মঙ্গলবার ২৬ আগস্ট ২০২৫ - ১৯:১৫
মুহররম ও সফর-এ দু'মাস আহলুল বাইতের (আ) শোকের মৌসুম এবং ইসলাম ধর্ম সংরক্ষণ কাল/পর্ব১

সফরের শেষ দিবস হচ্ছে মহানবীর (সাঃ) পবিত্র আহলুল বাইতের (আ) বারো মাসূম ইমামের অষ্টম মাসূম ইমাম আলেম-ই আল-ই মুহাম্মদ ( রাসূলুল্লাহর আহলুল বাইতের আলেম বা জ্ঞানী পণ্ডিত) আবুল হাসান হযরত আলী ইবনে মূসা আর-রিযার (আ.) শাহাদাত দিবস।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম 

২৪ অগাস্ট রোববার ছিল সফর মাসের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ সফর,১৪৪৭ হি.। আর সফরের শেষ দিবস হচ্ছে মহানবীর (সাঃ) পবিত্র আহলুল বাইতের (আ) বারো মাসূম ইমামের অষ্টম মাসূম ইমাম আলেম-ই আল-ই মুহাম্মদ ( রাসূলুল্লাহর আহলুল বাইতের আলেম বা জ্ঞানী পণ্ডিত) আবুল হাসান হযরত আলী ইবনে মূসা আর-রিযার (আ.) শাহাদাত দিবস। এ দিন ইরানের খোরাসান বেলায়েত বা প্রদেশের তূসের নৌঘনের সানাবাদ নামক গ্রামে অর্থাৎ বর্তমান মাশহাদ নগরীতে (শেখ তূসী ও ইবনে আসীরের মতে) ২০৩ হিজরীতে আব্বাসীয় খলীফা মামূনের নির্দেশে বিষ মিশ্রিত আঙ্গুর পরিবেশন করা হলে তিনি (আ) ঐ বিষাক্ত আঙ্গুর খান এবং বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৫৫ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে (আ) হামীদ ইবনে কাহতাবার বাড়ীতে দাফন করা হয় এবং সেখানে আব্বাসীয় খলীফা হারূনুর রশীদের কবরও বিদ্যমান। আর এ সুমহান ইমামের (আ) শোকাবহ শাহাদাত দিবস উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক শোক ও তাসলিয়ত (সমবেদনা ও সান্ত্বনা)।
মুহররম ও সফর এ দুমাস মহানবীর (সা) আহলুল বাইতের (আ) শোক, মর্সিয়া ও আযার মাস। ইমাম খোমেইনী এ দু'মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন:মুহাররাম ও সাফারাস্ত্ কে এস্লম্ র যেন্দে নেগাহ্ দশত্যাস্ত্ 
(محرم و صفر است که اسلام را زنده نگه داشته است)
মুহররম ও সফর-এ দুমাসই ইসলামকে জীবন্ত (যিন্দা) ও প্রাণবন্ত রেখেছে।
আর ১০ মুহররম ৬১ হিজরী সালের আশুরার দিবসে কারবালায় বেহেশতের যুবকদের নেতা নবী দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের (আ) শাহাদাত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর চিরশত্রু ও দুশমন বনী উমাইয়ার বিচ্যুত খিলাফতের (আসলে রাজতন্ত্র) সর্বনাশা ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও বিধ্বংসী পদক্ষেপ সমূহ থেকে ইসলামকে রক্ষা করেছে যার দিকে মহানবী (সা) ইশারা করে হাসান (ভালো) প্রতিষ্ঠিত নির্ভরযোগ্য হাদীসে যথার্থই বলেছেন: "হুসাইনুম্ মিন্নী ওয়া আনা মিন্ হুসাইন অর্থাৎ হুসাইন আমার থেকে এবং আমি‌ হুসাইন থেকে যে ব্যক্তি হুসাইনকে ভালবাসে,আল্লাহ তাকে ভালবাসেন হুসাইন নাতিগণের একজন হুসাইন।"(দ্রঃ জামে আত-তিরমিযী,৬ষ্ঠ খণ্ড,পৃ:৩৫৪, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার,ঢাকা,প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর ১৯৯৮)
حسین مني و أنا من حسین أحب الله من أحب حسیناً حسین سبط من الأسلاط
 আর বিশুদ্ধ,সহীহ্, হাসান,নির্ভরযোগ্য, প্রতিষ্ঠিত মুতাওয়াতির হাদীসে (দ্রঃ জামে আত-তিরমিযী,খ৬,পৃ:৩৫০, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার,ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত,প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর ১৯৯৮) মহানবী (সা) ইমাম হাসান (আ) ও ইমাম হুসাইন (আ)-এর সম্পর্কে বলেছেন:আল-হাসান ও আল-হুসাইন উভয়েই জান্নাতী যুবকদের নেতা (আ)।
الحسن و الحسین سیدا شباب أهل الجنة
অতএব যে হুসাইন (আ) মহানবী (সা) থেকে এবং মহানবী (সা)ও যে হুসাইন থেকে;আর যে হুসাইন (আ) ও হাসান (আ) বেহেশতের যুবদের নেতা সেই হুসাইনের জন্য এবং উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠিত নির্ভরযোগ্য মুতাওয়াতির সহীহ ও হাসান হাদীসদ্বয় এবং সহীহ প্রতিষ্ঠিত নির্ভরযোগ্য মুতাওয়াতির হাদীস-ই সাকালাইনের আলোকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইমাম হুসাইন (আ) মহানবীর (সাঃ) মাসূম আহলুল বাইতের (আ) সদস্য হওয়ার জন্য যেহেতু এ দুনিয়ায় পবিত্র কুরআনের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে একীভূত ও একসঙ্গে রয়েছেন এবং তাঁর সাথে পবিত্র কুরআনও রয়েছে যার অর্থ হচ্ছে আহলুল বাইত (আ) ও ইমাম হুসাইনের (আ) ইসমত ও তাহারাত (মাসূম ও পবিত্র হওয়া) সেহেতু ইমাম হাসানের (আ) পরে ইমাম হুসাইন (আ) এ দুনিয়ায় (আ) রাসূলুল্লাহর (সা) প্রকৃত নায়েব (প্রতিনিধি),জানশীন(স্থলাভিসিক্ত) খলীফা (কারণ,তিনি আহলুল বাইতের বারো মাসূম ইমামের তৃতীয় মাসূম ইমাম,আখেরাতে মহান আল্লাহ কর্তৃক বেহেশতের যুবকদের নেতৃদ্বয়ের একজন মনোনীত হয়েছেন এবং পরকালে যিনি এ বড় পদমর্যাদা ও সুউচ্চ মাকামের অধিকারী হবেন তিনি অবশ্যই এ পৃথিবীতে এবং ইহলৌকিক জীবনে মানবজাতি ও মুসলিম উম্মাহর হিদায়াতের ইমাম ও পথপ্রদর্শক নেতা হবেনই) এবং এ দুনিয়ায় ইমাম হুসাইনের (আ) পথই হচ্ছে রাসূলুল্লাহর (সা) পথ,সাকালাইনের (পবিত্র কুরআন ও আহলুল বাইত) পথ এবং সিরাত-ই মুস্তাকীম অর্থাৎ সরল সঠিক পথ ,হিদায়ত ও পারলৌকিক মুক্তির পথ তথা জান্নাতে যাওয়ার পথ। আর ইমাম হুসাইনের পথ ব্যতীত অন্য যে কোনো পথ যেমন: ইয়াযীদ ও বনী উমাইয়ার পথ এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের মতো ঐ সব ব্যক্তির পথ যারা ইমাম হুসাইনকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন নি এবং সাহায্যও করেন নি তাদের পথ জান্নাত গমন ও প্রবেশের পথ নয়। এটা কখনোই সঠিক,সত্য ও যথার্থ নয় যে যিনি বেহেশ্তের যুবকদের নেতা তিনি তাঁর দুনিয়াবী জীবন সায়াহ্নে ও জীবনের শেষে ভুল ও অন্যায় করে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিবেন। বরং এটাই সঠিক,সত্য ও যথার্থ যে যিনি বেহেশতের যুবকদের নেতা তিনি এ পৃথিবী থেকে ভুল ও অন্যায় করে বিদায় নেবেন না। অতএব ইয়াযীদকে খলিফা বলে স্বীকৃতি না দিয়ে বাইয়াত না করা এবং মুসলিম উম্মাহর সংশোধন ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে কূফা গমন ইমাম হুসাইনের (আ) সঠিক পদক্ষেপ ছিল যদিও তাঁকে উমাইয়া প্রশাসন কূফায় পৌঁছতে দেয় নি এবং কারবালায় যেতে বাধ্য করে তাঁকে ১০  মুহররম আশুরার দিবসে শহীদ করেছে।আর কূফা বাসীদের অনেকেই বহু পত্র দিয়ে তাঁকে কূফা আগমনের দাওয়াত ও আহ্বান জানালে মুসলিম উম্মাহর ইমাম (নেতা) হিসেবে তাদের ডাকে উপযুক্ত জবাব দান এবং কূফা গমন করত: বনী উমাইয়ার কালো কুশাসন ও তাদের সৃষ্ট বিদ'আত ও মহা বিচ্যুতি থেকে মুসলিম উম্মাহকে উদ্ধার এবং তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সংশোধন তাঁর (আ) ওপর ফরয অর্থাৎ অপরিহার্য, জরুরি, অবধারিত ও অবশ্য কর্তব্য হয়ে গিয়েছিল যা তিনি উম্মাহর ইমাম হিসেবে উপেক্ষা করতে পারেন নি এবং ধর্ম, শরিয়ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপেক্ষা করাও ছিল অনুচিত।
তাই এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে কারবালায় আশুরার দিবসে যালিম ইয়াযীদের শয়তানী স্বৈরাচারী ও ইসলাম বিরোধী তথাকথিত খিলাফতের (আসলে রাজতন্ত্র) বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইনের (আ) ক্বিয়াম (আন্দোলন) ,উত্থান ও বিপ্লব ইসলামকে ইসলামের দুশমন ইহুদী,নাসারা ও তুলাকাদের (বনী উমাইয়া) ঘৃণ্য বিদ'আত, বিকৃতি, ক্ষতি সাধন,ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করেছে।অতএব,ধর্মে বিদ'আত, বিকৃতি ও উম্মাহর বিচ্যুতি রোধ ও প্রতিকার করতে ইমাম হুসাইনের (আ) গৃহীত পদক্ষেপ, উদ্যোগ এবং কারবালায় তাঁর ও সঙ্গী-সাথীদের শাহাদাত এবং তাঁর অতি নিকট আত্মীয় ও আপনজনদের বন্দীত্ব ইত্যাদি ইসলাম ধর্ম ও শরিয়ত বহির্ভূত বিষয় ছিল না। তাই কারবালার এ মহা ঘটনা কোনো ভাবেই ইসলাম বহির্ভূত নয় বরং তা ইসলাম ও শরিয়াহর অন্তর্ভুক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়।যারা দাবি করে যে ইসলাম ধর্ম ও শরীয়তের পূর্ণতা লাভের পর এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বিধায় ইসলাম বহির্ভূত এবং ইসলামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ও সংশ্রব নেই তাদের এ কথা সম্পূর্ণ ভুল বরং ইসলাম ও শরিয়ত বিরোধী।কারণ ইসলাম ধর্মের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস,শরিয়তের মৌলিক সর্বসাধারণ সূত্র ও নিয়ম-কানুন,বিবেকবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তি এবং নৈতিক আখলাকী নীতিমালা এ মহা ঘটনাকে শামিল করে।এ ছাড়া এ মহা ঘটনা অর্থাৎ ৬১ হিজরী সালে কারবালায় ১০ মুহররম আশুরার দিবসে ইমাম হুসাইনের হৃদয়বিদারক শাহাদাত মুতাওয়াতির সূত্রে প্রতিষ্ঠিত যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।আর এ মহা ঘটনা যে ঘটবে এবং উম্মত যে ইমাম হুসাইনকে (আ) কারবালায় হত্যা করবে সে সংক্রান্ত খবর  দিয়েছিলেন ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন মহানবী (সা) এবং ইমাম হুসাইনের জন্য কেঁদেছিলেন ও শোক প্রকাশ করেছিলেন। প্রসিদ্ধ, প্রতিষ্ঠিত,সহীহ, হাসান ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের সংঘটনের অর্ধশতাব্দী আগেই মহানবী,হযরত আলী ও হযরত ফাতিমা যাহরা শোক প্রকাশ ও ক্রন্দন করেছেন যা হযরত ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পরবর্তী কালে তার স্মরণে ক্রন্দন ও শোক প্রকাশের বৈধতা প্রদান করে।