শুক্রবার ২৯ আগস্ট ২০২৫ - ১০:৪৮
তাওয়াক্কুল: সকল নৈতিক গুণাবলীর ভিত্তি

ইসলামী আধ্যাত্মিক জীবনে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। এটি এমন এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা, যেখানে বান্দা বুঝতে পারে—সৃষ্ট জীব কারও ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না; উপকার ও ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহ্। এ কারণেই কুরআনে বারবার তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।” [সূরা আত-তালাক: ৩]

হাদীসের আলোকে তাওয়াক্কুল
হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ জিবরাঈল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন,

وَ مَا التَّوَکُّلُ عَلَی اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ؟

“আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার অর্থ কী?”

জিবরাঈল (আ.) উত্তরে বললেন,

الْعِلْمُ بِأَنَّ الْمَخْلُوقَ لَا یَضُرُّ وَ لَا یَنْفَعُ وَ لَا یُعْطِی وَ لَا یَمْنَعُ وَ اسْتِعْمَالُ الْیَأْسِ مِنَ الْخَلْقِ.

“তাওয়াক্কুলের অর্থ হলো এ বিশ্বাস রাখা যে সৃষ্ট জীব কেউ ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না; তারা কাউকে কিছু দিতে সক্ষম নয় এবং আল্লাহ যা দিতে চান, তাতে তারা বাধা দিতে পারে না। আর বান্দা যখন এ বিশ্বাসে দৃঢ় হয়, তখন সে মানুষের কাছ থেকে আশা ছেড়ে দেয় এবং কেবল আল্লাহর উপর নির্ভর করে।”

তাওয়াক্কুলের প্রকৃত রূপ
হাদীসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাওয়াক্কুলবান মানুষের চারটি বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়:

১. কাজ কেবল আল্লাহর জন্য– বান্দা অন্যের সন্তুষ্টির জন্য নয়, শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে।

২. আশা কেবল আল্লাহর প্রতি– মানুষ থেকে কিছু প্রত্যাশা করে না।

৩. ভয় কেবল আল্লাহর প্রতি– সৃষ্টির ভয় ত্যাগ করে, কেবল আল্লাহকেই ভয় করে।

৪. লোভ কেবল আল্লাহর প্রতি– তার প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা শুধু আল্লাহর কাছেই নিবদ্ধ থাকে।

এমন মানুষ বুঝতে পারে— যতই চেষ্টা করা হোক, আল্লাহ না চাইলে (মানুষের পক্ষ থেকে) কোনো উপকার বা ক্ষতি আসবে না।

তাওয়াক্কুল: সকল গুণের ভিত্তি
একটি বর্ণনায় এসেছে যে, জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল ﷺ-এর নিকট পাঁচটি আধ্যাত্মিক উপহার নিয়ে আসেন:
▪️সবর (ধৈর্য)
▪️রিদা (আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি)
▪️যুহদ (পার্থিব আসক্তি ত্যাগ)
▪️ইখলাস (খাঁটি নিয়ত)
▪️ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস)

আর তিনি বলেন, এ সব কিছুর মূল ভিত্তি হলো তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল ছাড়া অন্য কোনো গুণ পূর্ণতা পায় না।

কুরআনের দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুল
আল্লাহ তায়ালা বলেন:

قُلْ لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَىٰنَا وَعَلَى ٱللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ ٱلْمُؤْمِنُونَ

“বলুন, আমাদের কিছুই স্পর্শ করবে না তবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর মুমিনদের উচিত কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করা।” [সূরা আত-তাওবা: ৫১]

বাস্তব জীবনে তাওয়াক্কুল
তাওয়াক্কুল মানে অলসতা নয়। বরং এটি হলো— নিজের দায়িত্ব পালন করা, চেষ্টা ও পরিশ্রম করা, কিন্তু ফলাফলের ব্যাপারে শুধু আল্লাহর উপর নির্ভর করা।

একজন কৃষক যেমন জমি প্রস্তুত করে, বীজ বপন করে, পানি দেয়—কিন্তু ফসল ফলবে কিনা তা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তেমনি মুমিনও চেষ্টা করে, কিন্তু ভরসা রাখে একমাত্র আল্লাহর উপর।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

لَوْ تَوَكَّلْتُمْ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ؛ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا

“তোমরা যদি আল্লাহর উপর প্রকৃত ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমন রিযিক দিতেন যেমন পাখিকে দেন; তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় আর সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে।” [আল-হাদীস]

পরিসমাপ্তি: তাওয়াক্কুল হলো ঈমানের শক্তি, আখলাকের ভিত্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির চাবিকাঠি। এটি আমাদেরকে শিখায়— মানুষের নয়, সম্পদের নয়, পরিস্থিতির নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করতে। এ বিশ্বাসই মানুষকে পরিপূর্ণ মুমিন করে তোলে এবং নৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha