হাওজা নিউজ এজেন্সি: রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর পবিত্র জন্মের সময় আবু তালিব (আ.)–এর গৃহে যে কথা উচ্চারিত হয়েছিল, তা বহু বছর পরে গভীর তাৎপর্য বহন করে। শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে এটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)–এর বর্ণনায় উল্লেখিত হাদিসটি প্রকাশ করেছে, যা নিম্নরূপ—
إِنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ أَسَدٍ جَاءَتْ إِلَی أَبِی طَالِبٍ عَلَیْهِ السَّلَامُ تُبَشِّرُهُ بِمَوْلِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّی اللَّهُ عَلَیْهِ وَآلِهِ،فَقَالَ لَهَا أَبُو طَالِبٍ:«اِصْبِرِی سَبْتًا، أُبَشِّرْکِ بِمِثْلِهِ إِلَّا النُّبُوَّةَ».
قَالَ: وَالسَّبْتُ ثَلَاثُونَ سَنَةً، وَکَانَ بَیْنَ وِلَادَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّی اللَّهُ عَلَیْهِ وَآلِهِ وَ وِلَادَةِ أَمِیرِ الْمُؤْمِنِینَ عَلَیْهِ السَّلَامُ ثَلَاثُونَ سَنَةً.
“ফাতিমা বিনতে আসাদ আবু তালিব (আ.)–এর কাছে এসে তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন আবু তালিব (আ.) তাঁকে বলেন— ‘এক সাবত পর্যন্ত অপেক্ষা করো; আমি তোমাকে তাঁরই মতো এক সন্তানের সুসংবাদ দেব, তবে নবুওয়াত ব্যতীত।’”
ইমাম সাদিক (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে ব্যবহৃত ‘সাবত’ দ্বারা বোঝানো হয়েছে ত্রিশ বছর, যা বাস্তবেও রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জন্ম ও আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)–এর জন্মের মধ্যবর্তী সময়কাল।
[আল-কুলাইনি, আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৫২]
পরিবারিক প্রেক্ষাপট ও আলোকপাত
হযরত আবু তালিব (আ.)–এর চার পুত্র ছিলেন। প্রত্যেক পুত্রের বয়সের ব্যবধান ছিল দশ বছর।
• জ্যেষ্ঠ পুত্র তালিব, যার নামানুসারে আবু তালিব কুনিয়া প্রাপ্ত।
• দ্বিতীয় পুত্র আকিল, যিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।
• তৃতীয় পুত্র জাফর, যিনি চারিত্রিকভাবে আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)–এর নিকটতম।
• চতুর্থ ও সর্বকনিষ্ঠ পুত্র আমিরুল মু’মিনিন আলী ইবন আবি তালিব (আ.), যিনি ‘নাফসে রাসূল’ হিসেবে স্বীকৃত।
আবু তালিবের এই মন্তব্য— “কেবল নবুওয়াত ব্যতীত তাঁর মতো”— স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় আলী (আ.)–এর মর্যাদা ও রাসূলের সাথে আত্মিক সাদৃশ্যের।
মুবাহালা এবং কুরআনিক প্রাসঙ্গিকতা
কুরআনে উল্লেখিত মুবাহালা আয়াতের সঙ্গে এই বর্ণনার গভীর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়—
فَمَنْ حَاجَّکَ فِیهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَکَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَکُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَکُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَکُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَی الْکَاذِبِینَ (آلعمران:۶۱)
“অতঃপর সত্য সংবাদ আসার পর যদি কেউ তোমার সঙ্গে (ঈসা সম্পর্কে) বিতর্ক করে, তবে বলো, এসো। আমরা ডেকে আনি আমাদের সন্তানদের ও তোমাদের সন্তানদের, আমাদের নারীদের ও তোমাদের নারীদের, এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের; তারপর আমরা বিনীত প্রার্থনায় লিপ্ত হই এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত কামনা করি।” (সূরা আল-ইমরান: ৬১)
নাজরানের খ্রিস্টানরা এই আয়াতের প্রেক্ষিতে রাসূল ﷺ–এর সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলে, আল্লাহর নির্দেশে মুবাহালা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে যে, এই ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন—
• ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.) (রাসূলের সন্তান),
• হযরত ফাতিমা (সা.) (নারী প্রতিনিধি),
• আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.) (নাফসে রাসূল)।
আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)–এর মর্যাদা
এই ঘটনায় আলী (আ.)–কে ‘নাফসে রাসূল’ হিসেবে অভিহিত করা শিয়া ও আহলে সুন্নাত উভয় মাজহাবেই তাঁর এক অনন্য ফজিলত হিসেবে স্বীকৃত। এটি তাঁর রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সঙ্গে আত্মিক ও মর্যাদার নিবিড় সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে, যদিও তিনি নবী নন।
আহমদ ইবন হাম্বলের পুত্রের বর্ণনা অনুযায়ী— একবার তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর শ্রেষ্ঠ সাহাবি কারা?”
তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেও আলী (আ.)–এর নাম উল্লেখ করেননি। কারণ জানতে চাইলে তিনি উল্লেখ করেন— “আলী ইবন আবি তালিব সাহাবি নন; তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর নফস ও আত্মা।”
এই বর্ণনা ও হাদিসে দৃঢ়ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)–এর মর্যাদা কেবল সাহাবি বা নবীর অনুসারীর সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনি নবীর আত্মিক প্রতিনিধি হিসেবে উম্মাহর রক্ষার এক অঙ্গ এবং ইসলামের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
এই অধ্যয়ন প্রমাণ করে, ইসলামী ঐতিহ্যে ‘নাফসে রাসূল’ ধারণাটি শুধু শিয়া নয়, বরং আহলে সুন্নাতের সূত্রেও স্বীকৃত এবং এটি আলী (আ.)–এর মর্যাদা ও প্রভাবের সর্বোচ্চ দিককে তুলে ধরে।
আপনার কমেন্ট