রবিবার ১৭ আগস্ট ২০২৫ - ১২:৩৮
বার্ধক্যের দিনগুলো: গ্লানি নাকি আধ্যাত্মিক আনন্দ?

জীবনের এক অবধারিত অধ্যায় হলো বার্ধক্য। প্রত্যেক মানুষকেই একদিন এই অধ্যায়ে প্রবেশ করতে হয়। এ সময়টা কারো জন্য অসহায়ত্বের, গ্লানির; আবার কারো ইবাদত ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তা হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে শান্তিময় সময়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: অধিকাংশ মানুষই বার্ধক্যকে দুঃখ ও একাকীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখে থাকেন। শারীরিক দুর্বলতা, প্রিয়জনদের দূরে সরে যাওয়া, কর্মক্ষমতার ঘাটতি এবং যৌবনের প্রাণবন্ত আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া—এসবই বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে অনেকের চোখে বৃদ্ধ বয়স মানেই গ্লানি, বেদনা ও নিঃসঙ্গতার সময়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা এবং আহলে বাইত (আ.)–এর জীবনদর্শন আমাদের শিখায় যে, বার্ধক্য কেবল দুর্বলতা বা দুঃখের সময় নয়; বরং এটি হতে পারে আত্মিক আনন্দ, প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্যের সোনালী সময়।

বার্ধক্য: গ্লানির অধ্যায়?
মানুষের সাধারণ ধারণা হলো—বার্ধক্যে দেহ দুর্বল হয়ে যায়, ইচ্ছাশক্তি ক্ষীণ হয়, সন্তানরা আলাদা হয়ে যায় এবং মানুষ ধীরে ধীরে পৃথিবীর আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বার্ধক্য সত্যিই কষ্টের সময় বলে মনে হতে পারে।

কুরআনে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, “আল্লাহ তোমাদেরকে শৈশব থেকে শক্তি, আর শক্তি থেকে পুনরায় দুর্বলতা ও বার্ধক্যে ফিরিয়ে দেন।” [সুরা রুম: ৫৪]

অতএব বার্ধক্য জীবনের স্বাভাবিক ধাপ, যার জন্য মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।

নাকি আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি?
অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে বার্ধক্য হলো শান্তি, প্রজ্ঞা ও আল্লাহর সান্নিধ্যের সময়। যেমন শহীদ আলেম আল্লামা মুর্তজা মুতাহহারি (রহ.) তাঁর পিতার প্রসঙ্গে লিখেছেন,  “আমার পিতা কখনও রাতের ঘুম দেরি করতেন না। রাতের খাবার খেয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতেন এবং ভোরের আগে জেগে উঠতেন। প্রতিদিন তিনি এক পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন, নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন এবং কখনও কোনো রাত বাদ দিতেন না। তিনি সর্বদা পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও সকলের জন্য দোয়া করতেন। আজ প্রায় একশ বছরের জীবনে তাঁকে কখনও অস্থির, বিমর্ষ বা দুঃখী হতে দেখিনি। তাঁর প্রশান্তির রহস্য ছিল আল্লাহর সঙ্গে সেই আত্মিক বন্ধন।”

এই আধ্যাত্মিক চর্চাই তাঁর জীবনে এনে দিয়েছিল অবিরাম শান্তি ও আনন্দ।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে বলেছেন, “যে ব্যক্তি বার্ধক্যে পৌঁছে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ফরজ করে দেন।” [কানযুল উম্মাল]

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বার্ধক্য হলো “দৌরানে কামাল”—অর্থাৎ পরিপূর্ণতার সময়। কারণ এ সময়ে মানুষ দুনিয়ার আসক্তি থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতে পারে।

মাওলানা রুমি (রহ.) তাঁর কবিতায় এইভাবে ব্যক্ত করেছেন,
আমি ও আমার পিতা, হৃদয় ভরে শান্তিতে,
এই দুনিয়া আমাদের কাছে যেন স্বর্গসদৃশ।
হে দুশ্চিন্তা! আমি তোমাকে দূরে পাঠাই,
আমার মন আনন্দে পূর্ণ, দুঃখের আর কোনো স্থান নেই।

যদি বার্ধক্যকে শুধু দেহের দুর্বলতা ও নিঃসঙ্গতার দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে গ্লানির সময়। কিন্তু যদি এটিকে ইবাদত, কুরআন, দোয়া, সেবামূলক কাজ এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে বার্ধক্য হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

আসুন, আমরা আজ থেকেই প্রস্তুতি নেই—যৌবনে শক্তিকে ব্যবহার করি সৎকর্মে, যাতে বার্ধক্যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে প্রশান্তি, আধ্যাত্মিক আনন্দ ও আল্লাহর নৈকট্য।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha