হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আরবাইন শুধুমাত্র একটি পদযাত্রা বা ধর্মীয় সমাবেশ নয়; এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক আধ্যাত্মিক অভিযান। এটি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক জীবন্ত নিদর্শন, যা প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষকে ইরাকের পবিত্র নগরী কারবালার দিকে আকর্ষিত করে। এই মহান সমাবেশ শিয়া মুসলিমদের জন্য একটি ফরজ ইবাদতের মতো হলেও, এর তাৎপর্য এবং শিক্ষা সার্বজনীন। এটি একদিকে যেমন শোক ও বেদনার প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনই আত্মশুদ্ধি, ঐক্য ও আধ্যাত্মিক উপার্জনের এক অনন্য সুযোগ।
আরবাইনের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপট:
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদতের চল্লিশতম দিনকে 'আরবাইন' বলা হয়। কারবালার ঘটনার পর, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পরিবারের সদস্যরা যখন বন্দী অবস্থায় দামেস্ক থেকে কারবালায় ফিরে আসেন, তখনই প্রথম আরবাইন পালিত হয়। এই দিনটি শুধু শোকেরই নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার, জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন বার্তা বহন করে। তাই, এই দিনে তার মাজার জিয়ারত করা এবং এই বার্তাকে স্মরণ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আধ্যাত্মিক উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে আরবাইন:
আরবাইন জিয়ারতকে কেবল একটি শারীরিক যাত্রা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। এটি মূলত আত্মার যাত্রা, যেখান থেকে একজন মানুষ অপরিমেয় আধ্যাত্মিক সম্পদ অর্জন করতে পারে।
১. আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমালোচনা:
কারবালার মরুভূমির দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার শারীরিক কষ্ট একজন মানুষের অহংকারকে ভেঙে দেয়। এই কষ্ট তাকে বিনয়ী করে, ধৈর্য্য শেখায় এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। পথচলার এই ধীর গতি মানুষকে নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়।
২. নিঃস্বার্থ সেবা (খিদমত):
আরবাইনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বব্যাপী মানুষ একত্রিত হয়ে নিঃস্বার্থভাবে একে অপরের সেবা করে। খাবার, পানীয়, থাকার ব্যবস্থা, পা ধোয়ার সুব্যবস্থা, চিকিৎসা সেবা – সবকিছুই বিনামূল্যে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসার জন্য প্রদান করা হয়। এই সেবার মাধ্যমে মানুষ স্বার্থপরতা ত্যাগ করে পরোপকারের যে আনন্দ ও সওয়াব লাভ করে, তা এক মহান আধ্যাত্মিক উপার্জন।
৩. বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ:
আরবাইনে ভাষা, বর্ণ, জাতি, দেশ-সীমানার সকল পার্থক্যকে মুছে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এক মহান লক্ষ্যে, এক প্রাণের টানে একত্রিত হয়। এই বিশাল সমাবেশ মানুষকে শেখায় যে সমগ্র মানবজাতি এক পরিবার। এই ঐক্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব এবং সম্প্রীতি আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৪. ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের শিক্ষা:
ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তার সঙ্গীরা কারবালায় যে অতুলনীয় ধৈর্য্য, সাহস ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, তার স্মরণে এই যাত্রা মানুষকে জীবনের প্রতিকূলতায় ধৈর্য্য ধারণ করতে এবং সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শিক্ষা একজন মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তাকে আধ্যাত্মিকভাবে সবল করে তোলে।
৫. দুআ ও ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু:
কারবালা হলো একটি বিশেষ মুস্তাজাবুদ দুআ (দুআ কবুলের স্থান)। এখানে মানুষের মন নরম হয়, চোখ অশ্রুশীল হয় এবং হৃদয় খোদাপ্রেমে সিক্ত হয়। এই পবিত্র পরিবেশে ইবাদত-বন্দেগি, কুরআন তিলাওয়াত ও প্রার্থনার মাধ্যমে আত্মার এক গভীর সংযোগ স্থাপিত হয়।
উপসংহার:
আরবাইন তাই শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি যাত্রা – আত্মার যাত্রা, ভালোবাসার যাত্রা এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির যাত্রা। এটি মানুষকে শেখায় কিভাবে বস্তুবাদী জীবনের বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিক সম্পদ অর্জন করতে হয়। এই যাত্রা থেকে মানুষ যে প্রেম, ঐক্য, সেবা, ধৈর্য্য এবং ত্যাগের শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসে, তা তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। আরবাইন তাই এক জীবন্ত বিষ্ময়কর ঘটনা, যা প্রতি বছর বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় ন্যায়, সত্য এবং মানবতার চিরন্তন বিজয়ের কথা, এবং প্রতিটি ব্যাক্তিকে করে তোলে এক একজন আধ্যাত্মিকভাবে ধনী মানুষ।
লেখা: হাসান রেজা
আপনার কমেন্ট