত স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। সেই প্রতিবাদ ও গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে এবং বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে।
আন্দোলনের কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেখান থেকে পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ১৬ বছর লেগেছিল। এই সময় কারাবরণ, নির্বাসন, দুঃখ-কষ্ট ও শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই চরম নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবন দিয়েছেন, কিন্তু ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর উত্তোলিত পতাকার পাশে অবিচল থেকেছেন।
জনগণের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রধান কৃতিত্ব ইরানের জনগণের। ইমাম যদি হাজারবারও আহ্বান জানাতেন, কিন্তু জনগণ সাড়া না দিত, তাহলে এই আন্দোলন কীভাবে সফল হতো? ইতিহাসে বহু মহান নেতা পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন, কিন্তু সামাজিক সমর্থনের অভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ১৩৪২ ফারসি সালেই নারী, পুরুষ ও তরুণদের একটি অংশ উপলব্ধি করেছিল যে তাদের মাঠে নামতে হবে এবং ইমামের পথ অনুসরণ করতে হবে। জনগণের এই অংশগ্রহণ আধুনিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং সভ্যতার একটি নতুন ও অভিনব আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ইসলামী বিপ্লবের বিজয়
আয়াতুল্লাহ আরাফি ২২ বাহমান ১৩৫৭ ফারসি সালের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়কে দ্বিতীয় ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে এই বিজয় ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি যে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর আন্দোলন এমন সাফল্য অর্জন করবে।
১৩৫৭ ফারসি সালের মিছিলগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সে সময় মিছিলে অংশ নেওয়া কিছু মানুষও মনে করতেন, ইমামের আন্দোলন সফল হবে না এবং শেষ পর্যন্ত তা গেরিলা তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ইমাম খোমেনি (রহ.) জনগণকে চিনতেন এবং তাদের বিপুল, গভীর ও অফুরন্ত শক্তির ওপর নির্ভর করতেন।
২০, ২১ ও ২২ বাহমানের ঘটনাবলি স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই দিনগুলোতে তিনি তেহরানে ছিলেন এবং কাছ থেকে মিছিল ও পরিবর্তনগুলো দেখেছেন। বিশেষ করে ২১ বাহমানের বিকেলে ইমাম খোমেনি (রহ.) জনগণকে রাস্তায় উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানোর পর এক বিস্ময়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট জনশূন্য রাখার জন্য নানা সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইমামের আহ্বানের পর তেহরানের রাস্তাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জনগণ উপস্থিত থাকবে না—এমন ধারণার ওপর দাঁড়ানো সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। এই জনঅংশগ্রহণ ছিল ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে আরেকটি বড় ও বিস্ময়কর অধ্যায়।
তৃতীয় অধ্যায়: চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সমাপ্তি
আয়াতুল্লাহ আরাফি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সমাপ্তি ও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণকে তৃতীয় ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এই পর্যায়ে তিক্ততা ও কঠিন পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু এর গভীরে নিহিত ছিল বড় বড় বিজয়, যা পবিত্র প্রতিরক্ষার অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
তাঁর মতে, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের কষ্টের দিকটি দিয়েই এই অধ্যায়ের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। আট বছরের প্রতিরক্ষা, জনগণের দৃঢ়তা এবং সেই সময়ের অর্জন ইসলামী বিপ্লবের ঐতিহাসিক সম্পদের অংশ। ইরান ও অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহে আজও এর প্রভাব দেখা যায়।
চতুর্থ অধ্যায়: সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ-বিপ্লবের ইতিহাসে এক ভিন্ন পর্যায়
ইরানের হাওজা ইলমিয়ার প্রধান ১২ দিনের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ৪০ দিনের যুদ্ধকে ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এই পর্যায়ের অবস্থান ও গুরুত্ব আন্দোলনের আগের অধ্যায়গুলোর চেয়ে আলাদা-আন্দোলনের ৬০ বছরেরও বেশি ইতিহাসের বিচারে যেমন, তেমনি ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর চার দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাসের বিচারে।
তিনি এই সংঘাতের দুই দিক হিসেবে শত্রুপক্ষের সংকল্প এবং ইরানের জনগণের প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই পর্যায়ের স্বাতন্ত্র্য একদিকে শত্রুর অতীত ও বর্তমান অভিপ্রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে ইরানের জনগণের প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে আগের অভিজ্ঞতাগুলোর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
অপারেশন ‘তুফান আল-আকসা’ এবং ইসমাইল হানিয়ার শাহাদাতের পরবর্তী ঘটনাবলি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, শুরুতে তিনি গড়ে উঠতে থাকা ঢেউটির ব্যাপকতা এতটা গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বৈঠকে, বিশেষ করে উপপ্রধানদের কাউন্সিলের বৈঠকগুলোতে, তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন যে একটি নতুন ঢেউ তৈরি হচ্ছে, যার বৈশিষ্ট্য আগের সব ঢেউ থেকে আলাদা।
তিনি বলেন, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর সংকল্প এবং অন্য কয়েকটি পক্ষের নীরবতা ও সহযোগিতা এমন একটি পথে এগোচ্ছিল, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরান ও ইসলামী বিপ্লব। এই পর্যায়কে আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সহজে তুলনা করা যায় না। শত্রুপক্ষ সীমিত ও সাময়িক লক্ষ্যেই সন্তুষ্ট থাকবে-এমন ধারণা করাও ঠিক নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ: বিশ্বশক্তিগুলোর প্রকাশ্য মতপার্থক্যের আড়ালে অভিন্ন লক্ষ্য
রাতের গণসমাবেশে জনগণের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, আপনারা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক আক্রমণের বিরুদ্ধে ইরানের জনগণের ব্যাপক, সর্বাত্মক ও সভ্যতাভিত্তিক প্রতিরোধের একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই কাজের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়, যখন সংঘাতের ব্যাপ্তি এবং এতে অংশ নেওয়া শক্তিগুলোর পরিসর বিবেচনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে কিছু রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং ইউরোপীয় দেশ ও অঞ্চলের কয়েকটি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের ভিন্ন অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব মতপার্থক্য অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে পরিকল্পিত মূলনীতির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামঞ্জস্য রয়েছে এবং তারা অনেক বিষয়ে একমত। বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বার্তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুরুতেই রাশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে বার্তা আসছিল। এসব বার্তার অনেকগুলোর ভাষায় সহানুভূতির সুর ছিল। কেউ কেউ পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর উপায় খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, তাঁদের ধারণা ছিল, ইরান এই ধরনের আক্রমণের মুখে এক মাসও প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে না।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, কয়েকটি দেশ বার্তার মাধ্যমে জানিয়েছিল, আমেরিকানরা অত্যন্ত নির্মম এবং পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি। এসব বার্তার কিছু আন্তরিক ছিল, আবার কিছু ছিল কেবল বাহ্যিক সৌজন্য। তবে সামগ্রিকভাবে, প্রথম কয়েক সপ্তাহে অনেক পক্ষই মনে করেনি যে ইরান এত বড় চাপের মুখে টিকে থাকতে পারবে। কেউ কেউ বলেছিল, তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হলে তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত। অন্যরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল।
তাঁর মতে, এসব মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক পক্ষের কাছে ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার প্রতিফলন। বাস্তবে যা ঘটেছে, তা অতীতের তুলনায় অনেক বড় একটি ঘটনা। এটি আগের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাগুলোর ধারাবাহিকতায় অবস্থান করলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা, কারণ এবার বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো সরাসরি সংঘাতে যুক্ত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলের যাতায়াতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কূটনীতির নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে এবং তাকে তার কাজ করতে হবে। তবে দেশগুলোর প্রকাশ্য তৎপরতা ও অবস্থানের পার্থক্যের পাশাপাশি নেপথ্যের লক্ষ্য ও হিসাব-নিকাশও বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক আলোচনা ও মতবিনিময় পরিস্থিতির প্রকাশ্য অংশমাত্র। তাঁর মতে, এর আড়ালে ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক বক্তব্যকে আঘাত করা এবং ইরানের জনগণের মর্যাদা ও শক্তিকে খর্ব করার একটি অভিন্ন লক্ষ্য কাজ করছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার হুমকি শেষ হয়ে গেছে-এমন ধারণা না করার আহ্বান জানিয়ে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ইসলামী বিপ্লবের নেতাও যেমন উল্লেখ করেছেন, বড় অর্জন সত্ত্বেও সবাইকে মাঠে থাকতে হবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, ইরানের জনগণ যা করেছে, তা এত বড় যে, দুর্ভাগ্যবশত এই পর্যায়েও যদি পরাজয় ঘটে, তাহলে ইতিহাস লিখবে-একটি জাতি দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বৃহত্তম চাপ ও বিশ্বশক্তিগুলোর মোকাবিলা করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আল্লাহর অনুগ্রহে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না এবং দেশের মর্যাদা ও মহত্ত্বের পথ অব্যাহত থাকবে।
বিদেশি প্রতিনিধিদলের চোখে ইরানের জনগণের উপস্থিতি: অনেকের কল্পনারও বাইরে
শহীদ নেতার জানাজা ও দাফনের অনুষ্ঠানে বিদেশি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সে সময় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই ইরানে যা দেখছিলেন, তা সহজে বিশ্লেষণ করতে পারছিলেন না।
তিনি বলেন, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম তেহরান ও কোমে এসে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁদের কাছে কল্পনা করাও কঠিন ছিল যে, এত বড় ঘটনার পরও মানুষের জীবন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে এবং জনগণ নিজেদের দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকতে পারে।
আয়াতুল্লাহ আরাফির মতে, এসব প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে ইরানের ঘটনাবলি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছে। ইরানে যে বাস্তবতা গড়ে উঠেছিল, তা কিছু বিদেশি পর্যবেক্ষকের কাছে বর্ণনা করা কিংবা বিশ্লেষণ করা কঠিন ছিল। তাঁরা এক ধরনের পরিস্থিতি প্রত্যাশা করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তাঁদের আগের হিসাব ও ধারণার সঙ্গে মেলে না-এমন একটি চিত্র দেখতে পান।
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শতাধিক দেশের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সম্মেলনটি আয়োজন করা হয় এবং এর পৃষ্ঠপোষকতায় সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও যুক্ত ছিল। কিন্তু সম্মেলনের আলোচনায় ইরানই ছিল বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্র।
তিনি আরও বলেন, সম্মেলনের ব্যয় অন্য একটি পক্ষ বহন করলেও বিভিন্ন অধিবেশনে বারবার ইরানের নাম ও ইরানি প্রতিনিধিদলের অবস্থান উঠে এসেছিল। বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার জন্য সাক্ষাতের অনুরোধ করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বের চিন্তাগত ও রাজনৈতিক সমীকরণে ইরানের অবস্থান কেবল আর্থিক সামর্থ্য কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজক হওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সম্মেলনে উপস্থিত এমন কিছু ব্যক্তিও ইরান ও শিয়া মতবাদের অবস্থানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, যাঁরা নিজ নিজ দেশের সরকারি নীতির কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন। এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্জিত হয়েছে। এই সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে নতুন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশ নিজেদের পরিচিতি ও গুরুত্ব বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অথচ আজ ইরান বিশ্বব্যাপী মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা উপলব্ধি করা, সংরক্ষণ করা এবং যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতায় রূপান্তর করা প্রয়োজন।
রাতের গণসমাবেশ: ইরান ও ইসলামী বিপ্লবের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক ধারাবাহিকতার অংশ
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, রাতের গণসমাবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন বা সীমিত উদ্যোগ নয়। বরং এটি এমন একটি বৃহত্তর ধারাবাহিকতার অংশ, যা বিশ্বে ইসলাম, ইরান, ইসলামী বিপ্লব এবং ইরানের জনগণের মর্যাদা ও মহত্ত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতি রাতেই এই ধারাবাহিকতার গুরুত্ব বিবেচনায় রাখতে হবে এবং কোনো কিছুকেই এর ক্ষতি করতে দেওয়া যাবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে নতুন যে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো-এই ধরনের সমাবেশ ও রাস্তায় জনগণের উপস্থিতির মধ্যেই সামাজিক ও জাতীয় শক্তির গভীর ভিত্তি নিহিত রয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শক্তির মূল উৎস-জনগণ-যদি মাঠে না নামত এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করত, তাহলে অন্য সক্ষমতাগুলোও একইভাবে ও একই কার্যকারিতায় কাজ করতে পারত না।
ইসলামী বিপ্লবের নেতার শাহাদাত এবং দেশের গোয়েন্দা, নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর ওপর আঘাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হারাতে হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশ তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়নি।
তিনি বলেন, সে সময় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিভাগ গুরুতর সমস্যার মুখে পড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বৈঠক ও কার্যপ্রণালি অব্যাহত রাখাও সম্ভব ছিল না। কিন্তু দেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে। এটি দেখায় যে, একটি দেশের শক্তি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণের ঈমান, সচেতনতা, সংকল্প ও সক্রিয় উপস্থিতির মধ্যেও এর গভীর ভিত্তি রয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব উপাদানকে একটি সমন্বিত জাতীয় শক্তিতে পরিণত করে জনগণের উপস্থিতি এবং ঐতিহাসিক সংকটের মুহূর্তে তাঁদের দায়িত্ববোধ।
যুদ্ধের দিনগুলোতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা: কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি জরুরি
চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রথম দিকের পরিস্থিতি স্মরণ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, যুদ্ধের শুরুতেই তিনি পরিকল্পনাকারীদের সতর্ক করেছিলেন, এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে যেন দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরের যোগাযোগ ও সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলেও এবং কেউ খোঁজখবর না নিলেও তাঁরা নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধের বিশেষ পরিস্থিতি থেকেই এই প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যখন স্বাভাবিক ব্যবস্থা ও প্রচলিত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করা সম্ভব হবে না। এই সময় ইরানকে সহায়তা করেছে দেশটির আধ্যাত্মিক শক্তি, আদর্শিক ভিত্তি, সচেতনতা, দূরদর্শিতা এবং তরুণ ও সমাজের বিচক্ষণতা।
বিপ্লবী ও উদ্দীপ্ত কর্মীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে বিপ্লবের প্রতি অনুগত, আদর্শনিষ্ঠ ও উদ্দীপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে। তবে তাঁদের পাশাপাশি সমাজের আরও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষও মাঠে এসেছেন এবং সক্রিয় হয়েছেন। এই বৃহত্তর সামাজিক শক্তিকে ধরে রাখতে হবে এবং বিচক্ষণ পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
যুদ্ধের দিনগুলোতে তেহরানের কয়েকটি পুলিশ স্টেশন ও নিরাপত্তা স্থাপনার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, গোয়েন্দা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ওপর আঘাত আসা সত্ত্বেও জনগণ মাঠে উপস্থিত ছিল।
তেহরানে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো রাতে তিনি শহরে ঘুরেছেন এবং কাছ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। কঠিন অবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও শহর ছিল প্রাণবন্ত এবং মানুষ সক্রিয় ছিল। এই জাতির সংকল্প, ঈমান, দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ ছিল এক বিস্ময়কর বাস্তবতা।
তিনি বলেন, এই উপস্থিতি দেখিয়েছে যে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও ইরানের সমাজ সামাজিক জীবন বজায় রাখতে এবং নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম। জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং জনগণ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে এই সক্ষমতা অব্যাহত রাখতে হবে।
যুদ্ধ শেষ হয়নি; জনগণকে মাঠ ছেড়ে দেওয়া চলবে না
আয়াতুল্লাহ আরাফি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ যদি মনে করেন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এবং এখন আর জনগণের উপস্থিতির প্রয়োজন নেই, তাহলে তিনি ভুল করছেন। দেশের মর্যাদা ও মহত্ত্ব অব্যাহত রাখা জনগণের এই উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বকে বুঝতে হবে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও ইরানের জনগণ মাঠ ছেড়ে যাবে না।
তিনি বলেন, এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে হবে যে, শত্রুপক্ষ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিলেও এবং পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠলেও-যার জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে-ইরানের রাস্তাগুলো প্রাণবন্ত থাকবে, জনগণের উপস্থিতিতে মুখর থাকবে। পতাকা উড়তে থাকবে, স্লোগান চলতে থাকবে, মানুষের চিন্তা ও সচেতনতা সক্রিয় থাকবে এবং সব বিশ্লেষণ ইরান ও ইসলামী বিপ্লবের মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে।
জনগণের সমাবেশকে এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি ও স্পন্দিত হৃদয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এই জনঅংশগ্রহণের সেবক। আপনারা যে কাজ করছেন, তার গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমরা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারক সন্ধিক্ষণে রয়েছি। এই পর্যায়ে অবহেলা করা হলে আগামী এক বা দুই শতাব্দী আমাদের ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে কাটাতে হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা এমন একটি পক্ষকে সহযোগিতা করছেন, যারা ইতিহাসের এক বৃহৎ সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই উপস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে হলে ইতিহাসের পরিবর্তন এবং এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের মঞ্চে জাতির অনুপস্থিতি: যার মূল্য দিতে হতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে
শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী (রহ.)-এর একটি বক্তব্য স্মরণ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তনের সময় কোনো জাতি অনুপস্থিত থাকলে তার কী পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী দিয়েছিলেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সোমবার অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে কয়েকজন ব্যক্তি শহীদ নেতাকে কিছু কথা বলার অনুরোধ করেছিলেন। তখন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে বিশ্বের বিভাজনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে আরাফি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মিত্রশক্তি ও বিজয়ী দেশগুলো একত্র হয়েছিল। তারা বিশ্বের মানচিত্র টেবিলে রেখে বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজেদের মধ্যে কেক ভাগ করার মতো ভাগ করে নিয়েছিল। এর কারণ ছিল, সেই সময় ইসলামী বিশ্ব, পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নীরব ও কার্যকরভাবে অনুপস্থিত ছিল। ফলে তারা অনেক কিছু হারিয়েছিল এবং কার্যত বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ থেকে ছিটকে পড়েছিল।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এই ঘটনার শিক্ষা হলো-কোনো জাতি বা সমাজ যদি ইতিহাসের ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্তে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার মূল্য একশ বা দুইশ বছর পর্যন্ত দিতে হতে পারে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপস্থিত থাকা কেবল সাময়িক কোনো পদক্ষেপ নয়; এটি জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণেও প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিজের ঐতিহাসিক অধ্যয়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাত জেগে থাকার ফলে পাওয়া সময়ে তিনি ইরান, উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং অতীতের অন্যান্য সংঘাত নিয়ে একশটিরও বেশি ঐতিহাসিক বই পড়েছেন। এসব অধ্যয়ন আবারও দেখিয়েছে, অতীতের কিছু পরাজয় ও ঐতিহাসিক চুক্তি কীভাবে একটি দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
ইরানের অতীতের যুদ্ধ এবং তুর্কমানচাই চুক্তির মতো চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কিছু যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই সামরিক বাহিনী ছিল। কিন্তু কখনো কখনো কামানের মতো নতুন অস্ত্রের ব্যবহার কিংবা সেনাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার ফলে মনোবল ভেঙে যেত এবং তারা পিছু হটত। বিষয়টি শুধু অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের ছিল না; অনেক সময় ভয় ও প্রতিরোধের সংকল্প হারিয়ে ফেলার কারণে বড় ধরনের পরাজয় ঘটেছিল।
এর পরিণতিতে কিছু ঐতিহাসিক পর্যায়ে ইরানের ভূখণ্ডের অংশবিশেষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং দেশটির ওপর কঠোর চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এসব চুক্তির প্রভাব আজও অঞ্চলের ইতিহাস ও ভূগোলে রয়ে গেছে।
অতীতে ইরান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঞ্চলগুলোর কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, রাশিয়া সফরের সময় তিনি এসব অঞ্চলের কয়েকটি সরাসরি দেখেছেন। সেখানে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের বিভিন্ন চিহ্ন রয়েছে। কিছু অঞ্চলে মসজিদ, ধর্মীয় কেন্দ্র এবং ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের ঐতিহ্যও দেখা যায়।
বাহরাইন ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও চুক্তির পরিণতি বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, অতীতের কিছু ক্ষেত্রে এমনভাবে ভূখণ্ড হস্তান্তর করা হয়েছিল, যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা নিয়ে আপত্তি জানানো বা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্তে উপস্থিত থাকা ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষার মূল্য এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের ও যোদ্ধার শাহাদাতের প্রসঙ্গ তুলে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ওই যুদ্ধে ইরানের জনগণ বিরাট মূল্য দিয়েছে, কিন্তু দেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও বিচ্ছিন্ন হতে দেয়নি। অতীতের কিছু ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
তিনি বলেন, আজও প্রতিপক্ষ জানে, ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করা কিংবা দেশের কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলে এমন একটি জাতির প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, যার সামনে আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বিশ্বকে ইরানের জনগণের দৃঢ়তা ও অবিচলতার বার্তা দিয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, শত্রুপক্ষ ইরানে প্রবেশের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করেছিল এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেনা অবতরণের পরিকল্পনাও করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রবেশ করার সাহস করেনি।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে রাতের গণসমাবেশে আপনাদের কাজের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনারা দুই শতাধিক রাত ধরে মাঠে উপস্থিত রয়েছেন। এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্যও পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মহান আল্লাহ এই পথে সহায়তা করবেন।
রাতের গণসমাবেশ জোরদারে আটটি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপন্থা
বক্তৃতার অন্য একটি অংশে আয়াতুল্লাহ আরাফি রাতের গণসমাবেশের সংগঠন ও সহায়তা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ লক্ষ্যে তিনি আটটি বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব তুলে ধরেন।
১. সমাবেশে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি
তিনি প্রথম কর্মপন্থা হিসেবে রাতের সমাবেশে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতির সময়সূচি নির্ধারণের কথা বলেন।
তাঁর মতে, জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে প্রতি রাতে কয়েকজন কর্মকর্তা জনগণের মধ্যে উপস্থিত থাকেন এবং সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগাযোগ আরও জোরদার হয়।
২. পর্যায়ক্রমে জনসেবা ডেস্ক চালু করা
দ্বিতীয় কর্মপন্থা হিসেবে তিনি জনসেবা ডেস্কগুলো সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে রাতের সমাবেশগুলোতে জনসেবা ডেস্ক চালু রাখতে হবে। এর মাধ্যমে জনগণ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা গ্রহণ করতে এবং নিজেদের প্রশ্নের উত্তর পেতে পারবেন।
৩. আলেম ও সমন্বয়কারী সংস্থাগুলোর উপস্থিতি জোরদার করা
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এই সমাবেশ পরিচালনায় আলেম এবং সমন্বয় পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আলেম ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আরও নিয়মিত ও কার্যকরভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব রাতে তিনি সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, সেসব সময় কয়েকজন কর্মীর কার্যক্রম দেখেছেন এবং তাঁদের প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তবে এই উপস্থিতি আরও জোরদার করতে হবে এবং কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করতে হবে।
৪. সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা
চতুর্থ কর্মপন্থা হিসেবে তিনি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সরকারি দপ্তরের কর্মীদের সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে হবে। এর অর্থ জোর করে অংশগ্রহণ করানো নয়; বরং বিচক্ষণ পরিকল্পনা, উৎসাহ ও প্রেরণার মাধ্যমে তাঁদের অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থারও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও তিনি মনে করেন, আরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সক্ষমতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
৫. মসজিদ, জামাতের ইমাম ও বাসিজ ঘাঁটির সঙ্গে সমাবেশের সম্পর্ক জোরদার করা
আয়াতুল্লাহ আরাফি পঞ্চম কর্মপন্থা হিসেবে রাতের সমাবেশের সঙ্গে মসজিদগুলোর সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার কথা বলেন।
তিনি বলেন, মসজিদ, জামাতের ইমাম এবং বাসিজের ঘাঁটিগুলো এই উদ্যোগের প্রধান স্তম্ভ। রাতের গণসমাবেশের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের আরও সুসংগঠিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মীদের পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন কর্মসূচি তৈরি করতে হবে, যাতে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষ, মসজিদ ও রাতের সমাবেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হয়।
৬. শিক্ষার্থীদের সুসংগঠিত অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে শিক্ষামূলক ধারায় রূপান্তর
হাওজা ইলমিয়ার প্রধান শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দলবদ্ধ ও সুসংগঠিতভাবে রাতের গণসমাবেশে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আগেও বিভিন্ন বৈঠকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে একটি শিক্ষামূলক ধারায় রূপান্তর করা উচিত। এই শিক্ষাধারাকে বিদ্যালয় ও মসজিদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে তা তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারে।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক বা রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক ও সামাজিক দিক রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ, ঈমান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ জোরদার করতে এই অভিজ্ঞতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
৭. সমাবেশের আর্থিক, সরঞ্জামগত ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সহায়তা বাড়ানো
সপ্তম কর্মপন্থা হিসেবে তিনি রাতের সমাবেশের আর্থিক ও সরঞ্জামগত সহায়তা এবং পরিচালনাগত সমন্বয় জোরদার করার কথা বলেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, তাঁর কার্যালয়ও সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সহায়তা দিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি পৌরসভা, নগর পরিষদ, জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজন অনুসারে সহায়তা ও সমন্বয় করতে হবে।
এর ফলে কার্যক্রম পরিচালনার ঘাটতি দূর হবে এবং আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
৮. সমন্বয় পরিষদকে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে সমাবেশের প্রধান পরিচালনাকেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় করা
আয়াতুল্লাহ আরাফি নিয়মিতভাবে সমন্বয় পরিষদের বৈঠক আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, এই পরিষদ রাতের গণসমাবেশের ব্যবস্থাপনার প্রধান কেন্দ্র। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত সপ্তাহে একবার এর বৈঠক হওয়া উচিত, যাতে উত্থাপিত সমস্যা ও প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আলেম ও অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি জনগণের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে, সমন্বয় বাড়াতে এবং পারস্পরিক আস্থা শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
এই বৈঠকগুলো নিয়মিত আয়োজন করতে হবে এবং সমাবেশে উত্থাপিত বিষয়গুলোও একই কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনা করতে হবে।
মতের বৈচিত্র্য ও জনগণের দাবি-দাওয়ার প্রতি সম্মান রেখে বিপ্লবী উদ্দীপনা বজায় রাখা
আয়াতুল্লাহ আরাফি বিভিন্ন মতামতের প্রতি সম্মান দেখানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও দাবি-দাওয়া ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে সমালোচনা ও দাবি যদি দায়িত্ববোধ এবং বিপ্লবী উদ্দীপনা থেকে আসে, তাহলে তা সম্মানের সঙ্গে শোনা উচিত।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিক উদ্বেগ থেকে করা সমালোচনা এবং দাবি-দাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নেতৃত্ব যেমন জোর দিয়েছেন, তেমনি জনগণের বৃহৎ সমাবেশ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ভিন্নমতাবলম্বীরাও সমাবেশে উপস্থিত হতে পারেন এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। কোনো ব্যক্তি কোনো বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও তাঁর যেন মনে হয়, নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যদের কাছে তা পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, মতের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে গিয়ে বিপ্লবী উদ্দীপনা কমিয়ে দেওয়া যাবে না। এর সমাধান হলো ভারসাম্য তৈরি করা এবং আলোচনার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। সমন্বয় পরিষদের নিয়মিত বৈঠক হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে মতামত ও মতপার্থক্য পর্যালোচনার জন্য পৃথক বৈঠকেরও আয়োজন করা যেতে পারে।
আয়াতুল্লাহ আরাফি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কিংবা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি বৈঠকে একত্র করা যেতে পারে, যাতে তাঁরা পরস্পরের কথা শুনতে পারেন এবং আলোচনা করতে পারেন।
তাঁর মতে, এই পদ্ধতি মতপার্থক্য সমাধান এবং সামাজিক সংহতি জোরদারের একটি আদর্শে পরিণত হতে পারে। মতপার্থক্যকে অনানুষ্ঠানিক পরিসরে রেখে দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ও সম্মানজনক আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ সদস্য আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, এই পদ্ধতি একদিকে গণসমাবেশের মর্যাদা ও ব্যাপকতা রক্ষা করবে, অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াবে এবং জনগণের বিপ্লবী উদ্দীপনা ও দায়িত্ববোধকে দুর্বল হতে দেবে না।
দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও কর্মীদের প্রশংসা: জনসেবা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা
বক্তৃতার অন্য একটি অংশে আয়াতুল্লাহ আরাফি গত কয়েক মাসে রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণসমাবেশে সহায়তার জন্য প্রচেষ্টা চালানো জেলা প্রশাসক, অন্যান্য কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, এমন একটি সময়ে যখন জনগণের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানো এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখনও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মাঠে ছিলেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জটিলতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় বহু কার্যক্রম গুরুতর সমস্যার মুখে পড়েছিল। দেশ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা প্রয়োজন ছিল। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্মস্থলে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়া ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
সংকটের সময় কর্মকর্তারা দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে পারেন-এমন কিছু বিদেশি মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন যে কর্মকর্তারা সংকটের সময় মাঠ ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই থেকে গেছেন, পরিশ্রম করেছেন এবং কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করার অর্থ সমালোচনা উপেক্ষা করা নয়। আলোচনা ও সমঝোতা-সংক্রান্ত বিবৃতিতেও তিনি প্রয়োজনীয় মতামত ও বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। একইভাবে সমালোচনা ও দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সেবামূলক কাজ ও প্রচেষ্টাকেও স্বীকৃতি দেওয়া যায়।
তাঁর মতে, ন্যায্য সমালোচনা এবং জনসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজের প্রশংসা-দুটিই পাশাপাশি থাকা উচিত।
বক্তৃতার শেষে আয়াতুল্লাহ আরাফি রাতের গণসমাবেশের কর্মী এবং এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে প্রচেষ্টা চালানো সকলকে আবারও ধন্যবাদ জানান। তাঁদের সাফল্যের জন্য দোয়া করে তিনি জনগণের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা, জাতীয় সংহতি জোরদার করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা এবং এই ঐতিহাসিক পর্যায়ে গড়ে ওঠা সামাজিক সক্ষমতাকে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আপনার কমেন্ট