আর প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও নবী পত্নী হযরত উম্মে সালামা (রা) স্বপ্নে আশুরার দিন (১০ মুহররম ৬১ হি.) ইমাম হুসাইনের শাহাদাত বরণের সময় হযরত রাসূলুল্লাহকে (সা) কারবালায় উপস্থিত হয়ে ধুলাবালি মাখা ও এলোমেলো চুল ও দাড়িতে শোকাকীভুত অবস্থায় দেখেছিলেন (দ্রঃ জামে আত-তিরমিযী, ৬ষ্ঠ খণ্ড,পৃ:৩৫২, হাদীস নং ৩৭১০, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা,প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর ১৯৯৮)। 
 যুগে যুগে ইসলামকে রক্ষা করতে হলে ইমাম হুসাইনের এ বৈপ্লবিক চিন্তা,প্রতিরোধ সংগ্রাম ও জিহাদের আদর্শ গ্রহণ এবং তা কাজে কর্মে বাস্তবায়ন করতেই হবে।আর এ কারণেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক আলেম মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহার যথার্থ বলেছেন:
কতলে হুসাইন আসল মে মর্গে ইয়াযীদ হ্যয় 
ইসলাম যিন্দা হোতা হ্যয় হর্ কারবালা কে বা'দ্
قتل حسین اصل میں مرگ یزید ہے
اسلام زندہ ہوتا ہے ہر کربلا کے بعد
(কারবালায় আশুরার দিবসে) হুসাইনের কতল (নিহত হওয়া ও শাহাদাত বরণ) আসলে (অবধারিত করেছে) ইয়াযীদেরই মৃত্যু ও ধ্বংস 
প্রতিটি কারবালার পরই (সাধিত) হয় ইসলামের জাগরণ ও পুনরুজ্জীবন।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত আরেফ সাধক (সূফী চিশতীয়া তরীকার প্রতিষ্ঠাতা) শেখ মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমেরী সাঞ্জারী (র.হ.) যথার্থ বলেছেন:
শহাস্ত্ হুসাইন্,পদেশহাস্ত্ হুসাইন 
দ্বীনাস্ত্ হুসাইন,দ্বীন্ পানহাস্ত্ হুসাইন্ 
সার্ দদ্ ভা না দদ্ দাস্ত্ দার্ দাস্তে ইয়াযীদ 
হাক্ব্ ক্ব কেহ্ বে ন য়ে "ল ই ল হা"..স্ত্ হুসাইন 
شاه است حسین، پادشاه است حسین،
دین است حسین، دین پناه است حسین،
 سر داد و نداد دست در دست یزید، 
حقا که بنای لا اله است حسین
"শাহ্ হচ্ছেন হুসাইন,বাদশাহ হুসাইন,
ধর্মই হচ্ছে হুসাইন ধর্মের আশ্রয়স্থল হুসাইন 
মাথা দিয়েছেন তিনি কিন্তু ইয়াযীদের হাতে হাত দেন নি  (তিনি ইয়াযীদের  বাইয়াত ও আনুগত্য করেন নি)
 প্রকৃত বাস্তব সত্য হচ্ছে যে কলেমা-ই তাইয়িবাহ্:লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর ভিত্তিই হুসাইন।"
১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেইনীর (র.হ.) নেতৃতে ইরানে সফল ইসলামী বিপ্লব আসলে কারবালায় আশুরার দিবসে ইসলামকে রক্ষার জন্য এবং যালিম,বৈষম্য শোষণ, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইনের (আ) শাহাদাত ও কিয়ামের (বিপ্লব ও অভ্যুত্থান) সুমহান মৃত সঞ্জীবনী আদর্শ থেকে উৎসারিত যা সবারই জানা। ইরানে ইসলামী বিপ্লব ও সংগ্রাম চলাকালে বিপ্লবী জনতার জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল:
নেহযাতে ম হুসাইনী রাহবারে ম খোমেইনী 
ইরন্ শোদে কার্ বো বা ল মাহদী বিঅ মাহদী বিঅ 
نھضت ما حسینی رھبر ما خمینی
ایران شدہ کرب و بلا مھدی بیا مھدی بیا 
আমাদের আন্দোলন হুসাইনী আমাদের নেতা (রাহবার) খোমেইনী
ইরান হয়ে গেছে কারবালা হে (ইমাম) মাহদী!এসো তুমি 
হে মাহদী!এসো তুমি ( আবির্ভূত হও তুমি)
শুধু ইরানের সফল ইসলামী বিপ্লবই নয় বরং পশ্চিম এশিয়া (মধ্য প্রাচ্য) যেমন: ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া,ইরাক,বাহরাইন, ইয়ামান এবং উত্তর আফ্রিকায় ইসরাইল ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইসলামী প্রতিরোধ সংগ্রাম ও আন্দোলন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে এবং ইসলামী বিপ্লবের মহান রাহবার আয়াতুল্লাহ আল-উযমা ইমাম খামেনেয়ীর কারবালাঈ আশুরাঈ হুসাইনী বৈপ্লবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত দূরদর্শী সুযোগ্য দিকনির্দেশনায় পূর্বের চেয়ে বহু গুণ শক্তিশালী হয়ে (ইসরাইলের বিরুদ্ধে) সফল জিহাদে ইসরাইলের প্রাণবায়ু প্রায় শেষ করেই দিচ্ছে। আজ এই হুসাইনী সংগ্রাম, শাহাদাত ও আত্মত্যাগের আদর্শ  সফলভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়ছে।এই কারবালায়ী আশুরাঈ হুসাইনী সংগ্রাম, শাহাদাত ও আত্মত্যাগের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সংস্পর্শে এসেই ফিলিস্তিনীদের হামাস, জিহাদ-ই ইসলামী ও অন্যান্য সংগ্রামী ফিলিস্তিনী সংগঠন ও আন্দোলন ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাযায় দীর্ঘ ২২ মাসের অধিক কাল ধরে সফল যুদ্ধ ও জিহাদ পরিচালনা করছে এবং ৬২০০০ ফিলিস্তিনীকে হত্যা যাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী,১৪০০০ এর অধিক নি:খোঁজ, লক্ষাধিক আহত ,গাযার সকল অবকাঠামো ও বাড়ী-ঘর,স্কুল বিদ্যালয়,কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মসজিদ,গির্জা ইত্যাদি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল যুদ্ধের ঘোষিত কোনো একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দীর্ঘ দিন সর্বাত্মক যুদ্ধ করেও অর্জন করতে পারে নি!!!অথচ গাযার ফিলিস্তিনীরা ইসরাইলের আরোপিত কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য,পানি, ওষুধ,রসদপত্র, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ,সাজসরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। কিন্তু ইসরাইলের পক্ষে গোটা পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন,কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সর্বাত্মক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক,আদর্শিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে এ যুদ্ধে।আর সবচেয়ে দু:খজনক হচ্ছে যে সকল মুসলিম দেশ বিশেষ করে আরব দেশগুলো ইসরাইলী আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধের মৌখিক অল্প কিছু নিন্দা করা ছাড়া কার্যকর আর কিছুই করছে না। ইরান, হিযবুল্লাহ, ইরাকের বেশকিছু প্রতিরোধকারী সংগঠন এবং ইয়ামানের আনসারুল্লাহ ব্যতীত আর কেউ গাযাবাসীদের পক্ষে নেই। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী খাঁটি ইসলামী বিপ্লবী আদর্শ এবং এই ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করেই তো ইসলামী বিপ্লবী ইরানের সাথে গত ৪৬ বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ চলছে। আসলে পারমাণবিক বিষয়টি উপলক্ষ,বাহানা ও অজুহাত মাত্র। পশ্চিম এশিয়ার (মধ্য প্রাচ্য) আহলুল বাইতের (আ) মাযহাবের অনুসারী দেশগুলোয় ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশেষকরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের চেতনা,স্পৃহা,ইচ্ছা ও মনোবৃত্তি বজায় ও বিদ্যমান রয়েছে যা কেবল গাযার জনগণ, হামাস ও জিহাদে ইসলামীর মতো ফিলিস্তিনী সংগ্রামী গ্রুপ ব্যতীত মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সকল দেশ যেমন: সৌদি আরব, কাতার,জর্দান,আরব আমিরাত, কুয়েত,বাহরাইন,ওমান,মিসর,লিবিয়া, মরক্কো,সুদান, জিবুতি,ইরিতেরিয়া, সোমালিয়া এবং অধুনা সিরিয়ায় প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।কারণ এ সব দেশে কারবালায়ী আশুরাঈ হুসাইনী বৈপ্লবিক সংগ্রামী চেতনা ও আদর্শ  বিকশিত হয় নি এবং মুহররম ও সফরে আযা ও শোক পালনের সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত নেই। বরং সংকীর্ণমনা, সাম্প্রদায়িক এবং নাসরানী (খ্রিষ্টান) পশ্চিমা বিশেষকরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পদালেহী, তাকফীরী, সালাফী ওয়াহাবী গোষ্ঠী ও ধারা সমূহ এগুলো পালনকে বিদ'আত, হারাম ও শিরক বলে গণ্য ও বাঁধা প্রদান করে। তবে এ অঞ্চলের উল্লেখিত দেশগুলোর জনগণও এখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তাদের এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিরাট অংশ ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের সাথে একাত্ম ও যুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। তাহলে এ আলোচনা থেকে মুহররম ও সফর (মহানবীর সাঃ আহলুল বাইতের -আ-শোকের মৌসুম)- এ দু মাস যে ইসলাম কে যিন্দা (জীবিত) ও প্রাণবন্ত রেখেছে তা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।এ দুমাস যে শোকের কাল ও মৌসুম তা ১০ মুহররম কারবালায় ইমাম হুসাইন এবং তাঁর আসহাবের (পুত্র,সন্তান,ভাই,নিকট জ্ঞাতি,পিতৃব্যপুত্র‌ ও সঙ্গী সাথীগণ) শাহাদাত,বারো মুহররম ও অন্য এক মতে ২৫ মুহররম আহলুল বাইতের বারো মাসূম ইমামের চতুর্থ মাসূম ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন যাইনুল আবিদীনের শাহাদাত,২০ সফর ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের ৪০তম দিন অর্থাৎ আরবাঈন্,২৮ সফর হযরত রাসূলুল্লাহর (সা) শাহাদাত সম ওফাত ও মহানবীর জ্যৈষ্ঠ দৌহিত্র আহলুল বাইতের বারো মাসূম ইমামের দ্বিতীয় মাসূম ইমাম হযরত হাসান মুজ্তবার শাহাদাত বার্ষিকী এবং সফর মাসের শেষ দিবস হচ্ছে আহলুল বাইতের (আ) বারো মাসূম ইমামের অষ্টম মাসূম ইমাম হযরত আলী ইবনে মূসা আর-রিযার (আ) শাহাদাত দিবস।
(এ প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে মুহররম ও সফরে শোকানুষ্ঠান পালনের ধর্মীয় দলীল ও উপকারিতা সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হবে)
মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান 
৩০ সফর,১৪৪৭ হি.

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha