শনিবার ২৩ আগস্ট ২০২৫ - ১২:২১
শিয়া-সুন্নি সর্বমত: মহানবী (সা.) ছিলেন নৈতিকতা, জ্ঞান ও প্রতিরোধের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের হাওজায়ে ইলমিয়ার পরিচালক ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আ’রাফি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মানবতার পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তিনি আল্লাহর পথে জ্ঞান ও জিহাদের পাশাপাশি নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রে সর্বাধিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। শিয়া ও সুন্নি উভয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে তাঁর একশ’রও বেশি নৈতিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ রয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শুক্রবার (২২ আগষ্ট) রাতে হযরত ফাতেমা মাসুমা (সা.)-এর হারামে, নাজমা খাতুন (সা.আ.) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত চিকিৎসক দিবসের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “এই পবিত্র স্থানে এবং হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর সান্নিধ্যে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.) সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত। আমি যা উপস্থাপন করছি, তা প্রামাণিক হাদিস ও ইসলামী উৎসের ভিত্তিতে নবীর প্রকৃত চিত্র।”

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নৈতিক দিক
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, রাসূল (সা.) ছিলেন জ্ঞান, ঈমান ও প্রতিরোধের প্রতীক, আর তাঁর ব্যক্তিত্বের তৃতীয় দিকটি নৈতিকতা। তিনি গোল করে বসতেন এবং মানুষের সাথে পরামর্শ করতেন; নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন যাতে মানুষের কাজ সহজ হয়; কারও ডাকে না বলতেন না, তবে গোনাহর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল। তিনি সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন, দুনিয়ার ক্ষতিতে দুঃখিত হতেন না, কেবল আল্লাহর পথে ক্রুদ্ধ হতেন এবং কখনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতেন না। তিনি ছিলেন সাদাসিধে, পরহেজগার ও স্বনির্ভর; দরিদ্র ও বঞ্চিতদের সঙ্গে বসতেন, মাটিতে শুতেন এবং নিজ কাজ নিজেই করতেন।

তিনি যোগ করেন, নবী (সা.) ছিলেন সদাচরণে শ্রেষ্ঠ ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তিনি মানুষের খোঁজখবর নিতেন, ভালো কাজে উৎসাহ দিতেন, মন্দ কাজকে নসিহতের মাধ্যমে সংশোধন করতেন। তাঁর দানশীলতা অতুলনীয় ছিল; সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন; সভায় সবার সাথে সমান আচরণ করতেন। তাঁর মজলিস মর্যাদা, লজ্জাশীলতা ও গাম্ভীর্যে পূর্ণ ছিল এবং তিনি নিজেকে সবার জন্য দয়ালু পিতার মতো মনে করতেন।

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, নবী (সা.) দরিদ্রদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন, উপহার নিতেন, পরিবারকে সম্মান করতেন, নারীর মর্যাদা রক্ষা করতেন, সর্বদা পরিচ্ছন্ন থাকতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং মানুষকে পরিচ্ছন্নতার প্রতি উৎসাহিত করতেন। তিনি মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করতেন, অন্যের দোষ গোপন করতেন এবং কখনো কারো কথা কেটে দিতেন না।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব গুণাবলী শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে সংরক্ষিত। আমাদের গর্ব যে আমরা এমন এক নবীর অনুসারী, যিনি জ্ঞান, জিহাদ ও নৈতিকতার পূর্ণ প্রতীক।

নবী করিম (সা.) মানবতার শিখর
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, নবীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি। তিনি ছিলেন নৈতিকতা, অঙ্গীকারের প্রতি আনুগত্য ও মানুষের প্রতি সদাচরণের প্রতীক। নবী (সা.) সভায় প্রবেশ করলে প্রথমে সালাম দিতেন এবং বিদায় নেয়ার সময় সর্বশেষ বিদায় করতেন। তিনি অতিথি অভ্যর্থনায় অগ্রগামী ছিলেন এবং সর্বদা মানুষের সাথে হাস্যোজ্জ্বলভাবে মিশতেন।

তিনি আরও বলেন, ইবনে সিনা মানব ইতিহাসের এক অনন্য শিখর, যিনি ইসলামী চিন্তাধারার মাধ্যমে মানব সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপন করেছিলেন। তিনি অল্প বয়সেই যুগের সব জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং পূর্ববর্তী সভ্যতার জ্ঞানকে ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে একীভূত করে মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য রেখে গেছেন।

চিকিৎসা সমাজের ভূমিকা ও জাতীয় শক্তি
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, একটি জাতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো জ্ঞান ও প্রযুক্তি। চিকিৎসা সমাজ বিশেষত স্বাস্থ্য সংকট ও সাম্প্রতিক দুর্যোগগুলোতে প্রমাণ করেছে যে জনগণের স্বাস্থ্য দেশের শক্তি ও মর্যাদার একটি প্রধান ভিত্তি। চিকিৎসকরা করোনাসহ বিভিন্ন দুর্যোগ ও হামলায় তাদের দক্ষতা ও ধৈর্যের মাধ্যমে জাতির শক্তি সংরক্ষণ করেছেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে সপ্তম উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এই খাত জাতীয় ক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ।

আয়াতুল্লাহ আ’রাফি চিকিৎসক সমাজের পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, স্ত্রী-সন্তানদের সহমর্মিতা চিকিৎসকদের সাফল্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গাজা প্রসঙ্গ
তিনি গাজার সাম্প্রতিক ঘটনার প্রসঙ্গে বলেন, শত্রুরা যখন ইরানের মর্যাদা ও শক্তি ভাঙতে তৎপর, তখন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি বৃদ্ধি এবং সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। চিকিৎসক সমাজকে তাই সর্বদা সম্মান ও মর্যাদার সাথে দেখা উচিত।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha